শিরোনাম

অক্সিজেনের খোঁজে বাবা, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো মেয়ে

সিটিজেন ডেস্ক
অক্সিজেনের খোঁজে বাবা, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো মেয়ে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে তখন উদ্বেগ আর অপেক্ষার সময় পার করছিলেন কক্সবাজারের আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আলম। নয় মাস বয়সী মেয়ে সুরাইয়া আলমের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন ছিল একটি হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা—বিশেষ ধরনের অক্সিজেন সরবরাহ যন্ত্রাংশ। সেটি জোগাড় করতে গত কয়েক ঘণ্টা ধরে ছোটাছুটি করছিলেন তিনি।

সোমবার (১৮ মে) দুপুর পৌনে দুইটার দিকে আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তার মুঠোফোনে কল আসে। ফোনের ওপাশে থাকা এক নার্স জানান, তার মেয়ে আর বেঁচে নেই।

ফোনে কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মোহাম্মদ আলম। তখনো তার হাতে ধরা ছিল নাজাল ক্যানুলার নাম লেখা একটি স্লিপ। কিছুক্ষণ আগেই তিনি একটি কোম্পানির প্রতিনিধিকে অনুরোধ করেছিলেন দ্রুত যন্ত্রাংশটি হাসপাতালে পৌঁছে দিতে। প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টাকা মূল্যের সেই যন্ত্রাংশ আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই থেমে যায় ছোট্ট সুরাইয়ার জীবন।

আইসিইউর ভেতরে ছিলেন শিশুটির মা ছেনোয়ারা বেগম। দরজা খুলে বাইরে এসে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আর কিছু লাগবে না… আমার মেয়ে নাই। আর কোনো অক্সিজেন পাইপ লাগবে না।’

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সুরাইয়ার শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল। পরে হামের জটিলতা থেকে তার মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা দেয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘মিজেলস এনসেফালাইটিস’ বলা হয়। এ ধরনের জটিলতায় উচ্চ জ্বর, খিঁচুনি, অচেতনতা, আচরণগত পরিবর্তন ও স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম পেশায় একজন আলোকচিত্রী। সৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে সংসার চালাতেন তিনি। মেয়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে কয়েক দিন আগে নিজের একমাত্র আয়ের উৎস ক্যামেরাটিও বিক্রি করে দেন। তারপরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি।

বিকেল তিনটার দিকে সুরাইয়ার মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। সন্তানের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা ছেনোয়ারা বেগম। পেছনে হাঁটছিলেন মোহাম্মদ আলম। সন্তানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলছিলেন, ‘আদরের ধন বেশি দিন থাকে না ভাই।’

হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার সংক

সোমবার দুপুর পর্যন্তও মেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার খোঁজ করছিলেন মোহাম্মদ আলম। বাজারে সহজে না পাওয়া এই যন্ত্রাংশের দাম প্রায় ১১ হাজার টাকা। কোথায় পাওয়া যাবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—এসব সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না তার।

নার্সদের কাছ থেকে একটি কোম্পানির প্রতিনিধির নম্বর নিয়ে বারবার যোগাযোগ করেন তিনি। দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যায় তার আগেই।

মেয়ের মৃত্যুর পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোহাম্মদ আলম প্রশ্ন তোলেন, ‘আইসিইউ থেকে একটা বাচ্চাও কেন সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে না? এই পাইপ ছিল না কেন? এগুলো তো আইসিইউতে থাকার কথা। আগে কেন বলা হলো না? আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার বাচ্চাটা মারা গেল।’

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুরাইয়ার জন্য যে যন্ত্রাংশ প্রয়োজন ছিল সেটি মূলত রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে নাকে উচ্চ প্রবাহে উষ্ণ ও আর্দ্র অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়, যা গুরুতর শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, শিশু আইসিইউর ২০ শয্যার মধ্যে ১৫টিতেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশু ভর্তি রয়েছে। আইসিইউতে মোট ১২টি হাই ফ্লো মেশিন থাকলেও অন্তত দুটি নষ্ট অবস্থায় রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, শিশু আইসিইউটি মূলত অনুদানে পরিচালিত। অধিকাংশ যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তা চিকিৎসক বা রোগীর স্বজনদের অর্থে কিনতে হয়। সুরাইয়ার ক্ষেত্রেও প্রথমে দেওয়া মেশিনে ফুটো ছিল, পরে অন্যটিতেও সমস্যা দেখা দেয়।

এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, ২০ শয্যার শিশু আইসিইউর মধ্যে ১০টি অনুদানের এবং ১০টি সরকারি। পুরো হাসপাতালে ৪১টি হাই ফ্লো মেশিন রয়েছে। রোগীর পরিবারের পক্ষে এইচএফএনসি কেনা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

১৪ ঘণ্টায় চার শিশুর মৃত্যু

চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রোববার রাত ১২টা থেকে সোমবার দুপুর দুইটা পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল সুরাইয়াও। একই সময়ে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল আরও ১৪ শিশু।

এর আগে শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত একই ধরনের উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়।

তবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে এ মৃত্যুর সংখ্যা ভিন্ন। কার্যালয়টির দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৪৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯ জন নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত জেলায় হামে নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে একজনের, আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আটজন। হাম শনাক্ত হয়েছে ১২৯ জনের শরীরে।

/এমআর/