অক্টোবরেই আন্তর্জাতিক ঘোষণা, প্রস্তুত কক্সবাজার বিমানবন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবরেই আন্তর্জাতিক ঘোষণা, প্রস্তুত কক্সবাজার বিমানবন্দর
ঝিনুকের আদলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালের নকশা

কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল এখন যাত্রী ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তুত। আগামী সপ্তাহে এই টার্মিনাল দিয়ে অভ্যন্তরীণ যাত্রী চলাচল শুরু হবে। আর অক্টোবরের শেষ দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক ঘোষণা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে।

বুধবার (২৩ অক্টোবর) বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নতুন টার্মিনাল এবং বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে।

বেবিচকের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) সদস্য এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম জানান, পুরোনো টার্মিনালে যাত্রী ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে আগামী সপ্তাহে নতুন টার্মিনাল চালু করা হবে। প্রথমে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রী ব্যবস্থাপনা সেখানে শুরু হবে। এরপর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে অক্টোবরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু করা হবে।

কক্সবাজার থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ চালু হলে বিদেশি পর্যটক বাড়বে এবং হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনভিত্তিক ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

এর আগে ২০২৫ সালে ১২ অক্টোবর বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিএ-১ শাখা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও ২৩ অক্টোবর তা স্থগিত করা হয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তারা বলছেন, এবার আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে আগের চেয়ে বেশি পরিকল্পিতভাবে।

নতুন টার্মিনালের ছাদ তৈরি করা হয়েছে ঝিনুকের আকৃতিতে। টার্মিনালের আয়তন প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার। এর আন্তর্জাতিক বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে ৪৫০ জন যাত্রী বসতে পারবেন। রয়েছে ডিউটি ফ্রি শপ, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এস্কেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন কাউন্টার, বহির্গমন ও আগমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং আগমন লাউঞ্জ।

কক্সবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই পর্যটন এলাকায় বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এখনও খুব কম। পুরোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোট হওয়ায় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব ধরনের উড়োজাহাজ সেখানে চলাচল করতে পারে না। ফলে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকায় এসে এরপর কক্সবাজার যেতে হয়।

এই পরিস্থিতি বদলাতে ২০১২ সালে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে রানওয়ে সম্প্রসারণে নতুন জায়গা খুঁজতে হয়। শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের দিকে রানওয়ে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২১ সালে শুরু হয় এ কাজ।

প্রকল্পের আওতায় ১০৫ একর জমি উন্নয়ন করা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আগামী ১০০ বছরে কতটা বাড়তে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে। সেই হিসাবের চেয়ে বেশি উচ্চতায় সি-ডিফেন্স তৈরি করা হয়েছে। প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধ সমুদ্রের ঢেউ থেকে রানওয়েকে রক্ষা করবে।

সি-ডিফেন্স তৈরিতে ৩০০ কেজি ওজনের পাথর এবং ৪ টন ওজনের সিসি ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি ব্লকের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকেও পাথর আনা হয়েছে। নরম মাটি ও কাদা সরাতে চীনা প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন ড্রেজার ব্যবহার করেছে।

সমুদ্রের বুকে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত রানওয়ে
সমুদ্রের বুকে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত রানওয়ে

কক্সবাজার বিমানবন্দরের পুরোনো রানওয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ৬ হাজার ফুট। পরে আরও ৩ হাজার ফুট বাড়িয়ে তা ৯ হাজার ফুট করা হয়েছে। এ সম্প্রসারণের ফলে রাতে উড়োজাহাজ ওঠানামার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রের ওপর প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট অ্যাপ্রোচ লাইট বসানো হয়েছে। এসব আলো উড়োজাহাজকে রানওয়ে ব্যবহারে পথ দেখাবে। রানওয়ে দিয়ে উড়োজাহাজ ওঠানামার সময় দুই পাশেই থাকবে বঙ্গোপসাগর।

বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরে প্রতিদিন ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। নতুন অবকাঠামোর ফলে বছরে যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে। সম্প্রসারিত রানওয়ে পূর্ণ বোঝাই অবস্থায় বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ও বোয়িং ৭৪৭-৪০০-এর মতো ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

নতুন টার্মিনালের ছাদ তৈরি করা হয়েছে ঝিনুকের আকৃতিতে। টার্মিনালের আয়তন প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার। এর আন্তর্জাতিক বহির্গমন লাউঞ্জে একসঙ্গে ৪৫০ জন যাত্রী বসতে পারবেন। রয়েছে ডিউটি ফ্রি শপ, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এস্কেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন কাউন্টার, বহির্গমন ও আগমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং আগমন লাউঞ্জ।

আন্তর্জাতিক বহির্গমনে ৪টি এবং আগমনে ৬টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার থাকবে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের লাগেজের জন্য দুটি বেল্ট রয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম, সাইনেজ, সিসিটিভি ও ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রন তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দুটি ওয়াইডবডি এবং তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ রাখা যাবে। দুটি ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ করে চালু করা হয়েছে। ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ গাড়ির পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তৈরি করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ সড়কসহ অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় মান যাচাই শেষে বিমানবন্দরটি আইকাও সনদও পেয়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্প্রতি আশা প্রকাশ করেছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ বিদেশি এয়ারলাইনগুলো কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করবে।

বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বলেন, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হলে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় হাইব্রিড পদ্ধতি চালু করা হবে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন– দুই কার্যক্রমই নতুন টার্মিনালে হবে। অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন হবে পুরোনো টার্মিনালে। আর অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন করে পরে পুরোনো টার্মিনালে গিয়ে উড়োজাহাজে উঠবেন। শুরুতে উড়োজাহাজ থেকে টার্মিনাল পর্যন্ত যাত্রী আনা-নেওয়ার জন্য গলফ কার্ট ব্যবহার করা হবে।

বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওসার মাহমুদ বলেন, আগামী সপ্তাহে নতুন টার্মিনাল চালু হবে। অক্টোবরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক ঘোষণা দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ঘোষণা দেবেন। আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।

সরকার আশা করছে, কক্সবাজার থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ চালু হলে বিদেশি পর্যটক বাড়বে। একইসঙ্গে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনভিত্তিক ব্যবসায় বিনিয়োগও বাড়বে।

/এফসি/