মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
সিজেডএন ডেস্ক

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, আন্দোলন ও মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন ইশরাক হোসেন। প্রথমবারেরমতো সংসদ সদস্য হয়ে প্রতিমন্ত্রী হওয়াটাও ছিলো তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অনেক অর্জন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাকে নতুন করে বিতর্কিত করে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর থেকেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর সাদারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে।
গত মাসে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইশরাকের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের পরও কঠিন সিদ্ধান্ত আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ইশরাক সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ঢাকা দক্ষিণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি। দলীয় কর্মসূচি, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে পরিচিত করে তোলে এবং এনে দেয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করে জয় লাভ করেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

শক্তি প্রদর্শন শুরু
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। ইশরাক ফলাফল প্রত্যাখ্যান শুরু করেন আইনি লড়াই। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তৈরি হয় বিরোধ । বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালত পর্যন্ত।
শপথ গ্রহণে ব্যবস্থার দাবিতে ইশরাকের সমর্থকেরা মে মাসে নগর ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে নগর ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়। আন্দোলনে যোগ দেন ইশরাকও। শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। তার যুক্তি, আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে এবং ঢাকাবাসীর ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আন্দোলনের দুটি দিক ছিল। তার সমর্থকেরা এটিকে দেখেছেন শক্তি প্রদর্শন হিসেবে। অন্যদিকে জনভোগান্তির কারণে তার সমালোচনাই হয়েছে বেশি। এমনকি দলের ভেতরও তাকে নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত মেয়রের চেয়ারে বসা হয়নি তার। বিষয়টিকে তার রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখেন অনেকেই।
মাদকবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে হয়তো নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে এ উপস্থিতি কতটা হিতে বিপরীত হতে পারে তা তিনি হয়তো ভেবেও দেখেননি।
বিতর্ক ইশরাকের পিছু ছাড়েনি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইশরাক হোসেন মাথা ঠান্ডা না রেখে উত্তেজনা মূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।’ একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ব্যক্তিদের শান্ত হতে বলেন এবং যাদের বক্তব্য আছে, তাদের মঞ্চে এসে তা তুলে ধরার আহ্বান জানান। এনসিপি নেতা আখতার হোসেনও বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এর আগে গত জুলাইয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। সেখানে যান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও। রীতি অনুযায়ী, তিন বাহিনীর প্রধানেরা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দেন। তবে দেখা যায়, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে ইশরাক হোসেনও স্যালুট দিচ্ছেন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করতে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্যও বার্তা দিয়েছেন। বার্তাটি হলো, মন্ত্রীদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কাউকে দায়মুক্তি দেবে না। ইশরাক শুধু প্রতিমন্ত্রী হন, সংসদ সদস্যও। ফলে তার রাজনৈতিক জীবন থেমে যাচ্ছে না। কিন্তু অল্প সময়ে পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার যে উদাহরণ, তা নিজের এবং ক্ষমতাসীন অন্যদের মধ্যে কতটা বোধ তৈরি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। তার অপরিণতবোধের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, আন্দোলন ও মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন ইশরাক হোসেন। প্রথমবারেরমতো সংসদ সদস্য হয়ে প্রতিমন্ত্রী হওয়াটাও ছিলো তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অনেক অর্জন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাকে নতুন করে বিতর্কিত করে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর থেকেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর সাদারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে।
গত মাসে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইশরাকের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের পরও কঠিন সিদ্ধান্ত আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ইশরাক সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ঢাকা দক্ষিণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি। দলীয় কর্মসূচি, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে পরিচিত করে তোলে এবং এনে দেয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করে জয় লাভ করেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

শক্তি প্রদর্শন শুরু
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। ইশরাক ফলাফল প্রত্যাখ্যান শুরু করেন আইনি লড়াই। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তৈরি হয় বিরোধ । বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালত পর্যন্ত।
শপথ গ্রহণে ব্যবস্থার দাবিতে ইশরাকের সমর্থকেরা মে মাসে নগর ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে নগর ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়। আন্দোলনে যোগ দেন ইশরাকও। শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। তার যুক্তি, আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে এবং ঢাকাবাসীর ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আন্দোলনের দুটি দিক ছিল। তার সমর্থকেরা এটিকে দেখেছেন শক্তি প্রদর্শন হিসেবে। অন্যদিকে জনভোগান্তির কারণে তার সমালোচনাই হয়েছে বেশি। এমনকি দলের ভেতরও তাকে নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত মেয়রের চেয়ারে বসা হয়নি তার। বিষয়টিকে তার রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখেন অনেকেই।
মাদকবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে হয়তো নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে এ উপস্থিতি কতটা হিতে বিপরীত হতে পারে তা তিনি হয়তো ভেবেও দেখেননি।
বিতর্ক ইশরাকের পিছু ছাড়েনি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইশরাক হোসেন মাথা ঠান্ডা না রেখে উত্তেজনা মূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।’ একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ব্যক্তিদের শান্ত হতে বলেন এবং যাদের বক্তব্য আছে, তাদের মঞ্চে এসে তা তুলে ধরার আহ্বান জানান। এনসিপি নেতা আখতার হোসেনও বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এর আগে গত জুলাইয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। সেখানে যান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও। রীতি অনুযায়ী, তিন বাহিনীর প্রধানেরা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দেন। তবে দেখা যায়, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে ইশরাক হোসেনও স্যালুট দিচ্ছেন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করতে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্যও বার্তা দিয়েছেন। বার্তাটি হলো, মন্ত্রীদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কাউকে দায়মুক্তি দেবে না। ইশরাক শুধু প্রতিমন্ত্রী হন, সংসদ সদস্যও। ফলে তার রাজনৈতিক জীবন থেমে যাচ্ছে না। কিন্তু অল্প সময়ে পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার যে উদাহরণ, তা নিজের এবং ক্ষমতাসীন অন্যদের মধ্যে কতটা বোধ তৈরি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। তার অপরিণতবোধের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা।

মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
সিজেডএন ডেস্ক

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, আন্দোলন ও মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন ইশরাক হোসেন। প্রথমবারেরমতো সংসদ সদস্য হয়ে প্রতিমন্ত্রী হওয়াটাও ছিলো তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অনেক অর্জন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাকে নতুন করে বিতর্কিত করে। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর থেকেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর সাদারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে।
গত মাসে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইশরাকের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের পরও কঠিন সিদ্ধান্ত আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ইশরাক সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ঢাকা দক্ষিণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি। দলীয় কর্মসূচি, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে পরিচিত করে তোলে এবং এনে দেয় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করে জয় লাভ করেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

শক্তি প্রদর্শন শুরু
২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। ইশরাক ফলাফল প্রত্যাখ্যান শুরু করেন আইনি লড়াই। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তৈরি হয় বিরোধ । বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালত পর্যন্ত।
শপথ গ্রহণে ব্যবস্থার দাবিতে ইশরাকের সমর্থকেরা মে মাসে নগর ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে নগর ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়। আন্দোলনে যোগ দেন ইশরাকও। শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। তার যুক্তি, আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে এবং ঢাকাবাসীর ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আন্দোলনের দুটি দিক ছিল। তার সমর্থকেরা এটিকে দেখেছেন শক্তি প্রদর্শন হিসেবে। অন্যদিকে জনভোগান্তির কারণে তার সমালোচনাই হয়েছে বেশি। এমনকি দলের ভেতরও তাকে নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত মেয়রের চেয়ারে বসা হয়নি তার। বিষয়টিকে তার রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখেন অনেকেই।
মাদকবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে হয়তো নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অস্ত্র হাতে এ উপস্থিতি কতটা হিতে বিপরীত হতে পারে তা তিনি হয়তো ভেবেও দেখেননি।
বিতর্ক ইশরাকের পিছু ছাড়েনি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইশরাক হোসেন মাথা ঠান্ডা না রেখে উত্তেজনা মূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।’ একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ব্যক্তিদের শান্ত হতে বলেন এবং যাদের বক্তব্য আছে, তাদের মঞ্চে এসে তা তুলে ধরার আহ্বান জানান। এনসিপি নেতা আখতার হোসেনও বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এর আগে গত জুলাইয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। সেখানে যান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও। রীতি অনুযায়ী, তিন বাহিনীর প্রধানেরা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দেন। তবে দেখা যায়, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে ইশরাক হোসেনও স্যালুট দিচ্ছেন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করতে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্যও বার্তা দিয়েছেন। বার্তাটি হলো, মন্ত্রীদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কাউকে দায়মুক্তি দেবে না। ইশরাক শুধু প্রতিমন্ত্রী হন, সংসদ সদস্যও। ফলে তার রাজনৈতিক জীবন থেমে যাচ্ছে না। কিন্তু অল্প সময়ে পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার যে উদাহরণ, তা নিজের এবং ক্ষমতাসীন অন্যদের মধ্যে কতটা বোধ তৈরি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। তার অপরিণতবোধের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা।









