অনলাইন জুয়ায় ঝুঁকিতে আর্থিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অনলাইন জুয়ায় ঝুঁকিতে আর্থিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

অনলাইনে জুয়া খেলার জন্য একটি অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ব্যবহারকারী হয়তো ভাবছেন, সামান্য টাকা দিয়ে খেলছেন। কিন্তু সেই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে দেওয়া মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ, পরিচয় যাচাইয়ের তথ্য এবং লেনদেনের রেকর্ড কোথায় যাচ্ছে-সেসব খবর অনেকেই রাখে না। ফলে অনলাইন জুয়া এখন শুধু অর্থ হারানোর ঝুঁকি নয়, বরং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যও সাইবার অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজার কতটা বড় হয়েছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তথ্য থেকে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জিইডির তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আনুমানিক আকার ৬ কোটি ২০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এ বাজার প্রতিবছর ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড হলেও ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাসহ (এমএফএস) বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে এর অর্থ লেনদেন হচ্ছে। জুয়ার অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত এক হাজারের বেশি এজেন্টের সন্ধান পাওয়ার কথাও জানিয়েছে জিইডি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনলাইন বেটিং, জুয়া ও সংশ্লিষ্ট অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যাংক হিসাবগুলোতে ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা ডেবিট এবং ১ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ক্রেডিট লেনদেন হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে বেতনভোগী পেশাজীবীদের হিসাবে ডেবিট ৬৪১ কোটি ও ক্রেডিট ৬৪২ কোটি টাকা। গৃহিণীদের হিসাবে ডেবিট ৩৭১ কোটি এবং ক্রেডিট ৩৪৭ কোটি টাকা। কৃষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হিসাবে ডেবিট ২৩১ কোটি এবং ক্রেডিট ২৩২ কোটি টাকা। শিক্ষার্থীদের হিসাবেও ডেবিট ১৯৪ কোটি এবং ক্রেডিট ১৭৫ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ।

অর্থাৎ অনলাইন জুয়া কোনো নির্দিষ্ট বয়স, পেশা কিংবা শ্রেণির মধ্যে আটকে নেই। চাকরিজীবী, গৃহিণী, কৃষক ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এর আর্থিক নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ছেন। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের অর্থ এ পথে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ যুক্ত হওয়ায় ক্ষতির মাত্রাও হতে পারে আরও বেশি। কারণ তাদের ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাইবার অপরাধীদের কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।

যেসব অ্যাপ ব্যবহার করে অনলাইনে জুয়া খেলা হয় সেগুলোর একটি তালিকা পাওয়া গেছে। এগুলো সাইবারলট, বোনানজা, বিগ বাক্স ব্যান্ডিট, ক্রিসমাস, লাকি, বুক অফ গডস, বোনানজা মেগাওয়েজ, চকলেটস, টেম্পল অফ ট্রেজার, হোলি ডাইভার, কিং অফ ক্যাটস, গোল্ডেন গ্যালন, মনোপলি মেগাওয়েজ, কুইন অফ রিচেস, ট্রিগার হ্যাপি, কুইন অফ এম্বারস, বার্গারস, বিগ বক্স, মনোপলি, হু ওয়ান্টস টু বি আ মিলিয়নিয়ার এবং অ্যাটলান্টিস মেগাওয়েজের নামে পরিচিত। ধারণা করা হচ্ছে, এসব অ্যাপ থেকেই গ্রাহকদের তথ্য বেহাত হয়েছে।

জুয়ার টাকা যাচ্ছে কোন পথে

অনলাইন জুয়ার আর্থিক ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন- এই অর্থের শেষ গন্তব্য কোথায়, কোন পথে যাচ্ছে?

এবিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেনের মতে, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল প্রতারণার সঙ্গে একটি বড় ধরনের ‘শ্যাডো ইকোনমি’ তৈরি হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, প্রতারণার মাধ্যমে এমএফএসে আসা অর্থ স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে দ্রুত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করার সুযোগ রয়েছে। এতে প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং বিদেশে অর্থ পাচারের পথও সহজ হতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতেও অনলাইন জুয়ার পেছনে গড়ে ওঠা প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর নমুনা পাওয়া যাচ্ছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশীর একটি বহুতল ভবন থেকে চীন, পাকিস্তান, লাওস ও ভিয়েতনামের ৬২ নাগরিককে আটক করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে ৭০টির বেশি ল্যাপটপ ও মোবাইলসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ হলে তাঁদের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

এর আগে কক্সবাজারে কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্টে অবস্থান করা প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা নাগরিককে ঘিরে সন্দেহজনক একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পায় পুলিশ। অভিযানে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ওই নেটওয়ার্কের সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জুয়া, ডিজিটাল ক্যাসিনো, ভুয়া ট্রেডিং ওয়েবসাইট ও হ্যাকিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে।

আগস্টে ভাটারার আরেক অভিযানে ছয় হাজারের বেশি সক্রিয় সিমকার্ড ও ২০টি গেটওয়ে ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে তিনজনই চীনা নাগরিক। ভুয়া চাকরি ও অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পরিচালিত একটি অনলাইন জুয়া নেটওয়ার্কের সঙ্গে এ কার্যক্রমের যোগসূত্রের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

ফলে অনলাইন জুয়ার অবকাঠামো এখন কেবল একটি ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সিমকার্ড, গেটওয়ে, ভুয়া পরিচয়, ডিজিটাল পেমেন্ট, এজেন্ট নেটওয়ার্ক এবং সীমান্তপারের অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বিদেশি নাগরিকদের এ ধরনের তৎপরতা ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদেরও আইনের আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।

জুয়ার অ্যাকাউন্টের তথ্য এখন ডার্ক ওয়েবে

অনলাইন জুয়ার আর্থিক ঝুঁকির পাশাপাশি সামনে এসেছে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও। সাইবার অপরাধীদের একটি চক্র সম্প্রতি ডার্ক ওয়েবে বাংলাদেশি অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবহারকারীদের তথ্যের একটি ডাটাবেজ বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। এতে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ব্যবহারকারীর তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।

ডাটাবেজটির একটি স্যাম্পল এক্সেল ফাইলে বাংলাদেশিদের ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত তথ্য থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই করে কয়েকজনের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে মিলও পাওয়া গেছে। ফলে ডাটাবেজটি নিয়ে করা দাবি পুরোপুরি মনগড়া নয় - এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নেফেক্স-৭৮’নামে ডার্ক ওয়েব এবং ‘নেফেক্স দ্য ব্ল্যাকহ্যাট’ নামে টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ডাটাবেজটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাংলাদেশি অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবহারকারীদের। একই ডাটাসেট নিয়ে ‘ডার্ক ওয়েব ইন্টেলিজেন্স’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টেও প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার রেকর্ড থাকার দাবি করা হয়েছে।

পুরো ডাটাসেটের মূল্য চাওয়া হয়েছে ৭৮০ মার্কিন ডলার। অর্থ পরিশোধের জন্য বিটকয়েন বা মনেরোর কথা বলা হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতা দেখাতে স্যাম্পল ফাইলও প্রকাশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপনে যেসব তথ্য থাকার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ইউজার নেম, প্লেয়ার আইডি, ভিআইপি লেভেল, অ্যাফিলিয়েট ও এজেন্টের তথ্য, নাম, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, জন্মতারিখ, রেফারেল সাইট, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত তথ্য। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে সর্বশেষ ডিপোজিট, কেওয়াইসি (আপনার গ্রাহককে জানুন) যাচাইয়ের অবস্থা, কেওয়াইসি-সংক্রান্ত মন্তব্য এবং অ্যাকাউন্টের ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য থাকার কথাও বলা হয়েছে। ফলে শুধু একজন ব্যবহারকারীর পরিচয় বা যোগাযোগের তথ্যই নয়, তার অ্যাকাউন্ট ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের একটি চিত্রও অপরাধীদের হাতে চলে গেছে বলে ধারণা করা যায়।

/বিবি/