শিরোনাম

কলেজে ভর্তির সংকট: একাদশে জায়গা মিলবে না যাদের

শেখ শাহরিয়ার হোসেন
শেখ শাহরিয়ার হোসেন
কলেজে ভর্তির সংকট: একাদশে জায়গা মিলবে না যাদের
ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সব বোর্ড মিলিয়ে এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। পাস করতে পারেনি প্রায় ৭ লাখ পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ এবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির যোগ্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় কম।

ফল প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কলেজে ভর্তির সুযোগ ও আসনসংখ্যার হিসাব।

দেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি কলেজ, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ২৫ লাখ আসন রয়েছে। এর বিপরীতে এবার পাস করেছে প্রায় ১১ লাখ ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী। ফলে জাতীয়ভাবে আসনের কোনো সংকট নেই। বরং গত বছরও মোট আসনের প্রায় ৪১ শতাংশ খালি ছিল। এবার খালি আসনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে আসন বেশি থাকলেও বাস্তবে ভর্তি নিয়ে সংকট তৈরি হয় ভালো ও নামী কলেজগুলোতে। নটর ডেম কলেজ, ঢাকা কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষ কলেজে আসনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শিক্ষার্থী আবেদন করে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পাস করেও পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারে না।

অন্যদিকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকায় আসন খালি পড়ে থাকে। অর্থাৎ একদিকে ভালো কলেজে একটি আসনের জন্য অনেক শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করে, অন্যদিকে অনেক কলেজে শিক্ষার্থী পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতি বছর এসএসসি পাস করা সব শিক্ষার্থীও শেষ পর্যন্ত একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় না। কেউ পলিটেকনিক, কৃষি, নার্সিং বা অন্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। কেউ বিদেশে চলে যায় বা কাজ শুরু করে। আবার আর্থিক সমস্যার কারণে অনেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। অনেকে আবেদন করার পরও নির্ধারিত সময়ে ভর্তি সম্পন্ন করে না।

একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম অনলাইনে এবং এসএসসি ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম অনুযায়ী হয়। শিক্ষার্থীরা পছন্দ অনুযায়ী একাধিক কলেজ নির্বাচন করতে পারে। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীরা সাধারণত পছন্দের কলেজে সুযোগ পেলেও কম জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীরা দেশসেরা কলেজে আসন সংকটে অনেক সময় পছন্দের কলেজে ভর্তির সুযোগ পায় না। মাইগ্রেশনের কারণেও ভর্তির প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

শিক্ষাবিদদের মতে, বড় শহরের কয়েকটি কলেজে ভর্তির চাপ বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো শিক্ষার মানের পার্থক্য। অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক, ভালো ল্যাব, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম নেই। তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট কিছু কলেজে ভর্তি হতে চান।

এ কারণে শুধু কলেজের আসন বাড়িয়ে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোর শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, ল্যাব ও প্রযুক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহ বাড়ানো প্রয়োজন।

এবারও কয়েক ধাপে অনলাইনে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম হবে। মেধা ও পছন্দক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের কলেজ বরাদ্দ দেওয়া হবে। জাতীয়ভাবে আসনের ঘাটতি না থাকায় পাস করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশই কোথাও না কোথাও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে। তবে নামী ও ভালো কলেজে ভর্তির প্রতিযোগিতা আগের মতোই থাকবে।

মুসলিম গভ হাই স্কুল থেকে এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী রাহুল শেখ বলেন, জাতীয়ভাবে আসন বেশি থাকলেও আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের চিন্তা মূলত পছন্দের কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে। ভালো ফল করেও যদি আসনসংকটের কারণে পছন্দের কলেজে সুযোগ না পাই, তখন হতাশ লাগে। আমি মনে করি, শুধু কয়েকটি নামী কলেজে চাপ না বাড়িয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোর শিক্ষার মান ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার।

দেশে একাদশ শ্রেণিতে আসনের সংকট নেই। সংকট মূলত ভালো কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ নিয়ে। দেশের এক জায়গায় যখন অনেক আসন খালি পড়ে থাকে, তখন অন্য জায়গায় একটি আসনের জন্য লড়াই করে কয়েক ডজন শিক্ষার্থী। তাই উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির বড় চ্যালেঞ্জ এখন আসনের সংখ্যা নয়, বরং সব এলাকায় মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা।

এবিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী ফারুক হোসেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, শহরের স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভিড়ের প্রধান কারণ হলো তুলনামূলক ভালো শিক্ষক, অবকাঠামো, ল্যাব, কো-কারিকুলার কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ। বিপরীতে গ্রামের অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব সুযোগের ঘাটতি থাকায় অভিভাবকরা সন্তানদের শহরমুখী করছেন।

তিনি বলেন, সংকট সমাধানে গ্রামের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার মান উন্নয়ন, শিক্ষক ও অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং সরকারি মনিটরিং বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তা, দাতা ও বিত্তবানদের সম্পৃক্ত করে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ এর মাধ্যমে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত হলে শিক্ষার্থীদের শহরমুখী চাপও কমবে।

/এসবি/