এক্সপ্লেইনার

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পর্কে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পর্কে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি
নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন মার্কিন ভোটাররা

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩ নভেম্বর। দেশটির প্রায় ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটার এ নির্বাচনে ভোট দেবেন। তাদের ভোটেই নির্ধারিত হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার বাকি সময়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। যদিও এ নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট নিয়ে গঠিত কংগ্রেস দেশটির আইন প্রণয়ন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে। এবারের নির্বাচনে কীভাবে ভোট হবে, কোন আসনগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং ফলাফল দুই দলের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে, তা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

মধ্যবর্তী নির্বাচন কী?

মার্কিন প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়েই এ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের দুই কক্ষের সদস্যসংখ্যা ও নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হয়। এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে দুটি বিশেষ নির্বাচনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ছেড়ে দেওয়া আসন পূরণে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন করবেন ভোটাররা। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তাদের মেয়াদ দুই বছর। অন্যদিকে সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর গণভোট হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

রিপাবলিকানরা কী ঝুঁকিতে

বর্তমানে কংগ্রেসের দুই কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রিপাবলিকানদের হাতে। তবে যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ডেমোক্র্যাটরা আইন প্রণয়ন আটকে দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর ক্ষমতা পাবেন। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের তিনটি আসন এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে চারটি আসন পেতে হবে। সিনেটে দুই দলের আসন সমান ৫০-৫০ হলে রিপাবলিকানরাই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবেন। কারণ, সমান ভোটের ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সিদ্ধান্তমূলক ভোট দিতে পারবেন।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক টড বেল্টের মতে, ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হতে পারে। তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিলে সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে থাকা বিভিন্ন অর্থায়নসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন কার্যত থমকে যাবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

নির্বাচন যেভাবে হয়

প্রতিনিধি পরিষদ হলো কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ। ৪৩৫ জন সদস্য প্রত্যেকে একটি নির্বাচনি এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে প্রতি দুই বছর পরপর সব আসনে নির্বাচন হয়। প্রতি ১০ বছর পর অনুষ্ঠিত আদমশুমারির ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যা অনুযায়ী আসন বণ্টন করা হয়। সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫২টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে ওয়াইয়োমিং ও ভারমন্টের মতো কম জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্যে রয়েছে একটি করে আসন। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন পেতে হবে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের হাতে রয়েছে ২১৪টি আসন।

অন্যদিকে, সিনেট হলো কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ। এর সদস্যসংখ্যা ১০০। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুই জন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তাদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি দুই বছর পরপর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এবার নির্বাচনে ৩৩টি আসনে ভোট হবে। পাশাপাশি ফ্লোরিডা ও ওহাইওতে বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া দুটি আসন শূন্য রয়েছে। ৩৫টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ২২টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ১৩টি।

নজর থাকবে যে আসনগুলোতে

প্রতিটি নির্বাচনি এলাকা থেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন। ২১৮টি আসন পাওয়া দল প্রতিনিধি পরিষদ নিয়ন্ত্রণ করবে। বেল্টের মতে, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে প্রায় ৩৫টি আসন গুরুত্বপূর্ণ। রিপাবলিকানদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৫টি আসন বাড়াতে পারে।

সিনেটের ক্ষেত্রেও লড়াইটি বেশ জমজমাট। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান মাইক কলিন্স। মিশিগানের শূন্য আসনে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদ ও রিপাবলিকান মাইক রজার্স। নিউ হ্যাম্পশায়ারের শূন্য আসনে ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাসের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জন সুনুনু। রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনগুলোর মধ্যে মেইন ও নর্থ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সুযোগ রয়েছে।

নির্বাচনি বুথ
নির্বাচনি বুথ

নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু

ভোটাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় জীবনযাত্রার ব্যয়। জ্বালানির দাম, বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপে রয়েছে পরিবারগুলো। এ ছাড়া প্রজনন অধিকার, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বর্তমান পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

কারা ভোট দেবেন ও ভোটার উপস্থিতি

যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি। সরকারি তথ্য সংকলনকারী নির্দলীয় সংস্থা ইউএসএফ্যাক্টসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি বাসিন্দাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৪৪ শতাংশ নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করছেন, রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে রয়েছেন ৩৬ শতাংশ। অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করছেন ৫ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সাধারণত কিছুটা কম থাকে। ১৯৪৪ সাল থেকে হিসাব অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনে গড়ে ৪২ শতাংশ ভোটার ভোট দেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির গড় ৫৮ শতাংশ।

মার্কিন কংগ্রেস অধিবেশন
মার্কিন কংগ্রেস অধিবেশন

দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেই কি ডেমোক্র্যাটদের পূর্ণ ক্ষমতা পাবে

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটরা পূর্ণ ক্ষমতা পাবে না। কারণ, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিলে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অকার্যকর করতে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

এ ছাড়া সিনেটের নিয়ম অনুযায়ী, অধিকাংশ বিলের ওপর বিতর্ক শেষ করতে ৬০টি ভোট প্রয়োজন হয়। তবে বাজেটসংক্রান্ত কিছু বিল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করা যায়। ফলে অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই কোনো দল তাদের সব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। এর আগে দুইবার অভিশংসিত হয়েছেন ট্রাম্প। তবে তাকে পদ থেকে সরাতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে।

নিয়ন্ত্রণ হারালে কী হবে এবং ফলাফল কখন জানা যাবে

রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে ডেমোক্র্যাটরা তাদের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দিতে পারবেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাতে পারবেন। তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটরা পূর্ণ ক্ষমতা পাবেন না, কারণ ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং যেকোনো বিলে ভেটো দিতে পারবেন। ৩ নভেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় প্রথম ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর ফল আসতে শুরু করবে। তবে কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ফল চূড়ান্ত হতে কয়েক দিন বা সপ্তাহও লাগতে পারে। টড বেল্ট সতর্ক করে বলেছেন, প্রাথমিক ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, যাকে ‘রেড মিরাজ’ বলা হয়। কারণ ডাকযোগে ভোট গণনার ধরনের কারণে শুরুর দিকে এক দলের প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও পরে ফল বদলে যেতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন নির্ধারণ করবে, যুক্তরাষ্ট্রে কারা আইন প্রণয়ন করবেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি চালাবেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করবেন। এর মধ্য দিয়েই ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হবে।

/এমএকে/