শিরোনাম

হিজাব টিউটোরিয়াল থেকে সফল উদ্যোক্তা, রথি এখন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা

নিজস্ব  প্রতিবেদক
হিজাব টিউটোরিয়াল থেকে সফল উদ্যোক্তা, রথি এখন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা

বাংলাদেশের ডিজিটাল বাস্তবতায় কনটেন্ট ক্রিয়েশন এখন শুধুই বিনোদনের জায়গা নয়, বরং এটি ক্যারিয়ার, ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড তৈরির শক্তিশালী মাধ্যমও। বিশেষ করে নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের পরিচিতি গড়ে তোলার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও এগিয়ে যাচ্ছেন। এমনই একজন পরিচিত মুখ রথি আহমেদ। ফ্যাশন, কুকিং, লাইফস্টাইল এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করে তিনি তরুণদের মাঝে তৈরি করেছেন আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। বর্তমান বাংলাদেশের ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রি, নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন সিটিজেন জার্নালের সঙ্গে।

প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

উত্তর: আগের তুলনায় এখন বাংলাদেশের মানুষ কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে অনেক বেশি সিরিয়াসভাবে দেখছে। আগে অনেকে ভাবতো এটা শুধু সময় নষ্ট করার বিষয়। কিন্তু এখন মানুষ বুঝতে পারছে, এটা দিয়েও ক্যারিয়ার তৈরি করা সম্ভব। অনেকেই এখন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আয় করছে, নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করছে, ব্যবসা দাঁড় করাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য এটা এখন বড় একটা সুযোগের জায়গা।

প্রশ্ন: নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বর্তমান বাংলাদেশ কতটা সম্ভাবনাময় বলে মনে হয়?

উত্তর: আমার মনে হয়, এখন মেয়েদের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফ্যাশন, বিউটি, কুকিং, লাইফস্টাইল, ট্রাভেল– অনেক ক্যাটেগরিতেই নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা খুব ভালো কাজ করছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডও এখন নারী ক্রিয়েটরদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তবে সুযোগের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও আছে, বিশেষ করে অনলাইন ট্রোলিং এবং সামাজিক বিচার। তারপরও আমি মনে করি, যারা নিজের কাজটা ভালোভাবে করতে পারবে, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ অনেক ভালো।

প্রশ্ন: আপনি কীভাবে কনটেন্ট ক্রিয়েশনে এলেন?

উত্তর: আসলে আমি কখনো প্ল্যান করে এই জগতে আসিনি। ছোটবেলা থেকেই আমার হিজাব পরার স্টাইলটা একটু আলাদা ছিল। যারা আমাকে ফলো করতো, তারা প্রায়ই টিউটোরিয়াল চাইতো। শুরুতে আমি ক্যামেরার সামনে আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। পরে বন্ধুদের উৎসাহে ভিডিও বানানো শুরু করি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এই যাত্রা শুরু।

প্রশ্ন: বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী বলে মনে করেন?

উত্তর: আমি মনে করি, ধারাবাহিকতা এবং নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সবাই কনটেন্ট তৈরি করছে। তাই শুধু ট্রেন্ড ফলো করলে হবে না। দর্শককে এমন কিছু দিতে হবে, যাতে মানুষ আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনতে পারে। একইসঙ্গে কোয়ালিটি এবং প্রেজেন্টেশনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

রথি আহমেদ
হালকা কমলা রঙের থ্রি-পিচে আলো ছড়াচ্ছেন রথি আহমেদ।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

উত্তর: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নেগেটিভিটি এবং মানসম্মত কনটেন্টের অভাব। অনেক সময় মানুষ দ্রুত ভাইরাল হওয়ার জন্য এমন কনটেন্ট তৈরি করে যা আসলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো প্রভাব ফেলে না। এ ছাড়া সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অপ্রয়োজনীয় সমালোচনাও অনেক বড় সমস্যা। বিশেষ করে নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের এগুলো বেশি ফেইস করতে হয়।

প্রশ্ন: আপনি কীভাবে অনলাইন সমালোচনা বা ট্রোলিং সামলান?

উত্তর: শুরুর দিকে খারাপ লাগতো। এখনও অনেক সময় খারাপ লাগে। কিন্তু এখন আমি চেষ্টা করি নেগেটিভ কমেন্টগুলোকে গুরুত্ব না দিতে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাইকে খুশি রাখা সম্ভব নয়। আমি বরং আমার কাজের দিকে ফোকাস রাখি। প্রয়োজন হলে বাজে কমেন্ট ফিল্টার করি।

প্রশ্ন: আপনার কনটেন্টে ফ্যাশন, রান্না এবং লাইফস্টাইল– এত ভিন্ন বিষয় একসঙ্গে কেন?

উত্তর: কারণ, আমি নিজে একঘেয়ে কাজ পছন্দ করি না। আমি ফ্যাশন ভালোবাসি, আবার রান্নাও করতে পছন্দ করি। লাইফস্টাইল নিয়েও কাজ করতে ভালো লাগে। আমি সব সময় চেষ্টা করি, আমার কনটেন্ট যেন রিলেটেবল হয় এবং মানুষ সেটা দেখে উপভোগ করতে পারে।

প্রশ্ন: কনটেন্ট ক্রিয়েশনের পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও আপনি কাজ করছেন। এই অভিজ্ঞতা কেমন?

উত্তর: উদ্যোক্তা হওয়াটা আমার ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল। বর্তমানে আমার অনলাইন ফ্যাশন ব্র্যান্ড এবং একটি রেস্টুরেন্ট আছে। ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ নয়। বিশেষ করে পড়াশোনা, কনটেন্ট আর ব্যবসা– সব একসঙ্গে ম্যানেজ করা অনেক কঠিন। তবে আমি মনে করি, সোশ্যাল মিডিয়া এখন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় একটা সুযোগ তৈরি করেছে।

রথি আহমেদ (2)

প্রশ্ন: বর্তমানে ব্র্যান্ড এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সম্পর্ককে কীভাবে দেখেন?

উত্তর: এখন ব্র্যান্ডগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি ডিজিটালমুখী। তারা বুঝতে পারছে যে মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়াতেই বেশি সময় দেয়। তাই ব্র্যান্ডগুলো এখন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তবে আমি মনে করি, ব্র্যান্ডেরও উচিত এমন ক্রিয়েটর বেছে নেওয়া, যারা দায়িত্বশীল এবং অডিয়েন্সের কাছে বিশ্বাসযোগ্য।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রিকে কোথায় দেখতে চান?

উত্তর: আমি চাই বাংলাদেশে আরও বেশি মানসম্মত এবং আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্ট তৈরি হোক। আমাদের দেশে অনেক ট্যালেন্টেড মানুষ আছে। সঠিক সুযোগ পেলে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ভালো করতে পারবে। আমি চাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কনটেন্ট শুধু দেশের মানুষ নয়, বাইরের দর্শকরাও দেখুক।

প্রশ্ন: যারা এখন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর: আমি বলবো, শুধু ভাইরাল হওয়ার জন্য কনটেন্ট তৈরি করবেন না। এমন কিছু তৈরি করুন, যেটা মানুষের কাজে আসে বা মানুষ উপভোগ করে। ধৈর্য রাখতে হবে, কারণ শুরুতেই সাফল্য আসে না। আর নিজের যেটা ভালো লাগে, সেটার ওপরই কাজ করা উচিত। কারণ, আপনি যেটা ভালোবাসবেন, সেটাতেই দীর্ঘসময় টিকে থাকতে পারবেন।

/জেএইচ/