শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে

শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, লার্নিং সেন্টারের শিশু এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তায় বিতরণ করা হয় বিশেষ ধরনের ফর্টিফায়েড বিস্কুট। কিন্তু সেই বিস্কুটই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মার্কেটপ্লেসে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু কয়েকটি প্যাকেট নয়, কার্টনভর্তি বিস্কুটের বিজ্ঞাপন দিয়ে পাইকারি ও খুচরা– দুইভাবেই চলছে বেচাকেনা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে ‘ফর্টিফায়েড বিস্কুট’ লিখে খুঁজলেই একের পর এক বিক্রির বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠে। পাশাপাশি বিভিন্ন কেনাবেচার গ্রুপেও নিয়মিত এসব বিস্কুট বিক্রির পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। বিক্রেতারা দাবি করছেন, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্য পৌঁছে দেন।
এসব বিস্কুটের মোড়কে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্পদ’, ‘ক্রয়-বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ’ এবং ‘নট ফর সেল অর এক্সচেঞ্জ’। তারপরও কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বিক্রি চলছে।
অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব বিস্কুট আসল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে বিক্রি হওয়ায় এসব পণ্যের উৎস, সংরক্ষণ, এমনকী নকল হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের বিস্কুট কেনা ও খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই প্রতিবেদক ক্রেতা পরিচয়ে কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে একজন জানান, তিনি নিয়মিত কক্সবাজার এলাকা থেকে বিস্কুট সংগ্রহ করেন। ‘কোথা থেকে আসে’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার মানুষ কম দামে বিক্রি করে দিলে সেখান থেকেই সংগ্রহ করা হয়। পরে অনলাইনে কিছু লাভ রেখে বিক্রি করা হয়।
আরেক বিক্রেতা জানান, তার কাছে সবসময় বক্স আকারে বিস্কুট মজুত থাকে। নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি কিনলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরিয়ার কিংবা হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও করেন তিনি।

শুধু কক্সবাজার নয়, রাজধানীকেও এই অবৈধ বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে। একাধিক বিক্রেতা নিজেদের অবস্থান ঢাকায় উল্লেখ করে নিয়মিত সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি বিতরণব্যবস্থা থেকে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ বিস্কুট বাইরে চলে আসছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রেতা তাদের পোস্টে পণ্যের আসল মোড়কের ছবি ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও কার্টনের গায়ে থাকা সরকারি সতর্কবার্তাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবুও কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে এই বেচাকেনা চলার ইঙ্গিত দেয়।
একাধিক বিক্রেতার সঙ্গে কথোপকথনে জানা যায়, তারা খুচরা ক্রেতার পাশাপাশি পাইকারি ক্রেতাও খুঁজছেন। কেউ কেউ নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি অর্ডার দিলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও বলেন। অর্থ পরিশোধের পর বা ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কুরিয়ার সার্ভিসে দেশের যেকোনো জেলায় পণ্য পাঠানোর আশ্বাসও দিয়েছেন তারা।
এছাড়া কয়েকটি বিজ্ঞাপনে একই ধরনের বিস্কুট বারবার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু বিক্রেতা একবার পণ্য বিক্রি শেষ হলে নতুন করে আবার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কাছে নিয়মিতভাবে এসব বিস্কুটের সরবরাহ পৌঁছাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের সরকারি সহায়তাসামগ্রী অনলাইনে প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়ার ঘটনা শুধু বরাদ্দ আত্মসাতের প্রশ্নই নয়, বরং বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে নজরদারির দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ তদন্ত করে কোথা থেকে এসব বিস্কুট বাজারে আসছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা প্রয়োজন।
সমাজকর্মীরা বলছেন, যেসব শিশু অপুষ্টি মোকাবিলায় এই বিশেষ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে একটি অসাধু চক্র লাভবান হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক সহায়তার উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতরণ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারি, নিয়মিত অডিট এবং অনলাইনে সরকারি খাদ্যপণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে এই চক্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাদের ভাষ্য, শিশুদের জন্য বরাদ্দ পুষ্টিকর খাদ্য কোনোভাবেই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে পারে না। এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ উদ্যোগে শিশুদের পুষ্টিচাহিদা পূরণে এই ফর্টিফায়েড বিস্কুট বিতরণের একটি কর্মসূচি চালু ছিল। তবে বর্তমানে সেই কর্মসূচি বৃহৎ পরিসরে চালু নেই। সীমিত পরিসরে এটা স্কুল ফিডিংয়ে দেওয়া হয়। এখন যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিস্কুট বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে, তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কারণ এগুলো কোনো সরকারি বা অনুমোদিত কর্মসূচির আওতায় বিতরণ হচ্ছে না। ফলে সংরক্ষণ, পরিবহন ও মান নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা না থাকায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই বিক্রি করছে, এটি মোটেও নিরাপদ বা গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, লার্নিং সেন্টারের শিশু এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তায় বিতরণ করা হয় বিশেষ ধরনের ফর্টিফায়েড বিস্কুট। কিন্তু সেই বিস্কুটই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মার্কেটপ্লেসে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু কয়েকটি প্যাকেট নয়, কার্টনভর্তি বিস্কুটের বিজ্ঞাপন দিয়ে পাইকারি ও খুচরা– দুইভাবেই চলছে বেচাকেনা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে ‘ফর্টিফায়েড বিস্কুট’ লিখে খুঁজলেই একের পর এক বিক্রির বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠে। পাশাপাশি বিভিন্ন কেনাবেচার গ্রুপেও নিয়মিত এসব বিস্কুট বিক্রির পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। বিক্রেতারা দাবি করছেন, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্য পৌঁছে দেন।
এসব বিস্কুটের মোড়কে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্পদ’, ‘ক্রয়-বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ’ এবং ‘নট ফর সেল অর এক্সচেঞ্জ’। তারপরও কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বিক্রি চলছে।
অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব বিস্কুট আসল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে বিক্রি হওয়ায় এসব পণ্যের উৎস, সংরক্ষণ, এমনকী নকল হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের বিস্কুট কেনা ও খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই প্রতিবেদক ক্রেতা পরিচয়ে কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে একজন জানান, তিনি নিয়মিত কক্সবাজার এলাকা থেকে বিস্কুট সংগ্রহ করেন। ‘কোথা থেকে আসে’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার মানুষ কম দামে বিক্রি করে দিলে সেখান থেকেই সংগ্রহ করা হয়। পরে অনলাইনে কিছু লাভ রেখে বিক্রি করা হয়।
আরেক বিক্রেতা জানান, তার কাছে সবসময় বক্স আকারে বিস্কুট মজুত থাকে। নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি কিনলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরিয়ার কিংবা হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও করেন তিনি।

শুধু কক্সবাজার নয়, রাজধানীকেও এই অবৈধ বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে। একাধিক বিক্রেতা নিজেদের অবস্থান ঢাকায় উল্লেখ করে নিয়মিত সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি বিতরণব্যবস্থা থেকে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ বিস্কুট বাইরে চলে আসছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রেতা তাদের পোস্টে পণ্যের আসল মোড়কের ছবি ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও কার্টনের গায়ে থাকা সরকারি সতর্কবার্তাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবুও কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে এই বেচাকেনা চলার ইঙ্গিত দেয়।
একাধিক বিক্রেতার সঙ্গে কথোপকথনে জানা যায়, তারা খুচরা ক্রেতার পাশাপাশি পাইকারি ক্রেতাও খুঁজছেন। কেউ কেউ নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি অর্ডার দিলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও বলেন। অর্থ পরিশোধের পর বা ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কুরিয়ার সার্ভিসে দেশের যেকোনো জেলায় পণ্য পাঠানোর আশ্বাসও দিয়েছেন তারা।
এছাড়া কয়েকটি বিজ্ঞাপনে একই ধরনের বিস্কুট বারবার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু বিক্রেতা একবার পণ্য বিক্রি শেষ হলে নতুন করে আবার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কাছে নিয়মিতভাবে এসব বিস্কুটের সরবরাহ পৌঁছাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের সরকারি সহায়তাসামগ্রী অনলাইনে প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়ার ঘটনা শুধু বরাদ্দ আত্মসাতের প্রশ্নই নয়, বরং বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে নজরদারির দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ তদন্ত করে কোথা থেকে এসব বিস্কুট বাজারে আসছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা প্রয়োজন।
সমাজকর্মীরা বলছেন, যেসব শিশু অপুষ্টি মোকাবিলায় এই বিশেষ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে একটি অসাধু চক্র লাভবান হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক সহায়তার উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতরণ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারি, নিয়মিত অডিট এবং অনলাইনে সরকারি খাদ্যপণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে এই চক্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাদের ভাষ্য, শিশুদের জন্য বরাদ্দ পুষ্টিকর খাদ্য কোনোভাবেই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে পারে না। এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ উদ্যোগে শিশুদের পুষ্টিচাহিদা পূরণে এই ফর্টিফায়েড বিস্কুট বিতরণের একটি কর্মসূচি চালু ছিল। তবে বর্তমানে সেই কর্মসূচি বৃহৎ পরিসরে চালু নেই। সীমিত পরিসরে এটা স্কুল ফিডিংয়ে দেওয়া হয়। এখন যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিস্কুট বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে, তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কারণ এগুলো কোনো সরকারি বা অনুমোদিত কর্মসূচির আওতায় বিতরণ হচ্ছে না। ফলে সংরক্ষণ, পরিবহন ও মান নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা না থাকায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই বিক্রি করছে, এটি মোটেও নিরাপদ বা গ্রহণযোগ্য নয়।

শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, লার্নিং সেন্টারের শিশু এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসরত অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তায় বিতরণ করা হয় বিশেষ ধরনের ফর্টিফায়েড বিস্কুট। কিন্তু সেই বিস্কুটই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মার্কেটপ্লেসে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু কয়েকটি প্যাকেট নয়, কার্টনভর্তি বিস্কুটের বিজ্ঞাপন দিয়ে পাইকারি ও খুচরা– দুইভাবেই চলছে বেচাকেনা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে ‘ফর্টিফায়েড বিস্কুট’ লিখে খুঁজলেই একের পর এক বিক্রির বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠে। পাশাপাশি বিভিন্ন কেনাবেচার গ্রুপেও নিয়মিত এসব বিস্কুট বিক্রির পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। বিক্রেতারা দাবি করছেন, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্য পৌঁছে দেন।
এসব বিস্কুটের মোড়কে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্পদ’, ‘ক্রয়-বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ’ এবং ‘নট ফর সেল অর এক্সচেঞ্জ’। তারপরও কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বিক্রি চলছে।
অনলাইনে বিক্রি হওয়া এসব বিস্কুট আসল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে বিক্রি হওয়ায় এসব পণ্যের উৎস, সংরক্ষণ, এমনকী নকল হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এ ধরনের বিস্কুট কেনা ও খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এই প্রতিবেদক ক্রেতা পরিচয়ে কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে একজন জানান, তিনি নিয়মিত কক্সবাজার এলাকা থেকে বিস্কুট সংগ্রহ করেন। ‘কোথা থেকে আসে’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার মানুষ কম দামে বিক্রি করে দিলে সেখান থেকেই সংগ্রহ করা হয়। পরে অনলাইনে কিছু লাভ রেখে বিক্রি করা হয়।
আরেক বিক্রেতা জানান, তার কাছে সবসময় বক্স আকারে বিস্কুট মজুত থাকে। নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি কিনলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরিয়ার কিংবা হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও করেন তিনি।

শুধু কক্সবাজার নয়, রাজধানীকেও এই অবৈধ বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে। একাধিক বিক্রেতা নিজেদের অবস্থান ঢাকায় উল্লেখ করে নিয়মিত সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি বিতরণব্যবস্থা থেকে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ বিস্কুট বাইরে চলে আসছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রেতা তাদের পোস্টে পণ্যের আসল মোড়কের ছবি ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও কার্টনের গায়ে থাকা সরকারি সতর্কবার্তাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবুও কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে এই বেচাকেনা চলার ইঙ্গিত দেয়।
একাধিক বিক্রেতার সঙ্গে কথোপকথনে জানা যায়, তারা খুচরা ক্রেতার পাশাপাশি পাইকারি ক্রেতাও খুঁজছেন। কেউ কেউ নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি অর্ডার দিলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও বলেন। অর্থ পরিশোধের পর বা ক্যাশ অন ডেলিভারিতে কুরিয়ার সার্ভিসে দেশের যেকোনো জেলায় পণ্য পাঠানোর আশ্বাসও দিয়েছেন তারা।
এছাড়া কয়েকটি বিজ্ঞাপনে একই ধরনের বিস্কুট বারবার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু বিক্রেতা একবার পণ্য বিক্রি শেষ হলে নতুন করে আবার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কাছে নিয়মিতভাবে এসব বিস্কুটের সরবরাহ পৌঁছাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের সরকারি সহায়তাসামগ্রী অনলাইনে প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়ার ঘটনা শুধু বরাদ্দ আত্মসাতের প্রশ্নই নয়, বরং বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে নজরদারির দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ তদন্ত করে কোথা থেকে এসব বিস্কুট বাজারে আসছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা প্রয়োজন।
সমাজকর্মীরা বলছেন, যেসব শিশু অপুষ্টি মোকাবিলায় এই বিশেষ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে একটি অসাধু চক্র লাভবান হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক সহায়তার উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতরণ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল নজরদারি, নিয়মিত অডিট এবং অনলাইনে সরকারি খাদ্যপণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে এই চক্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাদের ভাষ্য, শিশুদের জন্য বরাদ্দ পুষ্টিকর খাদ্য কোনোভাবেই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে পারে না। এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারক সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ উদ্যোগে শিশুদের পুষ্টিচাহিদা পূরণে এই ফর্টিফায়েড বিস্কুট বিতরণের একটি কর্মসূচি চালু ছিল। তবে বর্তমানে সেই কর্মসূচি বৃহৎ পরিসরে চালু নেই। সীমিত পরিসরে এটা স্কুল ফিডিংয়ে দেওয়া হয়। এখন যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিস্কুট বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে, তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কারণ এগুলো কোনো সরকারি বা অনুমোদিত কর্মসূচির আওতায় বিতরণ হচ্ছে না। ফলে সংরক্ষণ, পরিবহন ও মান নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা না থাকায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই বিক্রি করছে, এটি মোটেও নিরাপদ বা গ্রহণযোগ্য নয়।

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে পচা ডিম, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা






