‌এক্সপ্লেইনার

মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়: ডেমোক্র্যাটরা কী ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবে

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়: ডেমোক্র্যাটরা কী ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবে
মার্কিন কংগ্রেস অধিবেশন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পরাজিত করে কংগ্রেসের দুই কক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। জানুয়ারির শুরুতে বসতে যাওয়া কংগ্রেসের নতুন অধিবেশনটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছর থেকে একেবারেই ভিন্ন হতে যাচ্ছে। এতদিন রিপাবলিকানরা দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছিল। এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে ট্রাম্পের নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো যাচাই-বাছাই করা এবং তাদের অপছন্দের আইন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা এলো। তবে সব বাধা সত্ত্বেও, কংগ্রেসের সরাসরি অনুমোদন ছাড়াও একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প অনেক কিছুই করার ক্ষমতা রাখেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের এ জয়ে মার্কিন রাজনীতি ও ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ইরানের যুদ্ধ ও এর বাজেট

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হারের পেছনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটি ভূমিকা ছিল বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প নিজেই। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি মনে করি এর একটি অংশ ছিল ইরান, কিন্তু একই সঙ্গে, ইরানের বিষয়ে আমি যা করেছি তার গুরুত্বও মানুষ বুঝতে পেরেছে।

মূলত মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের চরম ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও এবার বাজেট নিয়ে নতুন কংগ্রেসের মুখোমুখি হতে পারেন তিনি। ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারি অর্থায়ন বিলের মেয়াদ শেষ হলে ট্রাম্পের সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর বাজেট কাটছাঁটের বড় ধরনের চাপ আসতে পারে।

তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক জেমস বয়েসের মতে, সৈন্য মোতায়েন থাকা অবস্থায় যুদ্ধ ফান্ডের অর্থ বন্ধ করা সহজ হবে না। অন্যদিকে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব ব্যবহার করে ট্রাম্পকে আটকানোও কঠিন হতে পারে, কারণ এটি বাতিল করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন- যা ডেমোক্র্যাটদের নেই।

তা সত্ত্বেও কিছু রিপাবলিকান নেতার সহায়তায় কংগ্রেস ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। যেমন রাজনীতির আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক স্কট লুকাস জানান, উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং শুরু থেকেই তা করে আসছেন। এমনকি সম্প্রতি ভ্যান্স আলোচনা ফেরাতে ইরানের নিরাপত্তা প্রধানকে চিঠিও পাঠিয়েছেন।

অবশ্য জেমস বয়েসের মতে, সংবিধানে দুই মেয়াদের বেশি থাকার সুযোগ না থাকায় ট্রাম্প হয়তো মেয়াদের শেষভাগে এসে নিজেকে পুরোপুরি স্বাধীন মনে করতে পারেন। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আলাদা একটি রাজনৈতিক প্রভাব বা লেগ্যাসি তৈরির জন্য তিনি আগ্রাসী নীতি আরও বাড়াতে পারেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

শুল্কনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ট্রাম্প প্রায় ৯০টি দেশের পণ্যে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করলেও ট্রাম্প নতুন নির্বাহী আদেশে বিকল্প পথে শুল্ক বহাল রেখেছেন।

ডেমোক্র্যাটদের দাবি, এ শুল্কের চূড়ান্ত বোঝা পড়ছে সাধারণ মার্কিন ক্রেতাদের ওপর এবং এর ফলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। তাই তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনগণের পকেট কাটার অভিযোগ তুলছেন। ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস হয়তো ব্যবসায়ীদের কিছু সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার জন্য দরকষাকষি করতে পারে, তবে মার্কিন শুল্কনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এর পাশাপাশি, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দুই দলই একমতে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে চীনের দূরবর্তী প্রযুক্তি ব্যবহার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ পাচার রোধে কড়া বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের যৌথ সম্মতি দেখা যেতে পারে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

অভিবাসন নীতি ও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত

মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের ফলে কংগ্রেসের সব গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত কমিটির শীর্ষ পদগুলো এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাবে। এর ফলে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা, জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ কিংবা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে কড়া তদন্ত শুরু হতে পারে। এমনকি ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের প্রচেষ্টাও অস্বাভাবিক নয়।

পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বহুল আলোচিত অভিবাসী বিতাড়ন অভিযান নিয়েও তল্লাশি চালাবে ডেমোক্র্যাটরা। সম্প্রতি মার্কিন কর সংস্থা ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মধ্যে যে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে, সমন জারি করে সেগুলোর বিস্তারিত খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

নির্বাচনের আগেই ফক্স নিউজের জরিপে উঠে এসেছিল যে ৫৩ শতাংশ ভোটার অভিবাসন বিরোধী এ অভিযানকে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখছেন। প্রশাসন দাবি করেছিল আটক হওয়া অভিবাসীদের ৭০ শতাংশই অপরাধী, তবে সেই পরিসংখ্যানে বড় ধরনের গলদ ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অধ্যাপক স্কট লুকাসের মতে, এ পরিবর্তনের ফলে এখন ডেমোক্র্যাট এবং দায়িত্বশীল রিপাবলিকানরা রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে সমাজের ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলতে এবং আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

/এমএকে/