উচ্চমূল্যের আলোক হাসপাতালে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও

উচ্চমূল্যের আলোক হাসপাতালে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও
এক ভবনের সঙ্গে আরেক ভবন জোড়া লাগিয়ে চলছে আলোক হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। ছবি: আয়নাল হোসেন

একের পর এক ভবন জোড়া লাগিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাচ্ছে আলোক হাসপাতাল লিমিটেড। রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় আলোকের হেলথকেয়ার হাসপাতালটিতে এক ভবনের সঙ্গে আরেক ভবন জোড়া লাগানো দেখা গেছে। একই এলাকায় আলোকের অন্য দুটি শাখা হাসপাতালেও মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। এসব হাসপাতালের কোনোটিতেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ফলে আগুন লাগলে কেউ আর বেঁচে ফিরতে পারবেন না বলে রোগীদের আশঙ্কা। এসব প্রতিষ্ঠানে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে সেবার জন্য আদায় করা হচ্ছে উচ্চ মূল্য। রয়েছে আরও নানা অসঙ্গতি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভাষ্য, তারা যদি কোনো অসঙ্গতি দেখতে পায়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত রবিবার ও মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর মেট্রোরেলের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে অবস্থিত আলোক হাসপাতালের তিনটি শাখায় সরেজমিন পরিদর্শন করে এই প্রতিবেদক। প্রতিষ্ঠান তিনটির নাম– আলোক হাসপাতাল লিমিটেড, আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার এবং আলোক হেলথকেয়ার। এর মধ্যে দুটি হাসপাতালে জরুরি বহির্গমনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

আলোক হেলথকেয়ারে দুটি ভবন জোড়া দেওয়া হয়েছে। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে যোগাযোগের জন্য নিচতলায় ও চতুর্থ তলায় সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই হাসপাতালের একটি ভবন সাত তলা ও অপরটি পাঁচ তলা। আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের ভবনটি ৯ তলা। আর মাদার অ্যান্ড চাইল্ডকেয়ার হাসপাতালটি ১০ তলা ভবনে।

মিরপুর ১০ নম্বরে আলোক হাসপাতালের একটি শাখা। ছবি: আয়নাল হোসেন
মিরপুর ১০ নম্বরে আলোক হাসপাতালের একটি শাখা। ছবি: আয়নাল হোসেন

৪ অক্টোবর রবিবার রাজধানীর মিরপুর-১০ এ অবস্থিত আলোক হাসপাতাল লিমিটেড ও মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে সরেজমিন ঘুরে নানা অসঙ্গতি দেখা যায়। ডায়াগনস্টিক ও জেনারেল হাসপাতালের ছাদের এক পাশে একটি ক্যান্টিন রয়েছে। এই ক্যান্টিন থেকেই রোগী ও তার স্বজনদের খাবার সরবরাহ করা হয়। এখানকার সপ্তম তলায় কেবিন রয়েছে, এরপর রয়েছে আইসিইউ, ডক্টরস চেম্বারসহ ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এখানে রোগী ওঠানামার জন্য কোনো র‍্যাম্প নেই। রোগী ও স্বজনদের ওঠানামায় দুটি লিফটই ভরসা। তবে এ হাসপাতালের কোথাও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নেই। আগুন লাগলে নিচে নামার একমাত্র ভরসা খাড়া সিঁড়ি। জরুরি বহির্গমন নেই।

মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের ১০ তলায় নামাজের কক্ষ ও হিসাব বিভাগ। ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা ১৭টি। বাকি সব বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা কেবিন। কেবিনে রোগী রাখা হলে বাড়তি টাকা আদায় করা যায়, এ কারণেই শয্যার চেয়ে কেবিন বেশি রাখা হয়েছে বলে দাবি রোগীর স্বজনদের।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আলোক হাসপাতাল লিমিটেডের উপপরিচালক মনির খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। হয়তো আপনার চোখে তা পড়েনি। আপনি এক সময় আসেন। আপনাকে আমি নিজে ঘুরিয়ে দেখাবো। নকশায় আছে বলেই ভবনগুলো একটির সঙ্গে অপরটির জোড়া লাগানো অবস্থায় রয়েছে। আমাদের হাসপাতালটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। আমাদের প্রতিষ্ঠানও স্কয়ার, আজগর আলীর মানের। এরপরও তুলনায় অন্যদের চেয়ে খরচ আমাদের এখানে কম।’

মাতৃসেবা ও টেস্টের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্–দ্বীন হাসপাতালে ওষুধসহ সিজারিয়ান অপারেশনে খরচ ৮ হাজার ৬০০ টাকা। আর রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টার হাসপাতালে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সাধারণ শয্যায় থাকা সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যয় ৯০ হাজার টাকা। কেবিনে খরচ ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়বে। নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিশেষ কোনো চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করাতে চাইলে খরচ আরও ৫ হাজার টাকা বেশি লাগে। রাজধানীর আদ্–দ্বীন হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি রঙিন ১ হাজার ২০০ টাকা। আলোক ডায়াগনস্টিক ও জেনারেল হাসপাতালে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। আদ্–দ্বীন হাসপাতালে এসি কেবিন ভাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ টাকা, আলোক হাসপাতালে ৫ হাজার টাকা। আদ্–দ্বীন হাসপাতালের সঙ্গে ব্যয়ের তুলনা করা হলে মনির খান বলেন, ‘আদ্–দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কর্পোরেট। আমাদের মানের সঙ্গে আদ্–দ্বীনের তুলনা করলে হবে না।’

আলোক মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতাল। ছবি: আয়নাল হোসেন
আলোক মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতাল। ছবি: আয়নাল হোসেন

রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে রাকিবুল হাসান নামে (৩১) নামে এক রোগী ডেঙ্গু সন্দেহে এই হাসপাতালে আসেন। তিনি ডাক্তার হারুন-উর-রশিদকে দেখান। চিকিৎসক রোগীকে সাতটি পরীক্ষা দেন। এর মধ্যে ইউরোফ্লুমেট্রি, র‍্যানডম গ্লুকোজ, ক্রনিক আনপ্রেডিকটেবল স্ট্রেস র‍্যাসডম, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইউরিন আর/ই, এক্স–রে কিউইউবি ডিজিটাল, আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা দেন। এসব পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ রোগীর কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হয়। তবে তাকে কমিশন হিসেবে ৮৭০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়।

মিরপুর-১০ নম্বরের বাসিন্দা ইমরান হোসেন তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে আসেন আলোক হাসপাতালে। ইমরান হোসেন বলেন, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ফি ৩ হাজার টাকা। তার কাছ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা রাখা হয়েছে।

এই প্রতিবেদক আলোক মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে সিজারিয়ানের ব্যয় সম্পর্কে জানতে কাস্টমার কেয়ার কর্মকর্তার কাছে যান। কাস্টমার কেয়ার কর্মকর্তা জিজ্ঞাসা করেন, কোন ডাক্তারের মাধ্যমে করাবেন? তখন তাকে বলা হয়, ‘ডাক্তার তো চিনি না। যেকোনো ডাক্তার দিয়ে করালে কত ব্যয় হবে।’জবাবে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের যেকোনো চিকিৎসক দিয়ে করালে ওষুধ ও পরীক্ষা ছাড়া সাধারণ শয্যায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। বিভিন্ন পরীক্ষা ও ওষুধের জন্য আলাদা টাকা দিতে হবে। আর কেবিনে থাকলে অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। বিশেষ কোনো ডাক্তারের মাধ্যমে করালে আরও পাঁচ হাজার টাকা বেশি লাগবে।’

এই সময় কোনো অপারেশন করানো হলে কত ব্যয় হবে– জানতে চাইলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী অপারেশন।’ বলা হয়, ‘জরায়ু ক্যান্সার।’ তখন ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্যান্সার রয়েছে ২৯ ধরণের। আপনি কোনটি করাবেন। আগে রোগী নিয়ে আসেন। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন কী অপারেশন হবে।’ ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা এই মুহূর্তে হাসপাতালে আছেন কিনা, জানতে চাইলে কাস্টমার কেয়ার কর্মকর্তা বলেন, পাশের ১০৩ নম্বর কক্ষে ম্যানেজার সোহেল আছেন। আপনি চাইলে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

ম্যানেজার সোহেলের কক্ষে গিয়ে এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে জানতে চায়। বিশেষ করে রোগী ওঠানামার র‍্যাম্প ও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র না থাকা এবং টেস্ট, অপারেশন ও কেবিনের অতিরিক্ত ফির বিষয়ে। জবাবে সোহেল বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে অবশ্যই র‍্যাম্প আছে।’ তখন তিনি নিজে উঠে গিয়ে লিফটের পূর্বপাশে একটি র‍্যাম্প দেখান। এই র‍্যাম্পটি মূলত লিফট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কেন নেই– এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবই আছে। কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চুরি হওয়ার কারণে লাগানো হয় না।’

সোহেল আরও বলেন, হাসপাতালের যেকোনো তথ্য জানতে চাইলে, তথ্য অধিকারে আবেদন করতে হবে। আর এ ব্যাপারে উপপরিচালক মনির খানের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আলোক হাসপাতাল লিমিটেড। ছবি: আয়নাল হোসেন
আলোক হাসপাতাল লিমিটেড। ছবি: আয়নাল হোসেন

হাসপাতালে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় এবং নানান অসঙ্গতির বিষয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফোর থেকে যোগাযোগ করা হয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদের সঙ্গে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফি ১০০ টাকার পরিবর্তে ৪০০ টাকা আদায় করছে, এটি কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া ডেলিভারি বা সিজারিয়ানে কোনোমতেই ৯০ হাজার টাকা বিল হতে পারে না। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগকে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যাতে রোগীদের ব্যয় কম থাকে।’

তার মতে, একটি নরমাল ডেলিভারিতে ১২ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়ার সুযোগ নেই।

রাতে এই প্রতিবেদকেরই এক সহকর্মী মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাসপাতালে ফোন করে নরমাল ডেলিভারি ও সিজারিয়ানের চার্জ জানতে চান। তখন ওই হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, নরমাল ডেলিভারি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা এবং এর জন্য একদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। এই খরচ কোনো ওষুধপত্র ছাড়া। আর সিজারিয়ানের জন্য ওষুধ ছাড়া দিতে হবে ৭০ হাজার টাকা। দুই থেকে তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হবে।

আলোক হাসপাতালের অসঙ্গতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নূরুল ইসলাম সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আলোক হাসপাতাল নিয়ে আরও এক সাংবাদিক আমাকে ফোন করেছিলেন। সেখানে যেসব অসঙ্গতি রয়েছে, তা আমি সরেজমিন পরিদর্শন করবো। এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অলোক হাসপাতালে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বলেন, ‘রাজধানীর শতকরা ৯০% ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতি রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং ফায়ার আইনের মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে। ফায়ার আইনে বলা আছে সাত তলার ওপরে ভবন হলে সেখানে ফায়ার সেফটি বাধ্যতামূলক অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বিল্ডিং কোডে বলা আছে ১০ তলার ওপরে হলে সেফটি অনুসরণ করতে হবে।’

/আরএ/