যুগের পর যুগ সেবা না দিয়েই সুয়ারেজ বিল আদায় করছে ঢাকা ওয়াসা

যুগের পর যুগ সেবা না দিয়েই সুয়ারেজ 
বিল আদায় করছে ঢাকা ওয়াসা

রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ বা পয়ঃনিষ্কাশন লাইন নেই । কোথাও আংশিক থাকলেও অনেক স্থানে তা দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। অথচ পানির সংযোগ থাকা প্রায় সব গ্রাহকের কাছ থেকেই নিয়মিত পানির বিলের সঙ্গে আদায় করা হচ্ছে পয়ঃনিষ্কাশন বা সুয়ারেজ বিল। সেবা না দিয়েই বিল আদায়ের বিষয়টিকে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ওয়াসার কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে পয়ঃনিষ্কাশন খাত থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অধিক আদায় করেছে সংস্থাটি। যদিও একই সময়ে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় গড়ে ওঠেনি কার্যকর সুয়ারেজ লাইন। ফলে বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য বিভিন্ন খাল, জলাশয় ও নদীতে গিয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘কোনো প্রকার সেবা না দিয়ে বিল আদায় করা এক ধরনের প্রতারণা বা অসততা। যে সেবা দেওয়া হচ্ছে না, তার জন্য কেন বিল আদায় করবে রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।’

ঢাকা ওয়াসা সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালের আইন অনুযায়ী রাজধানীতে পানি সরবরাহ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আছে ওয়াসা। রাজধানীতে বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পানি সরবরাহের লাইন রয়েছে। এর মধ্যে পয়ঃনিষ্কাশন লাইন মাত্র ৯৩০ কিলোমিটারে। অর্থাৎ পানি সরবরাহ ব্যবস্থার তুলনায় সুয়ারেজ লাইন অনেক কম। তারপরও পানির লাইন যেখানে রয়েছে, সেখানের গ্রাহকদের কাছ থেকেই পয়ঃনিষ্কাশনের বিল আদায় করা হচ্ছে।

ওয়াসার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সংস্থাটির ১০টি পরিচালন অঞ্চল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সুয়ারেজ লাইন রয়েছে। চারটি অঞ্চলে আংশিক সুয়ারেজ ব্যবস্থা আছে, আর বাকি চারটি অঞ্চলে কোনো সুয়ারেজ লাইনই নেই।

ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সুয়ারেজ লাইন নেই। এর মধ্যে বৃহত্তর উত্তরা, বৃহত্তর মিরপুরের অঞ্চল-৪ ও অঞ্চল-১০ এবং বারিধারা ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত অঞ্চল-৮ রয়েছে। তবে লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকা (অঞ্চল-৩), মহাখালী, গুলশান, তেজগাঁও ও আশপাশের এলাকা (অঞ্চল-৫), জুরাইন-যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকা (অঞ্চল-৭) এবং মতিঝিল-খিলগাঁও ও আশপাশের এলাকা (অঞ্চল-৬)-তে আংশিক সুয়ারেজ লাইন রয়েছে।

এছাড়া গুলশান, নিকেতন, বারিধারা, বনানী, মহাখালী ডিওএইচএস, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও নিকুঞ্জসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায়ও ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন নেই। তবে এসব এলাকার ভবন মালিকদের প্রতি মাসে পানি বিলের পাশাপাশি সুয়ারেজ বিলও পরিশোধ করতে হচ্ছে।

পানির বিলের সঙ্গে সুয়ারেজ লাইনের বিল নেয়ার বিষয়ে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের এক ভবন মালিক লুতফর রহমান বলেন, ' পানির বিলের সঙ্গে অন্য বিলও নেয়। বিল নিচ্ছে কিন্তু বিনিময়ে পানি না পেয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়। অন্তত পানি সরবরাহ ঠিক থাকলেও তো হয়। আর সুয়ারেজ লাইনের বিল কী কারণে নিবে এইটা তো স্পষ্ট করা উচিত।'

এ বিষয়ে রাজধানীর জিগাতলার এলাকার ভবন মালিক তানভীর এলাহী বলেন, সুয়ারেজ বিল বছরে একবার দিতে হয়। তাদের এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে।

ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও উন্নয়ন না হওয়ায় রাজধানীর অনেক সুয়ারেজ লাইন কার্যকারিতা হারিয়েছে। ওয়াসার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নথিতেও একাধিক লাইন বিকল বা অকার্যকর হয়ে পড়ার তথ্য রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে কিছু এলাকায় সুয়ারেজ লাইন থাকলেও বাস্তবে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা ওয়াসা ২০১৩ সালে রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ওই পরিকল্পনায় বলা হয়, পয়ঃবর্জ্য পরিবহনের প্রধান পাইপলাইন ‘ট্রাংক সুয়ারস’নামে পরিচিত। রাজধানীতে ওয়াসার তিনটি ‘ট্রাংক সুয়ারস’ রয়েছে। তবে এসব লাইনের বেশির ভাগই বর্তমানে অকার্যকর বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাই মহাপরিকল্পনার আওতায় পাঁচটি শোধনাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই পরিকল্পনা প্রণয়নের এক যুগ পার হলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধানাগার নির্মাণ করা হলেও তৈরি করা হয়নি লাইন। বাকি চারটি শোধনাগার উত্তরা, মিরপুর, রায়েরবাজার ও পাগলায় (দ্বিতীয়) নির্মাণ করা হবে। এসব প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়নি।

ওয়াসার আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়েই পয়ঃনিষ্কাশন বিল বাবদ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৩৯১ কোটি ৪২ লাখ টাকা, ২০২০ সালে ৩৪১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, ২০১৯ সালে ৩৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ২০১৮ সালে ১১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা, ২০১৭ সালে ২৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালে ২৩৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় কোনো না কোনোভাবে থাকলেও বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় পয়:বর্জ্য নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে অধিকাংশ পয়ঃবর্জ্য শেষ পর্যন্ত খাল, নদী কিংবা অন্যান্য জলাশয়ে গিয়ে মিশছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

এই বিষয়ে অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পুরো ঢাকায় চার ভাগের এক ভাগ স্থানে শুধু ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন আছে। সুয়ারেজ টিট্রমেন্ট প্লান্টের জন্য যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা বাস্তব সম্মত ছিলো না। কিছু পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি) বাদে কোনো আগ্রগতি দেখা যায়নি। দাশেরকান্দি যে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আছে তার এখনো নেটওয়ার্ক পাইপলাইন গড়ে তোলা হয়নি। কর্তৃপক্ষের উচিত সবদিক ভেবে চিন্তা করা নগরবাসীর সেবা প্রদান করা সম্ভব এমন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া।

পয়:নিষ্কাশনের লাইন না থাকার পরেও এই খাতে বিল আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। পরে তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এ বিষয়ে জানতে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

/বিবি/