হাসিনাকে সমর্থনের অভিযোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে: এইচআরডব্লিউ

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
হাসিনাকে সমর্থনের অভিযোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে: এইচআরডব্লিউ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

মঙ্গলবার (৩ অক্টোবর) রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংগঠন করার অধিকারের পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেও এসব অধিকার সুরক্ষিত।

প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এ ধরনের বিতর্ককে ভয় পাওয়া স্বৈরাচারদেরই মানায়, ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত কোনো সরকারের নয়।

তিনি আরও বলেন, অতীতের দমন-পীড়নের অধ্যায় পেছনে ফেলে বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের দমনমূলক আচরণের পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতি, সাময়িক বরখাস্ত এবং পাঠদানে নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের সহিংসতায় সহযোগিতা, দলটির পক্ষে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং ইসলামি পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ। একইভাবে আওয়ামী লীগের সদস্য বা সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে শত শত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এতে তাঁদের শিক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

এসব ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে শাস্তির মুখে পড়া এক ডজনের বেশি শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন নথি, চিঠিপত্র, টেলিভিশন আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও পর্যালোচনা করেছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ বাতিল এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত আগস্টে প্রকাশিত গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তাঁরা আওয়ামী লীগপন্থী একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্য ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক এইচআরডব্লিউকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করেননি, এমন শিক্ষকদের লক্ষ্য করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। তাঁদের ক্লাস নিতে ও গবেষণা করতে দেওয়া হচ্ছে না।

প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই আন্দোলন দমনে পুলিশের সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় প্রভাব ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকেরা নিয়োগ ও পদোন্নতিতে সুবিধা পেয়েছেন। বিপরীতে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকেরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন প্রশাসন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত ছাড়াই ৪৪ জন শিক্ষককে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখে। আরও ২৫ জনের পাঠদানে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছয়জন শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বর্তমানে আরও ১৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই ধরনের তদন্ত চলছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত, সাময়িক বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে। আরও ৩৪ জনের পদাবনতি করা হয়েছে অথবা তাঁদের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শৃঙ্খলাবিধি অনুসরণ করে নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের পর ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং ১০ জনকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগ, তদন্তে তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির আরও ৮৫ জন শিক্ষক পদোন্নতি পাননি।

এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, দেশের ২০টির বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপের তথ্য তারা পেয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটি জানায়, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলায় কয়েকজন শিক্ষার্থীর জড়িত থাকার পক্ষে ছবি, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১২৬ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে এবং তাঁদের পরীক্ষার সনদ প্রত্যাহার করে।

এ ছাড়া পুলিশের করা মামলায় আওয়ামী লীগ সমর্থক আরও ২৭৭ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তাঁরা ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করছেন বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। তালিকাভুক্ত অনেক শিক্ষার্থী সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

শাস্তির মুখে পড়া শিক্ষকদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান। ২০১৭ সাল থেকে প্রেষণে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করা এই অধ্যাপককে ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা করে একে ‘অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক’ বলেছিলেন। তবে ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও পর্যালোচনা করে এমন বক্তব্যের প্রমাণ পায়নি এইচআরডব্লিউ।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে তিনি ‘গণহত্যায় প্ররোচনা’ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ আনা হয়। বৈঠকটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এতে সব উপাচার্যকে অংশ নিতে হয়েছিল। অধ্যাপক মশিউর রহমানের দাবি, এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার কোনো প্রমাণ তাঁকে দেখানো হয়নি। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের সুপারিশ করে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার পেছনে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের একটি মিছিলে তাঁদের অংশগ্রহণকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগের দিন আওয়ামী লীগপন্থী ওই মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে মিছিলটিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা বিশ্বাসের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া এবং যথাযথ তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না রাখা মানবাধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন পরিবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে।