শিরোনাম

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজন ইতিহাস ও স্বার্থের ভারসাম্য

প্রতীতি তৌফিক
প্রতীতি তৌফিক
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজন ইতিহাস ও স্বার্থের ভারসাম্য
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বুঝাতে প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই ইতিহাস, আবেগ ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিতর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা। বর্তমান বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু অতীতের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে না; বরং জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও ইতিহাসের প্রতি সম্মান বজায় রেখে অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রশ্নটি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

রাষ্ট্রের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার নাগরিকদের জীবনমান দিয়ে। মানুষ ভালো আছে কি না, কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না— এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। আর এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো শক্তিশালী অর্থনীতি।

তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অনেক সময় ঐতিহাসিক বিরোধ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা আদর্শগত দ্বন্দ্ব সামনে চলে আসে। তখন প্রশ্ন ওঠে— রাষ্ট্র কি অতীতের বিরোধকে প্রাধান্য দেবে, নাকি বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্বার্থকে? বাস্তবতা হলো, এই দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইতিহাসের প্রতি সম্মান বজায় রেখেও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।

আজকের বিশ্বব্যবস্থায় এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনাম একসময় ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়েছিল। সেই যুদ্ধের ক্ষত এখনো ইতিহাসের অংশ। কিন্তু বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একইভাবে চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ অব্যাহত থাকলেও তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৩৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড স্পর্শ করেছে। আবার দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে তীব্র কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই বাস্তবতাকে বলা হয় ‘Coopetition’— অর্থাৎ প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার সহাবস্থান। আধুনিক বিশ্বে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে অনেক দেশই এই নীতির অনুসরণ করছে। বাংলাদেশকেও বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়া কেন পিছিয়ে

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে থাকা অঞ্চল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বাণিজ্য পরিচালনা করে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি।

এই ব্যবধানের পেছনে অন্যতম কারণ হলো রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও ঐতিহাসিক বৈরিতা। আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিবর্তে বিরোধকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক সংযোগ ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রেও।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার। তবে এই বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১১ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ভারতের অনুকূলে। অর্থাৎ আমরা ভারত থেকে যা আমদানি করি তার তুলনায় রপ্তানি অনেক কম। এই বিশাল ঘাটতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের জায়গা।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও বহুমুখী করতে হবে, যাতে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক: ইতিহাস ও বাস্তবতার প্রশ্ন

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আলোচনায় সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো ১৯৭১ সালের গণহত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। এটি কেবল ইতিহাস নয়; বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ভিত্তি।

তবে একই সঙ্গে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যা সম্ভাবনার তুলনায় খুবই সীমিত।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তুলা ও সুতা তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামে পাকিস্তান থেকে আমদানি করা সম্ভব। পাশাপাশি কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, রাসায়নিক শিল্প এবং শিক্ষা খাতেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

তবে এই সম্পর্ক অবশ্যই স্বচ্ছতা, জাতীয় স্বার্থ এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতাকে কাজে লাগানো।

ইতিহাসকে সম্মান, ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়। এই ইতিহাসকে অস্বীকার বা খাটো করার কোনো সুযোগ নেই।

তবে ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ শুধু অতীতের স্মৃতিতে আবদ্ধ থাকা নয়। বরং সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই হতে পারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তব প্রতিফলন।

সাধারণ মানুষের জীবনই আসল মানদণ্ড

রাষ্ট্রের সাফল্যের প্রকৃত পরিমাপ সাধারণ মানুষের জীবনমান। একজন কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, একজন শ্রমিক পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন কি না, একজন তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন কি না— এসব প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সেই পথকে আরও সহজ করতে পারে। কারণ রাজনৈতিক বিরোধের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।

শেষ কথা

ইতিহাস আমাদের শেকড়, আর অর্থনীতি আমাদের ভবিষ্যৎ। শেকড়কে অস্বীকার করলে জাতি পরিচয় হারায়, আবার শুধু অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকলেও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রয়োজন ইতিহাস ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে, জাতীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত কিন্তু কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং বৈদেশিক বাজার বহুমুখীকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়া হতে পারে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিই বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এটিই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর কৌশল।

প্রতীতি তৌফিক, ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

/এমআর/