শিরোনাম

সমন্বয়হীনতায় আটকে আছে গুলশান-বনানী লেকের উন্নয়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সমন্বয়হীনতায় আটকে আছে গুলশান-বনানী লেকের উন্নয়ন
রাজধানীর বনানী লেক। ১১ নম্বর সড়কের পূর্ব প্রান্তের দৃশ্য। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী ও বারিধারার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জলাধার পুনরুদ্ধার ও জলাবদ্ধতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১০ সালে শুরু হয় ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প’। তবে প্রকল্পটি শুরু করার আগে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এছাড়া একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো, ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘ আইনি জটিলতা, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে ধীরগতিসহ বিভিন্ন কারণে ১৬ বছরেও প্রকল্পটি শেষ হয়নি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেকে অনুমোদন পায়। বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল জুলাই ২০১০ থেকে জুন ২০১৩ পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা শুধু মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরে ভূমি অধিগ্রহণ এবং নতুন অঙ্গ সংযোজনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ৭ মে প্রথম সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এসময় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মে পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮২ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় লেক খনন, প্রায় ২ হাজার ৪৩৮ মিটার তীর সংরক্ষণ, প্রায় ২ হাজার ৮৩৮ মিটার লেক ড্রাইভ সড়ক, ৮ হাজার ৮৫৮ মিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ, প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ঘনমিটার লেক খনন এবং ৪ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। তবে দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণ হলেও প্রকল্পের মৌলিক লক্ষ্য– পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও টেকসই ব্যবস্থাপনা এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

আইএমইডি জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ। প্রায় ১৫ বছর আইনি জটিলতার কারণে ১০ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ আটকে ছিল। পরে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলেও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সিদ্ধান্তে আরও ৩ দশমিক ২১ একর জমি বাদ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইএমইডি দেখতে পেয়েছে, বনানী, গুলশান ও বারিধারা এলাকায় অন্তত ৭টি স্থানে লেকের সঙ্গে সরাসরি স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইন সংযুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলার কারণে লেকের পানির গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে এবং দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রায় ৯ কিলোমিটার লেকের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার অংশ থেকে ক্ষতিকর স্লাজ, পলি ও বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। লেকের বড় একটি অংশে এখনও বিপুল পরিমাণ পলি ও বর্জ্য জমে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামোর অবস্থা সন্তোষজনক নয়। লেকপাড়ের বিভিন্ন অংশে ওয়াকওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা হয়নি, অনেক জায়গায় অবৈধ দখল রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।

আইএমইডি জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ। প্রায় ১৫ বছর আইনি জটিলতার কারণে ১০ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ আটকে ছিল। পরে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলেও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সিদ্ধান্তে আরও ৩ দশমিক ২১ একর জমি বাদ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসন, রাজউক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সোসাইটিগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। প্রকল্প চলাকালে একাধিকবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া যায়নি। নিয়মিত পিআইসি ও পিএসসি সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।

প্রকল্পের শক্তির জায়গা ছিল সরকারি অর্থায়নে কোনো সংকট না থাকা এবং গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটি এবং সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা। কিন্তু নিয়মিত সমন্বয় সভা না হওয়া, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের কারণে প্রকল্প যথাযথ সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি।

আইএমইডির গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, এত বড় অবকাঠামো ও পরিবেশগত প্রকল্প গ্রহণের আগে কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। প্রতিবেদনে এটিকে প্রকল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে বাধ্যতামূলক ফিজিবিলিটি স্টাডি অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশও করা হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ছাবের আহমেদ বলেন, প্রকল্পের অধিকাংশ ভৌত কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক কাজ বাকি রয়েছে। সেগুলো শেষ হলেই প্রকল্পটি সম্পন্ন হবে। তিনি আরও বলেন, ২০১০ সালে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় ফিজিবিলিটি স্টাডি বাধ্যতামূলক ছিল না। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের প্রকল্পে এ শর্ত যুক্ত হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে বুয়েটের স্টাডি ছিল।

/এফসি/