এক্সপ্লেইনার

শিশু নির্যাতনের অভিযোগ করলেই কি বিপদে পড়ে পরিবার

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
শিশু নির্যাতনের অভিযোগ করলেই কি বিপদে পড়ে পরিবার
যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলিম উদ্দিন

টঙ্গীতে সাত বছরের এক শিশুর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পর তার বাবা প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। সাভার ও নোয়াখালীতেও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে পরিবারের ওপর চাপ ও হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনার পর অনেকের মনে প্রশ্ন, নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে গিয়ে কোনো পরিবার বিপদে পড়লে তাদের সুরক্ষা দেবে কে?

শিশু নির্যাতনের শিকার হলে পরিবারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পর যদি সেই পরিবারকেই হুমকি, হামলা কিংবা পাল্টা মামলার মুখে পড়তে হয়, তাহলে অন্য অভিভাবকেরা অভিযোগ করতে ভয় পেতে পারেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এমন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী মেয়েকে যৌন হয়রানি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছেন তার বাবা। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক কারাগারে রয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক তদন্তে শিশুটির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

এদিকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ওই বাবা ও তাঁর স্বজনদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, মাদ্রাসার কর্মীদের মারধর, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা চুরির ঘটনা ঘটেছে। শিশুটির বাবা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এখানে দুটি বিষয় আলাদাভাবে দেখা জরুরি। শিশুটির ওপর নির্যাতনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের করা অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে। তবে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে শিশুটির অভিযোগ যেন গুরুত্ব হারিয়ে না ফেলে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগ করার পর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে

শিশু নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এলে সাধারণত অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত, মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পর শিশুটির পরিবার কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, সে বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।

টঙ্গীর ঘটনাতেও শিশুটির বাবার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ হুমকির বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে কি না এবং পরিবারটির নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানা জরুরি।

শিশুটির বাবা ও স্বজনেরা মাদ্রাসায় যাওয়ার পর সেখানে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের হাত থেকে উদ্ধার করে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব পুলিশের ও আদালতের। কোনো অভিযোগের কারণে কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মারধর করার সুযোগ নেই।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা মাদ্রাসার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাঁরা সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শিশুটির জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপ তদন্তের অংশ। তবে অভিযোগের পাশাপাশি শিশুটির পরিবার নিরাপদ আছে কি না, সেটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

সাভারের ঘটনাও কেন গুরুত্বপূর্ণ

শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে পাল্টা মামলার বিষয়টি শুধু টঙ্গীতেই সীমাবদ্ধ নয়। সাভারেও এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে।

সেখানে ১৩ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীর দাদা প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন। পরে মাদ্রাসার মালিকের ছেলে ওই দাদাসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে লুটপাট ও ভাঙচুরের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, দাদার নাম ওই মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও তাঁকে আসামি করা হয়। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্ত ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে না।

এ ঘটনায় লুটপাট ও ভাঙচুরের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিশুটির ওপর নির্যাতনের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। কোনো একটি অভিযোগের তদন্ত যেন অন্য অভিযোগের তদন্তে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশের দায়িত্ব হলো, প্রতিটি অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা। কেউ নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন বলেই তাঁকে অন্য অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না। আবার পাল্টা মামলা হয়েছে বলেই মূল অভিযোগের গুরুত্ব কমিয়ে দেখার সুযোগ নেই।

নোয়াখালীতে অভিযোগ তুলে নিতে হামলার অভিযোগ

নোয়াখালীর একটি ঘটনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গত এপ্রিলে ১৪ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীর বাবা প্রতিষ্ঠানটির সুপারের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। এরপর ওই ছাত্রীর পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীদের পরিবারের বাড়িতে ভাঙচুর করতে এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দিতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যদের মারধরও করা হয়।

এর আগে পরিবারটি স্থানীয়ভাবে সহায়তা চেয়েছিল। ইউনিয়ন পরিষদের এক প্রতিনিধি স্বীকার করেন, পুলিশের কাছে মামলা করার আগে তিনি বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু কোনো শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ সাধারণ বিরোধের মতো সালিসের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার বিষয় নয়। এমন অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তবে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা থেকেই হামলার ঘটনা ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। এই ঘটনা থেকে বরং বোঝা যায়, আইনের আশ্রয় নেওয়ার আগেও কোনো পরিবার স্থানীয় পর্যায়ে চাপের মুখে পড়তে পারে।

মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কী

শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করতে পারে। তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে আইনগত পদক্ষেপও নিতে পারে। একইভাবে অভিযুক্ত শিক্ষকেরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। তবে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে অভিযোগকারীদের নিরুৎসাহিত করা কিংবা অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের উচিত পুলিশের তদন্তে সহযোগিতা করা এবং শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে যেন শিশুটি বা তার পরিবারকে হয়রানি করা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগ করতে গিয়ে ভয় পেলে কী হবে

টঙ্গী, সাভার ও নোয়াখালীর ঘটনাগুলো থেকে দেশজুড়ে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। কোথাও পাল্টা অভিযোগের উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়, আবার নোয়াখালীর ঘটনায় মামলা তুলে নেওয়ার চাপ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

তবে তিনটি ঘটনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। শিশু নির্যাতনের অভিযোগের সঙ্গে বড়দের বিরোধ জড়িয়ে পড়লে শিশুটির ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ জটিল হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণে পুলিশের দুটি দায়িত্ব সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা। দ্বিতীয়ত, অভিযোগ জানানোর কারণে শিশুটির পরিবার হুমকি বা হামলার শিকার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়া।

টঙ্গীর শিশুটির বাবা জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ে প্রথমে ঘটনার কথা বলতে পারছিল না। পরে সে বাবা-মাকে বিষয়টি জানায়। এরপর পরিবারটি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পর যদি পরিবারটিকে প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়তে হয়, তাহলে অন্য অভিভাবকেরা কী বার্তা পাবেন?

একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদেরও আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। কারণ, নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়ে কোনো পরিবার যদি উল্টো বিপদের আশঙ্কা করে, তাহলে অনেকেই নীরব থাকাকেই নিরাপদ মনে করতে পারেন।

শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে হলে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। অভিযোগ জানানোর পর শিশুটি ও তার পরিবার যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সেই নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

/এমআর/