সরেজমিন মিটফোর্ড হাসপাতাল পর্ব-৩

ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস, কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে গ্যাস-বিদ্যুতের বিলের বোঝা

ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস, কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে গ্যাস-বিদ্যুতের বিলের বোঝা
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের নিউম্যান ভবনের বিভিন্ন স্থান ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল নানা সমস্যায় জর্জরিত। জায়গার অভাবে রোগীদের যথাযথ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। চিকিৎসকেরা অফিস চলাকালীন বাইরে রোগী দেখেন। কর্মচারীরা পরিত্যক্ত ভবনে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করেন। সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব অনিয়ম ও ভোগান্তির চিত্র। আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি আয়নাল হোসেনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শেষ পর্ব আজ প্রকাশ করা হলো।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের চারটি ভবন ১৭ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু সেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতেই বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা বাস করছেন। কোনো কোনো কর্মচারী ভবনগুলোর বেশ কিছু কক্ষ ভাড়াও দিয়েছেন। উপরন্তু তারা গ্যাস ও বিদ্যুতের বিলও পরিশোধ করছেন না। এতে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকার গ্যাস ও বিদ্যুতের বিলের বোঝা চাপছে কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে।

মিটফোর্ড হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর ২০০৯ সালে মিটফোর্ড হাসপাতালের চারটি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। এগুলো হচ্ছে নিউম্যান ভবন, পুরোনো বহির্বিভাগ ভবন, পেশেন্ট কটেজ ও লাল দালান ভবন। এসব ভবনে দুই শতাধিক মানুষ বসবাস করছেন। এদের মধ্যে বর্তমান কর্মচারী মাত্র তিনজন। বাকিরা অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং ভাড়াটিয়া। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এসব ভবন জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। এতে যেকোনো সময় এসব ভবন ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের নিউম্যান ভবন এক শ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, চর্ম ও যৌন বিভাগ, হেপাটোলজি বা লিভার বিভাগ এবং ব্লাড ব্যাংক ছিল। অনেক আগেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভবনটি থেকে সব বিভাগ সরিয়ে নিয়েছে। তবে ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে। এই ভবনেরই নিচতলায় অগ্রণী ব্যাংকের মিটফোর্ড হাসপাতাল শাখা।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, নিউম্যান ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। বারান্দার রেলিং ভেঙে গেছে। ছাদসহ বিভিন্ন স্থান আগাছায় ছেয়ে গেছে। পুরোনো বহির্বিভাগ ভবনের নিচতলা ও দুই তলায় আট-নয়টি পরিবার বসবাস করছে। লালদালানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে শতাধিক মানুষ। পেশেন্ট কটেজও দখলে নিয়ে কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে।

হাসপাতালের কয়েকজন প্রাক্তন কর্মচারী বলেন, লাল দালানটি ১৫০ বছরের পুরোনো। শুরুতে এখানে হাসপাতালের কার্যক্রম চালানো হতো। পরে নতুন ভবনে হাসপাতালের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হলে এখানে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এখন যারা বসবাস করছেন তারা সেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরই বংশধর। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পেরেছে, সেখানে মাত্র তিনজন কর্মচারী (যাদের বর্তমানে চাকরি রয়েছে) বসবাস করছেন। অন্যান্য কক্ষ তারা ভাড়া দিয়েছে। প্রত্যেক ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে তারা ৫-৬ হাজার টাকা নিচ্ছে। কিন্তু কর্মচারী এবং ভাড়াটিয়া কেউ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল পরিশোধ করছে না।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পুরোনো বহির্বিভাগ ভবনটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পুরোনো বহির্বিভাগ ভবনটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

পরিত্যক্ত ভবনে পরিবার নিয়ে থাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের এক কর্মচারী সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ভবন ছাড়তে নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া ভবনগুলোর গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

পরিত্যক্ত ভবনে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংক মিটফোর্ড হাসপাতাল শাখার ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘বছরখানেক আগে মিটফোর্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শাখাটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের একটি চিঠি দিয়েছিল। ওই চিঠি পেয়ে শাখাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা আমাদের কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। শিগগিরই আমাদের শাখা সরিয়ে নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, যেসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলোর সামনে অনেক আগেই সতর্কতামূলক ব্যানার ও সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপরও অনেকেই সেগুলোতে জোরপূর্বক বসবাস করছে।

জরাজীর্ণ ভবনগুলো সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ টি এম এ রুস্তম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, পুরোনো বর্হিবিভাগের ভবন ও আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে সেখানে ১৮ তলা ভবন তৈরির প্রস্তাব অনেক আগেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাশ হলেই সেখানে নতুন ভবন তৈরি করা হবে।

/বিবি/