শিরোনাম

মরুভূমিতে মহাসাগর! সাহারায় কৃত্রিম সমুদ্র তৈরির বিস্মৃত ইতিহাস

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
 মরুভূমিতে মহাসাগর! সাহারায় কৃত্রিম সমুদ্র তৈরির বিস্মৃত ইতিহাস
সাহারা মরুভূমি

সাহারা মরুভূমি মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অনন্ত বালুকা রাশি, পাথুরে মালভূমি আর প্রখর তাপদাহ। তবে আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে একদল প্রকৌশলী ও অভিযাত্রী বিশ্বাস করতেন, এই রুক্ষ প্রকৃতির রূপ চিরতরে বদলে দেওয়া সম্ভব। ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক মহাসাগরের জল এনে সাহারার বুকে বিশাল এক কৃত্রিম সমুদ্র তৈরির এক দুঃসাহসিক স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। তাদের ধারণা ছিল, মরুভূমির নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত করতে পারলে বাতাসের আর্দ্রতা বাড়বে, নিয়মিত বৃষ্টিপাত হবে এবং এই বন্ধ্যা প্রান্তর পরিণত হবে উর্বর ও বসতিযোগ্য অঞ্চলে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়নি, তবুও প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের সেই প্রচেষ্টা আজও ভূ-প্রকৌশলের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে আছে।

এই মহাপরিকল্পনার মূল প্রবক্তা হিসেবে দেখা হয় ফরাসি সেনা কর্মকর্তা ফ্রাঁসোয়া এলি রুন্দাইরকে। ১৮৭০-এর দশকে তিনি বিখ্যাত সুয়েজ খালের প্রকৌশলী ফার্দিনান্দ দে লেসেপসের সঙ্গে মিলে ‘সাহারা সাগর প্রকল্প’-এর মূল রূপরেখা তৈরি করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ তিউনিসিয়ার ‘শট এল ফেজেজ’ অববাহিকায় সমুদ্রের জল ঢুকিয়ে দেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবেস উপসাগর থেকে একটি দীর্ঘ খাল খনন করার কথা ছিল। এই খাল ভূমধ্যসাগরের জলকে মরুভূমির গভীরে নিয়ে যেত। সেই সময়ে প্রায় তিন কোটি ডলার আনুমানিক ব্যয়ের এই প্রকল্পে কেবল আবহাওয়া বদলানোর স্বপ্নই ছিল না, বরং মাছ শিকার, নৌচলাচল এবং উত্তর আফ্রিকার বাণিজ্যকে নতুন রূপ দেওয়ার বিশাল আশাও জড়িয়ে ছিল।

তবে ফরাসিদের আগেই ১৮৭৭ সালে একই ধরনের এক ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রকৌশলী ডোনাল্ড ম্যাকেঞ্জি। তিনি আটলান্টিক মহাসাগরের জল ব্যবহার করে বর্তমান মৌরিতানিয়া ও মালির ‘এল জউফ’ অববাহিকায় প্রায় ৬০ হাজার বর্গমাইল জুড়ে কৃত্রিম সমুদ্র তৈরির প্রস্তাব দেন। মরক্কোর কেপ জুবি অঞ্চল থেকে খাল কেটে মহাসাগরের জল ভেতরে আনার এবং পরবর্তীতে সেই জলাশয়কে বিখ্যাত নাইজার নদীর সঙ্গে যুক্ত করার নকশাও তৈরি করেছিলেন তিনি। তৎকালীন অনেক ভূতত্ত্ববিদ বিশ্বাস করতেন সুদূর অতীতে এই অববাহিকাটি প্রাকৃতিকভাবেই আটলান্টিকের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা ম্যাকেঞ্জির প্রস্তাবকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

কিন্তু রোমাঞ্চকর এ স্বপ্নের বাস্তবায়ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে থমকে যায়। মাঠপর্যায়ে বিস্তারিত জরিপ শুরু হতেই প্রকল্পের বড় বড় সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, মরুভূমি প্লাবিত করলেই বৃষ্টি হবে- এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশাল জলাশয়টি একটি পচা জলাভূমিতে পরিণত হয়ে মহামারি ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের জন্ম দিতে পারে। ফরাসি সরকারের নিজস্ব জরিপে দেখা যায়, প্রস্তাবিত ভূমির অনেকটাই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উপরে, যার ফলে কারিগরি জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিপুল খরচের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার আশঙ্কায় অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে ১৯১০ সালে ফরাসি অধ্যাপক এচেগোয়েন ঔপনিবেশিক স্বার্থে আরও বড় খালের প্রস্তাব দিলেও সরকার আর এগোয়নি।

সাহারা সাগর প্রকল্প শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ না দেখলেও, প্রকৃতিকে মানুষের ইচ্ছেমতো বদলে দেওয়ার এই মানসিকতা পরবর্তী সময়ে আরও অনেক মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং পরিকল্পনাকে অনুপ্রাণিত করেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন প্লাও শেয়ার’ কর্মসূচির অধীনে মিশরের কাতারা অববাহিকায় পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কৃত্রিম সমুদ্র তৈরির চিন্তা করেছিল। যদিও আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরে ‘লেক আয়ার’-কে মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা কিংবা ১৯০৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় সেচ খালের বাঁধ ভেঙে দুর্ঘটনাবশত বিশাল স্যালটন সাগর তৈরি হওয়ার ঘটনাগুলো এ ধারণারই ধারাবাহিকতা বহন করে।

আজকের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সাহারা সাগর প্রকল্পকে কোনো অবাস্তব কল্পনা হিসেবে দেখেন না। এটিকে প্রকৃতির ওপর মানুষের প্রযুক্তিকেন্দ্রিক অতি-উৎসাহের এক ঐতিহাসিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করেন। আধুনিক গবেষণা নিশ্চিত করেছে, এত বড় পরিসরে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পরিবর্তন করলে তা মরুভূমির সুনির্দিষ্ট জীববৈচিত্র্য, ভূগর্ভস্থ পানীয় জলের ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক আবহাওয়াকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলত। শেষ পর্যন্ত সাহারা সাগরের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী শক্তি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, প্রকৃতির নিখুঁত ভারসাম্যের প্রতি শ্রদ্ধা রাখাটাই মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

/এমএকে/