লোকসংগীতের কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী আজ

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
লোকসংগীতের কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী আজ
আব্বাসউদ্দীন আহমদ

‘ওকি গাড়িয়াল ভাই কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে’, অথবা ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শিল্পী কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীন আহমদের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী আজ। তার গানের সুরে গ্রাম বাংলার জনজীবন, প্রেম-বিরহ ও লোক-ঐতিহ্য এক অনন্য রূপ পেয়েছে। তিনি আধুনিক, স্বদেশী, ইসলামি, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী, মুর্শিদিসহ বিভিন্ন ঘরানার গান গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে পল্লীগীতিতে তার মৌলিকতা ও সাফল্য সবচেয়ে বেশি।

আব্বাসউদ্দীন ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের উকিল। আর মাতা হিরামন নেসা। বলরামপুর স্কুলে তার বাল্যশিক্ষা শুরু হয়। ১৯১৯ সালে তিনি তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। তখন থেকেই তিনি অধ্যয়ন পরিত্যাগ করে গানের জগতে নিমগ্ন হন।

আব্বাসউদ্দীন কোনো ওস্তাদের কাছে কিংবা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে তালিম নিয়ে গান শেখেননি। তিনি প্রথমে ছিলেন পাড়াগাঁয়ের একজন গায়ক। যাত্রা-নাটক ও স্কুল, কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি এর প্রতি আকৃষ্ট হন। ধীরে ধীরে নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। পরে কলকাতায় অল্প সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে শেখেন।

রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া-ক্ষীরোল-চটকা গেয়ে আব্বাসউদ্দীন দারুণ সুনাম অর্জন করেন। পরে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, বিচ্ছেদী, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া, পালাগান ইত্যাদি পল্লিগানের নানা শাখার গান গেয়ে ও রেকর্ড করে অমর হয়ে আছেন। তার দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লি অঞ্চলের আবহাওয়া-প্রেম-ভালোবাসা ও বিরহ ফুটে উঠতো। এক্ষেত্রে তিনি আজও অদ্বিতীয়।

তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফার ইসলামী ভাবধারায় রচিত গান গেয়েও জনপ্রিয়তা পান। কাজী নজরুলের ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশি ঈদ’ তিনি প্রথম গেয়েছিলেন।

আব্বাসউদ্দীনের গান প্রথম রেকর্ড করে ১৯৩০ সালে হিজ মাস্টার্স ভয়েস। পরে মেগাফোন, টুইন, রিগ্যাল প্রভৃতি কোম্পানিও তার বহু গান রেকর্ড করে। গ্রাম-গঞ্জ-শহরের আসর-অনুষ্ঠান-জলসায় গান গেয়ে এবং গ্রামোফোনে গান রেকর্ড করে তিনি বাংলার সঙ্গীতবিরোধী মুসলমান সমাজকে সঙ্গীতানুরাগী করে তোলেন।

জানা যায়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সহায়তায় কলকাতায় গ্রামোফোন রেকর্ডে গান রেকর্ড করেন তিনি। তার প্রথম রেকর্ড ‘কোন বিরহীর নয়নজলে বাদল ঝরে গো’।

গবেষকদের মতে, শহুরে জীবনে লোকগীতিকে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব আব্বাসউদ্দীনের। তিনি ছিলেন প্রথম মুসলমান গায়ক যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচএমভি থেকে গানের রেকর্ড বের করেন। রেকর্ডগুলো বাণিজ্যিকভাবে দারুণ সফল হয়। তাই অন্যান্য হিন্দুধর্মের গায়করাও মুসলমান ছদ্মনাম ধারণ করে গান করতে থাকেন। বিশিষ্ট চিন্তক ফরহাদ মজহারের ভাষ্য, আব্বাসউদ্দীন কেবল গায়ক ছিলেন না, তিনি তার সময়কালের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকে ধারণ করেছিলেন।

আব্বাসউদ্দীন ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপি আই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন। এরপর অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হকের মন্ত্রিত্বের সময় তিনি রেকডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে তার গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি সরকারের প্রচারদপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সঙ্গীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন।

আব্বাসউদ্দীনের গান আজও বাঙালি লোকগীতিতে অমর হয়ে আছে। আমার শিল্পী জীবনের কথা (১৯৬০) তার রচিত একমাত্র গ্রন্থ। তিনি সঙ্গীতে অবদানের জন্য মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (১৯৮১) লাভ করেন। ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার কনিষ্ঠ পুত্র মোস্তফা জামান আব্বাসী এবং কন্যা ফেরদৌসী রহমান দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী।

প্রখ্যাত এই শিল্পীর জন্মবার্ষিকীতে রাজধানীতে আয়োজন করা হয়েছে দুটি স্মরণ অনুষ্ঠান। এ ছাড়াও নানাভাবে তাকে স্মরণ করবে সংগীতপ্রিয় মানুষেরা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে আজ সন্ধ্যা ৬টায় একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ শীর্ষক সংগীতানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আব্বাসউদ্দীন আহমদের গান পরিবেশন করবেন দেশের প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা। একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে ‘ছায়ানটের বিশেষ শ্রোতার আসর-আব্বাসউদ্দীন আহমদ স্মরণ’।

/জেএইচ/