ইরান যুদ্ধে সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি

ইরান যুদ্ধে সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি
মরিয়ম সেঁজুতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসারায়েল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধের ব্যাপকতা আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানি থেকে শুরু করে রেমিট্যান্স, রপ্তানি বাণিজ্যসহ দেশের অর্থনীতির সূচকগুলোর শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়টি এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। তাই এই অঞ্চলে যুদ্ধ চলতে থাকায় অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। দেশে ব্যবহৃত অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে। এ ছাড়া কাতার থেকে আমদানি করা হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে তরলীকৃত এলএনজি আমদানি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, রেমিট্যান্স- সব খাতেই চাপ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরকরাহ করা হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বা জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আর বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম দেশ কাতার ২ মার্চ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংকটের আশঙ্কায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার। শনিবার পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে এলএনজি কেনার সত্যতা নিশ্চিত করছেন।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ হলে সরকারকে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সংকট মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার এবং জরুরিভাব রপ্তানিকারকদের সহায়তা দিতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি উপকরণের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত হলে বাংলাদেশে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উৎপাদনও কমবে। বাড়বে পণ্যের দাম। রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা
জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। ট্রাক, বাস ও নৌপরিবহনের ভাড়া বাড়লে বাজারে চাল, ডাল, সবজি, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন নানা ধরনের সংকট মোকাবিলা করছে। বিনিয়োগে খরা চলছে, শিল্প খাতও চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে এবং দাম বাড়বে।
নিত্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন ভোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊল্লম্ফন হলে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, ভোজ্যতেল, সার ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে।

রপ্তানি বাণিজ্যে পরিবহন ব্যয় বাড়ার শঙ্কা
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক রুটের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের জাহাজগুলো সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এই পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তখন শিপিং কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করে, যা পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করলে পণ্য পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় লাগে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
নিট পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিকেএমই-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের অনেক কাঁচামাল মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে আসে। আবার রপ্তানি পণ্যও একই রুট দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় যায়। ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় অনেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বাড়বে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
শিল্প খাতে উৎপাদন সংকট
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প খাতে গ্যাস সংকট তীব্র। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, স্টিলসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন কমে যাবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কৃষি ও সার আমদানিতে প্রভাব
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানি করা সারের ওপর। কাতার, সৌদি আরব ও ওমান থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরিয়া সার আমদানি করে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে সারের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে অথবা দাম বাড়তে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রেমিট্যান্স কমার আশঙ্কা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স। এর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত বা কাতারের মতো দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসতে পারেন।

এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জনই গিয়েছেন সৌদি আরবে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য কাতার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান। যুদ্ধের কারণে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের বেশ কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জুলাই থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা ২৩ হাজার ২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮ হাজার ৭৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ফেব্রুয়ারিতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব থেকে। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৯ কোটি ১১ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়া শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় আরও রয়েছে যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ওমান, কুয়েত, সিঙ্গাপুর ও কাতার।
সতর্ক অবস্থানে সরকার
ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব হবে গভীর ও বহুমাত্রিক।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসারায়েল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধের ব্যাপকতা আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানি থেকে শুরু করে রেমিট্যান্স, রপ্তানি বাণিজ্যসহ দেশের অর্থনীতির সূচকগুলোর শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়টি এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। তাই এই অঞ্চলে যুদ্ধ চলতে থাকায় অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। দেশে ব্যবহৃত অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে। এ ছাড়া কাতার থেকে আমদানি করা হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে তরলীকৃত এলএনজি আমদানি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, রেমিট্যান্স- সব খাতেই চাপ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরকরাহ করা হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বা জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আর বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম দেশ কাতার ২ মার্চ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংকটের আশঙ্কায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার। শনিবার পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে এলএনজি কেনার সত্যতা নিশ্চিত করছেন।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ হলে সরকারকে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সংকট মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার এবং জরুরিভাব রপ্তানিকারকদের সহায়তা দিতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি উপকরণের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত হলে বাংলাদেশে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উৎপাদনও কমবে। বাড়বে পণ্যের দাম। রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা
জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। ট্রাক, বাস ও নৌপরিবহনের ভাড়া বাড়লে বাজারে চাল, ডাল, সবজি, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন নানা ধরনের সংকট মোকাবিলা করছে। বিনিয়োগে খরা চলছে, শিল্প খাতও চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে এবং দাম বাড়বে।
নিত্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন ভোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊল্লম্ফন হলে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, ভোজ্যতেল, সার ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে।

রপ্তানি বাণিজ্যে পরিবহন ব্যয় বাড়ার শঙ্কা
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক রুটের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের জাহাজগুলো সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এই পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তখন শিপিং কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করে, যা পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করলে পণ্য পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় লাগে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
নিট পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিকেএমই-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের অনেক কাঁচামাল মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে আসে। আবার রপ্তানি পণ্যও একই রুট দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় যায়। ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় অনেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বাড়বে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
শিল্প খাতে উৎপাদন সংকট
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প খাতে গ্যাস সংকট তীব্র। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, স্টিলসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন কমে যাবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কৃষি ও সার আমদানিতে প্রভাব
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানি করা সারের ওপর। কাতার, সৌদি আরব ও ওমান থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরিয়া সার আমদানি করে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে সারের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে অথবা দাম বাড়তে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রেমিট্যান্স কমার আশঙ্কা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স। এর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত বা কাতারের মতো দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসতে পারেন।

এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জনই গিয়েছেন সৌদি আরবে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য কাতার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান। যুদ্ধের কারণে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের বেশ কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জুলাই থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা ২৩ হাজার ২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮ হাজার ৭৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ফেব্রুয়ারিতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব থেকে। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৯ কোটি ১১ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়া শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় আরও রয়েছে যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ওমান, কুয়েত, সিঙ্গাপুর ও কাতার।
সতর্ক অবস্থানে সরকার
ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব হবে গভীর ও বহুমাত্রিক।

ইরান যুদ্ধে সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি
মরিয়ম সেঁজুতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসারায়েল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধের ব্যাপকতা আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানি থেকে শুরু করে রেমিট্যান্স, রপ্তানি বাণিজ্যসহ দেশের অর্থনীতির সূচকগুলোর শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়টি এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। তাই এই অঞ্চলে যুদ্ধ চলতে থাকায় অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। দেশে ব্যবহৃত অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে। এ ছাড়া কাতার থেকে আমদানি করা হয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে তরলীকৃত এলএনজি আমদানি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, রেমিট্যান্স- সব খাতেই চাপ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরকরাহ করা হয়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বা জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আর বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম দেশ কাতার ২ মার্চ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংকটের আশঙ্কায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে সরকার। শনিবার পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে এলএনজি কেনার সত্যতা নিশ্চিত করছেন।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ হলে সরকারকে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সংকট মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার এবং জরুরিভাব রপ্তানিকারকদের সহায়তা দিতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি উপকরণের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত হলে বাংলাদেশে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উৎপাদনও কমবে। বাড়বে পণ্যের দাম। রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা
জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। ট্রাক, বাস ও নৌপরিবহনের ভাড়া বাড়লে বাজারে চাল, ডাল, সবজি, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন নানা ধরনের সংকট মোকাবিলা করছে। বিনিয়োগে খরা চলছে, শিল্প খাতও চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে এবং দাম বাড়বে।
নিত্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন ভোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊল্লম্ফন হলে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য, ভোজ্যতেল, সার ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে।

রপ্তানি বাণিজ্যে পরিবহন ব্যয় বাড়ার শঙ্কা
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক রুটের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের জাহাজগুলো সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এই পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তখন শিপিং কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করে, যা পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করলে পণ্য পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় লাগে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
নিট পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিকেএমই-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের অনেক কাঁচামাল মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে আসে। আবার রপ্তানি পণ্যও একই রুট দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় যায়। ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় অনেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বাড়বে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
শিল্প খাতে উৎপাদন সংকট
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প খাতে গ্যাস সংকট তীব্র। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, স্টিলসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন কমে যাবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কৃষি ও সার আমদানিতে প্রভাব
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভর করে আমদানি করা সারের ওপর। কাতার, সৌদি আরব ও ওমান থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইউরিয়া সার আমদানি করে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে সারের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে অথবা দাম বাড়তে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রেমিট্যান্স কমার আশঙ্কা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স। এর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত বা কাতারের মতো দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসতে পারেন।

এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জনই গিয়েছেন সৌদি আরবে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য কাতার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, কুয়েত, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান। যুদ্ধের কারণে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক উপসাগরীয় দেশ তাদের বেশ কিছু কার্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জুলাই থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা ২৩ হাজার ২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮ হাজার ৭৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ফেব্রুয়ারিতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব থেকে। দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৯ কোটি ১১ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়া শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় আরও রয়েছে যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ওমান, কুয়েত, সিঙ্গাপুর ও কাতার।
সতর্ক অবস্থানে সরকার
ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব হবে গভীর ও বহুমাত্রিক।




