শিরোনাম

ব্যাটারি রিকশায় সড়কে বিশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যাটারি রিকশায় সড়কে বিশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ
ব্যাটারিচালিত রিকশা

সারা দেশে অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ছে। এতে সড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলা বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের এ সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ওপর তৈরি করছে বাড়তি চাপ।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাত ১২টার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। ফলে এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে কমার কথা, তা কমছে না।

দেশের প্রচলিত আইনে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানগুলোর নিবন্ধনের কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নেই। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ধারণা, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবে, সারা দেশে ই-থ্রি-হুইলার রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই রয়েছে প্রায় ২০ লাখ।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইকে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, তার হিসাব প্রকৃতপক্ষে রাখা কঠিন। তবে রাত ১২টার পর পিক টাইম শেষ হলে বিদ্যুতের ব্যবহার কমে যাওয়ার কথা। এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা কমার কথা থাকলেও তা কোনোভাবেই কমছে না। ধারণা করা হচ্ছে, এর বেশির ভাগ বিদ্যুৎ ব্যাটারি চার্জে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার বেশির ভাগই রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময় রাত ১২টা পর্যন্ত চলে যাচ্ছে এবং মোট চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকারও হচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সিপিডি আয়োজিত ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।

সিপিডির হিসাবে, ই-থ্রি-হুইলারগুলো দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। এর পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট। ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে ৩ হাজার ৩০০টি। এর বাইরে প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। এসব অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

এদিকে ঢাকার ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুচ্চালিত ব্যবস্থায় নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। বৃহস্পতিবার শাহবাগ মোড়ে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক উদ্বোধন শেষে তিনি এ কথা বলেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশে ব্যাটারিচালিত তিন ধরনের ত্রিচক্র যান রয়েছে। এর একটি হলো প্যাডেলচালিত রিকশা, যেগুলোতে ব্যাটারি সংযুক্ত করে অটোরিকশা হিসেবে চালানো হচ্ছে। দ্বিতীয়টি রিকশার আদলে নতুন করে তৈরি হুডবিশিষ্ট অটোরিকশা। তৃতীয়টি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক। রাজধানীতে অটোরিকশার ব্যবহার বেশি। ঢাকার বাইরে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক বেশি চলাচল করে। মফস্বলসহ শহর এলাকায় ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়িও ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশার বিশৃঙ্খল চলাচল, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, ইউটার্ন নেওয়া এবং মূল সড়কে উঠে আসার প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বাস, রিকশা, ইজিবাইক ও ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে সমন্বিত রুট পরিকল্পনা না থাকায় শহরের পরিবহন ব্যবস্থার ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। এর সঙ্গে চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের মান এবং ফিটনেস নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতা থাকায় সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকিও বেড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব যান পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা সম্ভব। নির্দিষ্ট রুট ও লেন নির্ধারণ, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং নিবন্ধন ও ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বড় শহরের প্রধান সড়ক থেকে ধীরগতির ইজিবাইক সরিয়ে ফিডার রুটে চালানো এবং বাসসহ আধুনিক গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে শেষ মাইলের যাতায়াতে এসব যান কাজে লাগানো যেতে পারে।

/এফসি/