শিরোনাম

মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে তদন্ত করবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে তদন্ত করবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো (বাঁয়ে) ও মো. সাহাবুদ্দিন (ডানে)। কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো তদন্ত করবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্তের সময় তার বা অন্য কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রবিবার (২৬ জুলাই) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, মো. সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে তাকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক পৃথকভাবে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালনা করবে না। তবে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং আর্থিক অনিয়ম নিয়ে যে তদন্ত চলছে, সেখানে যদি কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে, তাহলে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্বলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমেই অনিয়ম উদ্ঘাটনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরও বলেন, যিনিই জড়িত থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নেবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেসরকারি ৫ ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। একীভূত করার আগে ৫ ব্যাংকের উপর বিশেষ ফরেনসিক অডিট করা হয়। এছাড়াও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের উপরও বিশেষ ফরেনসিক অডিট করা হয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগ অর্থাৎ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাহাবুদ্দিন এ ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের জেএমসি বিল্ডার্সের পক্ষে ২০১৭ সালের জুনে ব্যাংকটির পরিচালক নিযুক্ত হন।

এর আগে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্প গ্রুপ এস আলম গ্রুপ। কাগুজে প্রতিষ্ঠান জেএমসি বিল্ডার্সের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামের খাতুন গঞ্জে দেখানো হলেও বাস্তবতে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে নিবন্ধন নেয়। আবাসন খাতের বড় প্রতিষ্ঠান দাবি করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহাবসহ অন্য কোনো সংগঠনের সদস্য নয়। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়, এস আলম গ্রুপের বেনামি প্রতিষ্ঠান জেএমসি বিল্ডার্স। এই প্রতিষ্ঠানের নামে বেসরকারি আরেকটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই অর্থে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনে পরিচালক হয় জেএমসি বিল্ডার্স। তবে পর্ষদের সদস্য হিসেবে প্রতিনিধি পরিচালক করা হয় মো. সাহাবুদ্দিনকে।

২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি ঋণ কেলেঙ্কারিগুলো হয়। তারই প্রভাবে ব্যাংকটি এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। অভিযোগ রয়েছে, ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ২৪টি কোম্পানি ইসলামী ব্যাংকের মোট শেয়ারের মধ্যে ৮১ শতাংশের মালিক বনে যায়। ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২৪ কোম্পানির নাম পায়। উচ্চ আদালতে এ বিষয়ে বিএফআইইউ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনকে(দুদক) তা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত চলাকালে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় নাম আসা অভিযুক্তদের বিদেশ সফরেও নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। উল্লেখ্য, বুধবার (২৯ জুলাই) এই বিষয়ে শুনানির পরবর্তী তারিখ দিয়ে রেখেছে উচ্চ আদালত। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের সাবেক সদস্য হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের নামও আলোচিত হচ্ছে সেই মামলায়।

আরিফ হোসেন বলেন, গ্রাহকরা ব্যাংকের কাস্টমার। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তদারকি করে। তদন্তের সময় কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কোনো ব্যক্তি অনিয়ম করলে, সেই অনিয়মের সাথে পর্ষদ জড়িত কিনা সেটাও দেখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কোনো ব্যক্তি বিশেষকে ‘টার্গেট’ করে অনুসন্ধান করে না। কোনো ঘটনার অনুসন্ধানে কারো নাম বেরিয়ে আসলে তা করে।

‘উদ্দেশ্যপ্রণদিতভাবে’ কারো উপর তদন্ত চালানো হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটা ব্যাংক নিজেরাই অডিট করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও করে এবং এক্সটার্নাল (বহিঃখাত) অডিটও হয়। এটা কোনো ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে করা হয় না। বিশেষ প্রায়োরিটি নিয়ে কিংবা টার্গেট করে কাজ করছে, এমনও হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রপতি পদে নাম আসার পরে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পদ ছাড়েন মো. সাহাবুদ্দিন। সেই সময়ে অর্থাৎ ২০২৩ সালে ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন এস আলমের সন্তান আহসানুল আলম। চব্বিশের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে ডজন খানেক ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে সাজায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত দুই বছরে দুই বার পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর এখনো পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠন করা হয়নি। এক সদস্য বিশিষ্ট কমিটি দিয়ে চলছে বেসরকারি খাতে বড় ব্যাংকটি।

/এমএকে/