স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা গড়তে প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা

মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা গড়তে প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন

একটি হাসপাতাল রোগীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করতে পারে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে যদি স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ ও রোগীর প্রয়োজনের প্রতিফলন না থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা তৈরি করা কঠিন।

স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করতে গিয়ে আমার কাছে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে – আস্থা শুধু রোগী হাসপাতালের ভেতরে কী অভিজ্ঞতা পেলেন, তার ওপর নির্ভর করে না; সেই অভিজ্ঞতার পেছনে প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করে, তার ওপরও নির্ভর করে।

একজন রোগী হয়তো জানেন না হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কীভাবে সেবার মান পর্যবেক্ষণ করা হয় কিংবা কীভাবে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব তাঁর অভিজ্ঞতায় এসে পড়ে।

যেমন, রোগীর প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়া যাবে কি না, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় থাকবে কি না, কোনো সমস্যার কথা জানালে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে কি না– এসব বিষয় শুধু সামনের সারির কর্মীদের আচরণের ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে থাকে প্রতিষ্ঠানের নীতি, নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাজের পদ্ধতি।

অর্থাৎ, আস্থা তৈরি হয় দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতার পেছনের ব্যবস্থার সমন্বয়ে।

একটি হাসপাতাল নিজেকে রোগীকেন্দ্রিক বলতে পারে। কিন্তু রোগীর প্রশ্ন বা অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য যদি কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই বক্তব্য বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। একইভাবে, স্বচ্ছতার কথা বললেও প্রয়োজনীয় তথ্য যদি সময়মতো রোগীর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

এখানে নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার কী হবে, কর্মীদের কোন আচরণে উৎসাহ দেওয়া হবে এবং কোন সমস্যাগুলোকে উন্নতির সুযোগ হিসেবে দেখা হবে– এসবের দিকনির্দেশনা আসে নেতৃত্ব থেকেই।

যে প্রতিষ্ঠান শুধু ভালো ফলাফল তুলে ধরতে চায়, সেখানে সমস্যার কথা সামনে আনা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, যে প্রতিষ্ঠান সমস্যাকে তথ্য ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করে, সেখানে উন্নতির সুযোগ তৈরি হয়।

স্বাস্থ্যসেবায় সবকিছু সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলবে, এমন নয়। কোনো প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে, রোগীর প্রত্যাশা পূরণ না-ও হতে পারে কিংবা কোনো সেবায় উন্নতির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠান এসব পরিস্থিতি কীভাবে সামলায়।

সমস্যা দেখা দিলে তথ্য যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথা শোনা, রোগীকে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই সমস্যা কমানোর জন্য ব্যবস্থা নেওয়া– এসব দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য।

বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান ভুল কখনোই হবে না– এমন নিশ্চয়তা দেয় না; বরং ভুল বা ঘাটতি সামনে এলে দায়িত্বশীলভাবে তা মোকাবিলা করার সক্ষমতা গড়ে তোলে।

এখানে স্বচ্ছতার অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছতা মানে সব তথ্য সবার কাছে প্রকাশ করা নয়। রোগীর গোপনীয়তা, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তা এবং পেশাগত দায়িত্ব বজায় রেখেই প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথভাবে জানাতে হয়। অর্থাৎ, স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতারও সমন্বয় থাকতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিও আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কর্মীরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পরিষ্কারভাবে বোঝেন, প্রয়োজনীয় তথ্য পান এবং সমস্যা তুলে ধরার সুযোগ পান, তাহলে রোগীর অভিজ্ঞতা উন্নত করার কাজটি আরও কার্যকর হতে পারে।

এখানে শুধু কর্মীদের কাছ থেকে ভালো আচরণ প্রত্যাশা করলেই হবে না। তাদের প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা এবং দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ভালো সেবা দেওয়ার ইচ্ছার পাশাপাশি সেই সেবা দেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।

হাসপাতালের ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যান্ডকে অনেক সময় বিজ্ঞাপন, লোগো, প্রচারণা কিংবা গণমাধ্যমে উপস্থিতির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রয়োজন।

একটি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ বিভাগ হয়তো রোগীকেন্দ্রিক সেবার কথা তুলে ধরছে। সেই বার্তার সঙ্গে বাস্তব সেবার মিল রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা, নার্সিং, রোগীসেবা, অপারেশন এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন।

এ কারণে ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনা শুধু যোগাযোগের কাজ নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কার্যক্রম ও মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে সামঞ্জস্য বোঝারও একটি উপায়।

ডিজিটাল যুগে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। মানুষ এখন হাসপাতালের নিজের বক্তব্যের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, প্রশ্ন করেন এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু তার প্রকাশিত বার্তার ওপর নির্ভর করে না; সেই বার্তার সঙ্গে বাস্তবতার মিলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এখানে ডেটা সহায়ক হতে পারে। রোগীর মতামত, পুনরাবৃত্ত প্রশ্ন, অভিযোগের ধরন, যোগাযোগের সমস্যা এবং সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে উন্নতির ক্ষেত্র চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে ডেটাকে শুধু প্রতিবেদন হিসেবে ব্যবহার করলে তার মূল্য সীমিত থাকে। তথ্য থেকে পাওয়া শিক্ষা সিদ্ধান্ত ও কাজে প্রতিফলিত হওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমার দৃষ্টিতে, একটি প্রতিষ্ঠানের আস্থা তৈরির সক্ষমতা বোঝার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন জরুরি: রোগীর প্রশ্ন কি গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়? প্রয়োজনীয় তথ্য কি পরিষ্কারভাবে দেওয়া হয়? সমস্যার কথা জানালে কি যথাযথভাবে দেখা হয়? বিভিন্ন বিভাগ কি একই উদ্দেশ্যে কাজ করে? আর প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত মূল্যবোধ কি প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়?

এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি প্রচারণা বা সাময়িক উদ্যোগ থেকে পাওয়া যায় না। এগুলোর উত্তর তৈরি হয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের কাজের মধ্যে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে চিকিৎসা সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার গুরুত্ব বাড়তেই থাকবে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের কাজের পদ্ধতি, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং রোগীর প্রতি দায়িত্ববোধের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ আস্থা একবার তৈরি হলেই তা স্থায়ী হয়ে যায় না। প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি যোগাযোগের মাধ্যমে সেই আস্থা আরও শক্ত হতে পারে, আবার দুর্বলও হতে পারে।

আমার কাছে একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তাই শুধু তার চিকিৎসা সক্ষমতা বা পরিচিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিচয় হলো– প্রতিষ্ঠানটি নিজের দায়িত্ব কতটা বোঝে, মানুষের প্রয়োজনকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং নিজের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব কাজের কতটা মিল রাখতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা কোনো একটি বিভাগের প্রকল্প নয়; এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের দায়িত্ব।

একটি ভালো অভিজ্ঞতা একজন রোগীর মনে আস্থা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই আস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিকতার প্রতিফলন থাকতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু জানতে চান না, একটি হাসপাতাল কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

তারা দেখতে চান, সেই প্রতিশ্রুতির পক্ষে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন কী করছে।

লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম।

/এফআর/