খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মাস্টারপ্ল্যান’

খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মাস্টারপ্ল্যান’
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বর্তমানে খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। খাদের কিনারায় থাকা ব্যাংক খাতকে টেনে তুলতে এবার ত্রিমুখী কৌশল হাতে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথম ধাপে সুদ মওকুফের মতো আকর্ষণীয় সুবিধা দিয়ে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হবে। এতে ব্যর্থ হলে চরম কঠোরতার পথে হাঁটবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে ব্যাংক পরিচালকদের মালিকানা কেড়ে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু নতুন আইন করলেই হবে না। প্রয়োজন- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা। দুর্বল ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা। ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন জোরদার করা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের কার্যকর নীতি। ঋণ আদায়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কেনার বিষয়টি কতটুকু কার্যকর হবে, তা দেখার বিষয়। কেননা, এখানে ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জামানত বা বেশি দর দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে। ফলে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য আগে বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বার বার নতুন নতুন আইন করলেই হবে না, ব্যাংকগুলোকে আগে ঠিক পথে আনতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ড. মুজেরী বলেন, আমাদের দেশে আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। এ বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সবার আগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্তা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ও বর্তমান পরিস্থিতি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এই পাহাড়সম খেলাপি ঋণ কমিয়ে চলতি বছরের শেষে ২০ শতাংশে এবং আগামী বছর শেষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি কঠিন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে একাধিক বৈঠকের পর খেলাপি ঋণ আদায়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ২১টি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ: শুরুতে নমনীয়তা
ব্যাংক খাতে নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিলের কোনো বিশেষ নীতিমালা আর থাকছে না। তবে গত ২৯ জুন জারি করা ‘এক্সিট পলিসি’র আওতায় আপাতত শুধু মূল ঋণ পরিশোধের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। খেলাপিদের উৎসাহিত করতে আয় খাতে নেওয়া সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ শিথিল সুবিধা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। ঋণ আদায়ের জন্য এটিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘প্রথম সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যমেয়াদি উদ্যোগ: খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ ও চাপ প্রয়োগ
যারা এ নমনীয় নীতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংকের টাকা শোধ করবেন না, তাদের সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগের কৌশল নেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করা হবে। এই তালিকা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন– বিমানবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখাগুলোর সামনে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা হবে। ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি, ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ: কঠোর আইনি সংস্কার
খেলাপিরা যেন আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান যুক্ত করা হবে। খেলাপিরা যেন সহজে রিট করে ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য রিট করার আগে অনাদায়ী ঋণের অন্তত অর্ধেক বা নির্দিষ্ট একটি অংশ জমা দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান প্রস্তাব করা হবে। একজন গ্রাহক যেন চাইলেই পুরো ব্যাংক খাত থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নিতে না পারেন তার জন্য সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে। এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের জন্য ব্যাংকের পরিবর্তে বন্ড ইস্যু করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরিচালকদের চরম পরিণতি
ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের আলোকে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতি বের করে তা পূরণের জন্য ব্যাংক পরিচালকদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা তাদের ব্যাংকের মালিকানা হারাবেন। এভাবে একবার কারও মালিকানা গেলে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তিনি অন্য কোন ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্যতাও হারাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের জন্য একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে। এই কোম্পানির কাছে খেলাপি গ্রহীতার বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হবে।
তবে সম্পদ বিক্রি করলেই খেলাপিরা পুরোপুরি দায়মুক্তি পাবেন না। উদাহরণস্বরূপ— সুদসহ কোনো খেলাপির কাছে ব্যাংকের পাওনা যদি ১ হাজার কোটি টাকা হয় এবং তার বন্ধকি সম্পদ যদি ১০০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়, তবে তিনি কেবল ১০০ কোটি টাকার দায়মুক্তি পাবেন। বাকি ৯০০ কোটি টাকার জন্য তিনি যথারীতি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
কেন এই সাঁড়াশি অভিযান?
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে বিশেষ সুবিধায় ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তবুও গত বছর পর্যন্ত পুনঃতফসিলের পর অনাদায়ী ঋণ স্থিতি রয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। কাগজে-কলমে সুবিধা দেওয়া হলেও প্রকৃত ঋণ আদায় হয়েছে খুবই সামান্য। গত বছর শেষে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ! ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল মূলধন ঘাটতির কারণে গত বছর ৫২টি দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৭টি মুনাফা করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, খেলাপি ঋণ কমানোকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

বর্তমানে খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। খাদের কিনারায় থাকা ব্যাংক খাতকে টেনে তুলতে এবার ত্রিমুখী কৌশল হাতে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথম ধাপে সুদ মওকুফের মতো আকর্ষণীয় সুবিধা দিয়ে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হবে। এতে ব্যর্থ হলে চরম কঠোরতার পথে হাঁটবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে ব্যাংক পরিচালকদের মালিকানা কেড়ে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু নতুন আইন করলেই হবে না। প্রয়োজন- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা। দুর্বল ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা। ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন জোরদার করা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের কার্যকর নীতি। ঋণ আদায়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কেনার বিষয়টি কতটুকু কার্যকর হবে, তা দেখার বিষয়। কেননা, এখানে ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জামানত বা বেশি দর দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে। ফলে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য আগে বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বার বার নতুন নতুন আইন করলেই হবে না, ব্যাংকগুলোকে আগে ঠিক পথে আনতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ড. মুজেরী বলেন, আমাদের দেশে আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। এ বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সবার আগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্তা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ও বর্তমান পরিস্থিতি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এই পাহাড়সম খেলাপি ঋণ কমিয়ে চলতি বছরের শেষে ২০ শতাংশে এবং আগামী বছর শেষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি কঠিন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে একাধিক বৈঠকের পর খেলাপি ঋণ আদায়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ২১টি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ: শুরুতে নমনীয়তা
ব্যাংক খাতে নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিলের কোনো বিশেষ নীতিমালা আর থাকছে না। তবে গত ২৯ জুন জারি করা ‘এক্সিট পলিসি’র আওতায় আপাতত শুধু মূল ঋণ পরিশোধের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। খেলাপিদের উৎসাহিত করতে আয় খাতে নেওয়া সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ শিথিল সুবিধা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। ঋণ আদায়ের জন্য এটিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘প্রথম সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যমেয়াদি উদ্যোগ: খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ ও চাপ প্রয়োগ
যারা এ নমনীয় নীতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংকের টাকা শোধ করবেন না, তাদের সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগের কৌশল নেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করা হবে। এই তালিকা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন– বিমানবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখাগুলোর সামনে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা হবে। ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি, ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ: কঠোর আইনি সংস্কার
খেলাপিরা যেন আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান যুক্ত করা হবে। খেলাপিরা যেন সহজে রিট করে ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য রিট করার আগে অনাদায়ী ঋণের অন্তত অর্ধেক বা নির্দিষ্ট একটি অংশ জমা দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান প্রস্তাব করা হবে। একজন গ্রাহক যেন চাইলেই পুরো ব্যাংক খাত থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নিতে না পারেন তার জন্য সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে। এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের জন্য ব্যাংকের পরিবর্তে বন্ড ইস্যু করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরিচালকদের চরম পরিণতি
ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের আলোকে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতি বের করে তা পূরণের জন্য ব্যাংক পরিচালকদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা তাদের ব্যাংকের মালিকানা হারাবেন। এভাবে একবার কারও মালিকানা গেলে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তিনি অন্য কোন ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্যতাও হারাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের জন্য একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে। এই কোম্পানির কাছে খেলাপি গ্রহীতার বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হবে।
তবে সম্পদ বিক্রি করলেই খেলাপিরা পুরোপুরি দায়মুক্তি পাবেন না। উদাহরণস্বরূপ— সুদসহ কোনো খেলাপির কাছে ব্যাংকের পাওনা যদি ১ হাজার কোটি টাকা হয় এবং তার বন্ধকি সম্পদ যদি ১০০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়, তবে তিনি কেবল ১০০ কোটি টাকার দায়মুক্তি পাবেন। বাকি ৯০০ কোটি টাকার জন্য তিনি যথারীতি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
কেন এই সাঁড়াশি অভিযান?
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে বিশেষ সুবিধায় ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তবুও গত বছর পর্যন্ত পুনঃতফসিলের পর অনাদায়ী ঋণ স্থিতি রয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। কাগজে-কলমে সুবিধা দেওয়া হলেও প্রকৃত ঋণ আদায় হয়েছে খুবই সামান্য। গত বছর শেষে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ! ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল মূলধন ঘাটতির কারণে গত বছর ৫২টি দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৭টি মুনাফা করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, খেলাপি ঋণ কমানোকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মাস্টারপ্ল্যান’
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বর্তমানে খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। খাদের কিনারায় থাকা ব্যাংক খাতকে টেনে তুলতে এবার ত্রিমুখী কৌশল হাতে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথম ধাপে সুদ মওকুফের মতো আকর্ষণীয় সুবিধা দিয়ে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হবে। এতে ব্যর্থ হলে চরম কঠোরতার পথে হাঁটবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে ব্যাংক পরিচালকদের মালিকানা কেড়ে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমাতে শুধু নতুন আইন করলেই হবে না। প্রয়োজন- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা। দুর্বল ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা। ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন জোরদার করা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের কার্যকর নীতি। ঋণ আদায়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও আদালতের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কেনার বিষয়টি কতটুকু কার্যকর হবে, তা দেখার বিষয়। কেননা, এখানে ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জামানত বা বেশি দর দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে। ফলে বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য আগে বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বার বার নতুন নতুন আইন করলেই হবে না, ব্যাংকগুলোকে আগে ঠিক পথে আনতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ড. মুজেরী বলেন, আমাদের দেশে আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। এ বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সবার আগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্তা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ও বর্তমান পরিস্থিতি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এই পাহাড়সম খেলাপি ঋণ কমিয়ে চলতি বছরের শেষে ২০ শতাংশে এবং আগামী বছর শেষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি কঠিন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের নেতৃত্বে একাধিক বৈঠকের পর খেলাপি ঋণ আদায়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মোট ২১টি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ: শুরুতে নমনীয়তা
ব্যাংক খাতে নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিলের কোনো বিশেষ নীতিমালা আর থাকছে না। তবে গত ২৯ জুন জারি করা ‘এক্সিট পলিসি’র আওতায় আপাতত শুধু মূল ঋণ পরিশোধের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। খেলাপিদের উৎসাহিত করতে আয় খাতে নেওয়া সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ শিথিল সুবিধা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। ঋণ আদায়ের জন্য এটিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘প্রথম সুযোগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যমেয়াদি উদ্যোগ: খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ ও চাপ প্রয়োগ
যারা এ নমনীয় নীতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংকের টাকা শোধ করবেন না, তাদের সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগের কৌশল নেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করা হবে। এই তালিকা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন– বিমানবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখাগুলোর সামনে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা হবে। ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি, ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ: কঠোর আইনি সংস্কার
খেলাপিরা যেন আইনের ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান যুক্ত করা হবে। খেলাপিরা যেন সহজে রিট করে ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য রিট করার আগে অনাদায়ী ঋণের অন্তত অর্ধেক বা নির্দিষ্ট একটি অংশ জমা দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান প্রস্তাব করা হবে। একজন গ্রাহক যেন চাইলেই পুরো ব্যাংক খাত থেকে ইচ্ছেমতো ঋণ নিতে না পারেন তার জন্য সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে। এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের জন্য ব্যাংকের পরিবর্তে বন্ড ইস্যু করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরিচালকদের চরম পরিণতি
ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের আলোকে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতি বের করে তা পূরণের জন্য ব্যাংক পরিচালকদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা তাদের ব্যাংকের মালিকানা হারাবেন। এভাবে একবার কারও মালিকানা গেলে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তিনি অন্য কোন ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার যোগ্যতাও হারাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের জন্য একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে। এই কোম্পানির কাছে খেলাপি গ্রহীতার বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হবে।
তবে সম্পদ বিক্রি করলেই খেলাপিরা পুরোপুরি দায়মুক্তি পাবেন না। উদাহরণস্বরূপ— সুদসহ কোনো খেলাপির কাছে ব্যাংকের পাওনা যদি ১ হাজার কোটি টাকা হয় এবং তার বন্ধকি সম্পদ যদি ১০০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়, তবে তিনি কেবল ১০০ কোটি টাকার দায়মুক্তি পাবেন। বাকি ৯০০ কোটি টাকার জন্য তিনি যথারীতি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
কেন এই সাঁড়াশি অভিযান?
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে বিশেষ সুবিধায় ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তবুও গত বছর পর্যন্ত পুনঃতফসিলের পর অনাদায়ী ঋণ স্থিতি রয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। কাগজে-কলমে সুবিধা দেওয়া হলেও প্রকৃত ঋণ আদায় হয়েছে খুবই সামান্য। গত বছর শেষে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ! ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল মূলধন ঘাটতির কারণে গত বছর ৫২টি দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৭টি মুনাফা করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, খেলাপি ঋণ কমানোকেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সময় নির্ধারণ
মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে তদন্ত করবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক
রপ্তানি আয় ১৫ শতাংশ বাড়াতে চায় সরকার






