এক খালের দুই চিত্র: কোথাও প্রশস্ত, কোথাও সরু নালা

এক খালের দুই চিত্র: কোথাও প্রশস্ত, কোথাও সরু নালা
নন্দীপাড়া এলাকায় জিরানী খালের প্রশস্ত অংশে জমেছে ময়লা-আবর্জনা। মঙ্গলবার দুপুরে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

একসময় খালটি ছিল স্থানীয় মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খালটিতে নিয়মিত নৌকা চলাচল করত। মানুষ গোসল থেকে শুরু করে রান্নার কাজেও খালের পানি ব্যবহার করত। নৌকায় করে খালের এপার-ওপার যাতায়াতের পাশাপাশি রামপুরার মেরাদিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে মালামাল বিক্রি করতে যেতেন স্থানীয়রা।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে খালের চিত্র। একসময় যে খাল ছিল স্বচ্ছ পানির প্রাণবন্ত জলপথ, বর্তমানে তার পানি দূষিত হয়ে একেবারেই কালো হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও খালটি কিছুটা প্রশস্ত অবস্থায় রয়েছে। আবার কোনো কোনো স্থানে দখলের কারণে খালের প্রশস্ততা কমে গিয়ে তা সরু নালায় পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর নন্দীপাড়ার জিরানী খালের এমন দুই রূপ যেন অতীত ও বর্তমানের এক স্পষ্ট চিত্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটি মতিঝিল সার্কেলের ধলপুর খাল থেকে উৎপত্তি হয়ে মান্ডা, রাজারবাগ, নন্দীপাড়া ও নাসিরাবাদ এলাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। খালটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৬ কিলোমিটার। কিন্তু খালের পাশে বক্স কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণ এবং অবৈধ স্থাপনার কারণে বর্তমানে এর দৈর্ঘ্য অনেক কমে গেছে।

এ ছাড়া, খালটির গড় প্রস্থ ছিল ২০ মিটার বা ৬৫ ফুটের বেশি। বর্তমানে এর প্রস্থ একেক জায়গায় একেক রকম। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, বর্তমানে খালটির দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৪ থেকে ২৫ মিটার।

দখল ও স্থাপনা নির্মাণে নন্দীপাড়া ব্রিজের এক পাশে জিরানী খাল সরু নালায় পরিণত হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
দখল ও স্থাপনা নির্মাণে নন্দীপাড়া ব্রিজের এক পাশে জিরানী খাল সরু নালায় পরিণত হয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নন্দীপাড়া এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নন্দীপাড়া ব্রিজের এক পাশে খালের প্রশস্ততা ভালো থাকলেও অন্য পাশে এটি মারাত্মকভাবে সরু হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ, অপরিকল্পিত কালভার্ট ও রাস্তাঘাট এবং বর্জ্য ও ময়লা জমে ভরাট হওয়ার কারণে ব্রিজের দুই পাশে খালের এই অসম অবস্থা তৈরি হয়েছে।

নন্দীপাড়া ব্রিজের বাম পাশে খালের অংশটি প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট চওড়া রয়েছে। খালের এই অংশেও বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। তবে খালের পানি একেবারেই ময়লাযুক্ত ও দূষিত হয়ে গেছে। পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং খালের গভীরতা নেই বললেই চলে। তবে খালের এই অংশে কিছুটা পানিপ্রবাহ থাকতে দেখা গেছে। খালের নোংরা পানির ওপর মশার লার্ভাও দেখা গেছে।

অন্যদিকে, ব্রিজের ডান পাশে খালের অংশে শত শত অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার ফলে খালের প্রস্থ একেবারেই সংকুচিত হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া, খালে পানিপ্রবাহ নেই বললেই চলে। খালের এই অংশের প্রস্থ ৫ থেকে ৬ ফুটের কাছাকাছি এবং সেখানে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতে দেখা গেছে।

নন্দীপাড়ার এই খাল ঘেঁষে চায়ের দোকান করেন মো. রাব্বি। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। তিনি এই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘এই খাল একসময় অনেক চওড়া ছিল। এখন যেখানে ব্রিজ করা হয়েছে, সেখানে আগে নৌকা ভিড়তে দেখেছি। আমি মাঝেমধ্যে খালে এসে গোসল করতাম। আগে মানুষ নৌকা দিয়ে খাল পার হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে আস্তে আস্তে খাল অবৈধভাবে দখল হতে শুরু করে। খালের পাশে রাস্তা করার কারণে খাল এখন চিকন হয়ে গেছে। ব্রিজের ডান পাশে তো অবস্থা আরও খারাপ। ওইটা তো নালা হয়ে গেছে।’

তার মতে, দখলমুক্ত করা না হলে ধীরে ধীরে পুরো খালটি একদিন নালায় পরিণত হবে।

মো. মাসুদ নামের নন্দীপাড়ার আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘চোখের সামনে কত বড় খাল আস্তে আস্তে চিকন হয়ে যাচ্ছে। খালের পাড়ে এলোপাতাড়ি ভবন নির্মাণ করে খালটি শেষ করে দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ময়লা-আবর্জনা ফেলায় খালের পানির যে অবস্থা, এখানে প্রচুর ডেঙ্গু মশার জন্ম হয়। মশা খালি কামড়ায়। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা প্রতিদিন এসে ফগিং করে আমাদের এলাকায়, তারপরও মশা কমে না।’

জিরানী খালের দূষিত পানিতে মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে। নন্দীপাড়া, ঢাকা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
জিরানী খালের দূষিত পানিতে মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে। নন্দীপাড়া, ঢাকা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

তার দাবি, জিরানী খালটি দখলমুক্ত করার পাশাপাশি খনন করা হোক। সেটি না করলে একদিন এই খালটি হারিয়ে যেতে পারে।

নগরপরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘নন্দীপাড়ার জিরানী খালের এক অংশ অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে সংকীর্ণ নালায় রূপ নিয়েছে। উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা, নদীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং নিয়মিত খননের অভাবে অবশিষ্টাংশও ভরাট হয়ে স্থানীয় এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রব সৃষ্টি করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সংকট নিরসনে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খালের সীমানা চিহ্নিত করে অবিলম্বে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। পাশাপাশি খালটি খনন করে বর্জ্যমুক্ত করা, দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে ও সবুজ বেষ্টনী নির্মাণ এবং স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সিটি করপোরেশনের আওতায় এনে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।’

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, জিরানী খালটি ‘ডিএসসিসির কালুনগর, মান্ডা, জিরানী ও শ্যামপুর খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের অধীনে সংস্কার করা হচ্ছে। ৮৯৮ দশমিক ৬১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে (জিওবি ৭০%, ডিএসসিসি ৩০%) ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা ডিএসসিসি।

আরও জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। খালভিত্তিক অগ্রগতির মধ্যে মান্ডা খাল ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, জিরানী খাল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ, কালুনগর খাল ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং শ্যামপুর খাল ২ দশমিক ০৫ শতাংশ।

প্রকল্পের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে চার খালের প্রায় ২০ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার পুনঃখনন ও স্লাজ অপসারণ, সীমানা নির্ধারণ ও স্লোপ প্রটেকশন। এ ছাড়া ৩২ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল, ৩৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার সুরক্ষা বেষ্টনী এবং ৩২ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে।

ল্যান্ডস্কেপিং, সবুজায়ন এবং পরিবেশ দূষণ রোধে ৮টি ইটিপি (ETP) নির্মাণ করা হবে।

সিএস রেকর্ড অনুযায়ী ১৪৯টি এবং পানি আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১ হাজার ৫৯০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খালের সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ উচ্ছেদের জটিলতা, অচল কালভার্ট অপসারণ, সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব এবং প্রয়োজনীয় জমির সীমিত প্রাপ্যতাকে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জিরানী খালের পাড়ে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের স্থাপনা। এতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে খালের প্রশস্ততা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
জিরানী খালের পাড়ে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের স্থাপনা। এতে সংকুচিত হয়ে পড়েছে খালের প্রশস্ততা। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

এদিকে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে জিরানী খাল পরিদর্শন করেন ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

এ সময় পরিদর্শনকালে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ডিএসসিসির নতুন যুক্ত হওয়া অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ, ড্রেনেজ ও অবকাঠামোগত সুবিধার জন্য বর্তমান সরকার পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিয়েছে। তবে একটি সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য আরও বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি নগরীর খালগুলোকে পুনরুদ্ধার ও সৌন্দর্যবর্ধনে কাজ করছে সরকার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬টি এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯টি খালের দুই পাড়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রিটেইনিং ওয়াল ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। এতে করে পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি অবৈধ দখল রোধ হবে এবং নগরবাসীর জন্য উন্মুক্ত বিনোদন ও চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরীর পয়ঃবর্জ্য সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে শোধন করে নদীতে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার জন্য গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নদী-খাল রক্ষা ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। ঢাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিগত, কারিগরি ও সর্বাত্মক প্রশাসনিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

/এমআর/