শিরোনাম

তুরাগে তিন মরদেহ উদ্ধার, যা বলছে পুলিশ

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
তুরাগে তিন মরদেহ উদ্ধার, যা বলছে পুলিশ
তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন

ঢাকার তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে পুলিশ বলছে, নদী থেকে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মীর মরদেহ উদ্ধারের যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন (১৭) গত ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। পরে শুক্রবার আশুলিয়া থানা এলাকার তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

শনিবার দুপুরে রানাভোলায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারানোর শোকে পরিবার গভীরভাবে ভেঙে পড়েছে। বাবা মো. শাহ আলম, মা ও বোন শোকাহত অবস্থায় সময় কাটাচ্ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তারা শুধু জানান, নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর শুক্রবার সুমনের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার খবর পেয়ে তারা লাশ গ্রহণ করেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, ছেলের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় এমন ছবি ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, সন্তানের মৃত্যুজনিত মানসিক কষ্ট আরও বাড়তে পারে বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা ‘সুমন আহমেদ চৌধুরী’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টকে সুমনের বলে শনাক্ত করেছেন। জানা গেছে, তিনি কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত একটি শোভাযাত্রার ভিডিওসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও পাওয়া গেছে।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন তুরাগ নদ এলাকার একটি চর থেকে সুমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন।

তিনি বলেন, পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী ২২ জুন পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হয়েছিল। পরে সে নদীতে পড়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সুমন সাঁতার জানত না। তারা নিজেরাও নদীতে খোঁজাখুঁজি করেছিলেন।

সুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে হামলার পর সাতজন নেতা-কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এসব দাবিকে ভিত্তিহীন ও গুজব হিসেবে আখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।

শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘তুরাগ নদে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ’—শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশও। কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মিথ্যা তথ্য প্রচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৪ ও ২৫ জুন তুরাগ নদ থেকে মোট তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন—মো. সুমন, আরিফ হাসান রাকিব এবং রনি মোল্লা।

দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন জানান, গত বুধবার নৌ পুলিশ তুরাগ নদ থেকে আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন।

আরিফের চাচা জানান, ২২ জুন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে আরিফ নিখোঁজ ছিলেন। পরে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, আরিফ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, তা পরিবার আগে জানত না। মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ছবি ও ভিডিও দেখে তারা এ বিষয়ে অবগত হন। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবার নিশ্চিত নয়।

অন্যদিকে আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির জানান, ২৪ জুন সকালে আরিফের মরদেহ উদ্ধারের পর একই দিন দুপুরে দিয়াবাড়ি ঘাট এলাকায় গোসল করতে নেমে রনি মোল্লা নামে আরেক ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যান। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে।

রনি মোল্লার বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা জানান, তার ছেলে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন। ঘটনার দিন সকালে হোটেল থেকে বের হওয়ার পর গোসল করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, রনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২২ জুনের পর আশুলিয়া থানা এলাকার তুরাগ নদ থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ওই দিন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোও আশুলিয়া থানা এলাকায় ঘটেছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর ঘটনায় পৃথকভাবে তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়ে নদীতে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার দাবির পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।

/এমআর/