শিরোনাম

উদ্বোধনের আগেই ৭০ কোটি টাকার হলে ফাটল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
উদ্বোধনের আগেই ৭০ কোটি টাকার হলে ফাটল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

উদ্বোধনের আগেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নবনির্মিত ১০ তলা ‘বিজয় ৭১’ আবাসিক হলের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নির্মাণকাজের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কিছু স্থানে ফাটল মেরামত করা হলেও ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে এখনও পলেস্তারা খসে পড়ছে। ফলে নতুন এই ভবনে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফাটলের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে ভবনটির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স অ্যান্ড কোম্পানির নাম, যারা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বহুল আলোচিত ‘বালিশকাণ্ডে’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

শিক্ষার্থীরা জানান, এর আগেও ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই হলের মিলনায়তনের ছাদ ঢালাইয়ের পর ধসে পড়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় অন্তত ১২ জন শ্রমিক আহত হন। তখনও নির্মাণকাজে গাফিলতি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হল ও মন্নুজান হল ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার পর প্রায় তিন মাস আগে শের-ই-বাংলা হলের একাংশ শিক্ষার্থীকে অস্থায়ীভাবে বিজয় ৭১ হলে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু নতুন ভবনে একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০ তলা বিজয় ৭১ হল এবং ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ২০ তলা বিজ্ঞান ভবনের কাজ করছে মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রকল্পই শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

নির্মাণকাজ চলাকালে বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটেছে। বিদ্যুতায়িত হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একটি ট্রাকের চাপায় হিমেল নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। এছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি হলটির মিলনায়তনের ছাদ ঢালাইয়ের সময় ধসে পড়ে অন্তত নয় শ্রমিক আহত হন।

প্রায় ২৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের বিজয় ৭১ হলে এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভবনটিতে চারটি আধুনিক লিফট, একটি বড় মসজিদ এবং ৩০০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়াম রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন চারটি বহুতল ভবনের কাজ তিন দফা সময় বাড়ানোর পরও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। চলতি মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন ভবনের অগ্রগতি ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক দফা বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।

প্রকল্প চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অসম্পাদিত কাজের মূল্যমানের ওপর শূন্য দশমিক ০৫ থেকে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ হারে জরিমানা পরিশোধ করতে হয়। তবে শিক্ষা অডিট অধিদফতরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ২৩ কোটি টাকার জরিমানা আদায় না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩৬৩ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ২০১৯ সালে প্রকল্পটি সংশোধন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৫১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়।

প্রকল্পের আওতায় অপরাজিতা হল, বিজয় ৭১ হল, ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টার, ২০ তলা একাডেমিক ভবন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং শেখ রাসেল মডেল স্কুলসহ একাধিক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তিন দফা সময় বাড়িয়ে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বিজয় ৭১ হলের কাজ গত বছরের ডিসেম্বরেই শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু এখনও ভবনের বিভিন্ন অংশের কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। অফিসকক্ষসহ কিছু অংশে নির্মাণকাজ চলমান অবস্থাতেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণমান নিয়ে।

হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হল সংসদের সহ-বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক শাহরিয়ার হাসান বলেন, শের-ই-বাংলা হলে ফাটল দেখা দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন ভবনেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ায় নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

শের-ই-বাংলা হল সংসদের নির্বাহী সম্পাদক শাহিব বিল্লাহ বলেন, নিরাপত্তার কারণে নতুন হলে আনা হলেও উদ্বোধনের আগেই ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ রাবি শাখার সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, নতুন হলে ওঠার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা যাচ্ছে। এমনকি মেরামতের পরও কিছু জায়গা থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মিনহাজুল আলম দাবি করেন, তাপমাত্রাজনিত কারণেও এ ধরনের ফাটল তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার মতে, এগুলো মেরামতযোগ্য এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতরের পরিচালক এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আপাতত ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের কোনো ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। মূলত বিম ও দেয়ালের সংযোগস্থল কিংবা প্লাস্টারের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা গেছে। ইতোমধ্যে প্রকৌশলীদের একটি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে এবং প্রয়োজনীয় মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/এমআর/