শিরোনাম

‘রাজস্ব না বাড়লে বাণিজ্য চুক্তি বাড়তি চাপ তৈরি করবে’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
‘রাজস্ব না বাড়লে বাণিজ্য চুক্তি বাড়তি চাপ তৈরি করবে’
লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর আদায় না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ। সংস্থাটির গবেষণায় এমন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে।

আগামী বাজেট বাস্তবসম্মত হতে যাচ্ছে, নাকি অলৌকিক প্রাক্কলন হচ্ছে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা এবং বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন অযোগ্য। পাশাপাশি এটি পুরোনো সংস্কৃতির ধারায় নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ সব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ এবং সিপিডি যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে।

রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রাক-বাজেট সংলাপে মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যায় সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামির দুই সংসদ সদস্যকে। অভিযোগের সত্যতা, আইনগত ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়।

এর আগে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক বিভিন্ন চাপের মধ্যে রয়েছে। বর্তমান সরকারেরও বয়স এখন পর্যন্ত তিন-চার মাস চলছে। এই সরকার অর্থনীতিকে কতটা দুর্বল অবস্থায় পেয়েছেন, সেটি এখনো তারা স্পষ্ট করতে পারেনি। তারাও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে পারতেন, কিন্তু সেটি তারা করেননি।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, খাল খননের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করলেও অর্থনীতি কীভাবে স্থিতিশীল হবে সেটা নিয়ে আলোচনা খুবই সামান্য। মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে সামাল দেবেন, কর্মসংস্থান কীভাবে বাড়ানো যাবে এই বিষয়গুলোতে তারা যথাযথভাবে ফোকাস করছেন না।

সিপিডির এই ফেলো বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট ৪০-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত অবাস্তবায়িত থেকে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য ২০-২৫ শতাংশ উন্নয়ন বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা পুরোনো সংস্কৃতির ধারায় চলছে। এটি অর্থনীতিকে আরো চাপের মুখে ফেলে দিতে পারে।

তিনি আরো বলেন, একইভাবে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে এটিও অবাস্তব। নতুন একটি সরকার দায়িত্বে এসেই রাজস্ব আহরণের টার্গেট এক থেকে দেড় লাখ কোটি বাড়িয়ে দেওয়াটা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। এটি রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে আদায় করাও সম্ভব হবে না। এমনিতেই বিগত বছরগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তার উপরে এই বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে সেটি আদায় সম্ভব হবে কিনা এটি নিয়ে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

মূল প্রবন্ধে সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর আদায় না বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ালে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হলে কর আদায় বৃদ্ধিও জরুরি। কর না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিও সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের ঋণ বাড়ছে, একই সঙ্গে উন্নয়ন চাহিদাও বাড়ছে। আসন্ন বাজেটে ঋণের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বলছে, বাংলাদেশ বর্তমানে ঋণের চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে আর্থিক চাপ তীব্র হবে। তিনি জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। এটি অর্জন করতে হলে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান কাঠামোতে বাস্তবায়ন সম্ভব কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১১ সালে রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশের কিছু বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, এরপর আর সেই মাত্রায় পৌঁছানো যায়নি।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর আদায় বাড়াতে হলে করের পরিধি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে করহার কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। তিনি আরও বলেন, কর আদায় না বাড়লে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বৃদ্ধির বিষয়েও নতুন করে বিশ্লেষণ দরকার।

সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে জনগণ কত দিচ্ছে এবং কত পাচ্ছে—এর সঠিক মূল্যায়ন হওয়া দরকার। পাশাপাশি জনগণের অর্থ থেকে কতটা অপচয় বা দুর্নীতি হচ্ছে, সেটিরও পরিমাপ থাকা উচিত।

তিনি আরও বলেন, আগামী বাজেটে ঋণের সুদ বাবদ এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এ ধরনের ঋণনির্ভরতা কমানো জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোয়িং বিমান চুক্তিসহ যে-সব চুক্তি হয়েছে, সেখানে শুল্কছাড়ের বিষয় থাকলেও বাস্তবে শুল্কহার কতটা কমবে, তার পূর্ণ মূল্যায়ন প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, খাতভিত্তিক বরাদ্দ বারবার না বাড়িয়ে বরং মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বরাদ্দ বাড়লেও লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড়ো ব্যবধান রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে। তিনি বলেন, বরাদ্দ না বাড়িয়ে ব্যয়ের মান নিশ্চিত করলে বাজেট ঘাটতি কমে আসতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও বিদ্যুৎ সমস্যা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বর্তমান সরকারের বয়স স্বল্প হওয়ায় এখনই কঠোর সমালোচনার সময় নয়। তবে কিছু উন্নতি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা থাকলেও এখন তা কিছুটা কমেছে এবং ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংলাপে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম খান মিলন ও মাহ্মুদা হাবীবা উপস্থিত ছিলেন।

চাঁদাবাজি নিয়ে বিএনপি-জামায়াত তর্ক

অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামির ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান দাবি করেন, রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার কাওরান বাজারে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। তিনি বলেন, শুধু কয়েকটি পাইকারি মুরগির দোকান থেকেই মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।

নিজের নির্বাচনি এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি আসলে চাঁদাবাজি এলাকার এমপি। কাওরান বাজারের চাঁদাবাজি নিয়ে বলতে গেলে একদিন সময় লাগবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। ‘ওপরে তারা রাজনৈতিক নেতা, ভেতরে চাঁদাবাজ। আগে আগের সরকারের লোকেরা করতো, এখন কারা করছে তা এখানে বলছি না।

জামায়াতের এই সংসদ সদস্য আরও দাবি করেন, কাওরান বাজারে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অতীতে সহিংস ঘটনাও ঘটেছে। তিনি বলেন, কাওরান বাজারকে ঘিরে যুবদলের এক নেতা নিহত হয়েছিলেন। পুলিশ সরকারি দলের লোকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা নেয় না।

এ সময় তিনি জানান, চাঁদাবাজি বন্ধে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও তার কথা হয়েছে। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, কাওরান বাজার ও তেজগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজি বন্ধে তিনি সরকারের সহযোগিতা চান।

তবে সাইফুল আলম খানের এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহ্মুদা হাবীবা। তিনি অভিযোগকে ‘ঢালাও বক্তব্য’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, একজন এমপি যদি বলেন তার এলাকায় চাঁদাবাজি হচ্ছে, অথচ কারা করছে তা জানেন না—এটা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের নাম-পরিচয়সহ তালিকা নিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। টকশো বা গোলটেবিলে বসে অভিযোগ করলেই হবে না।

মাহ্মুদা হাবীবা আরও বলেন, আমার এলাকায় কেউ চাঁদাবাজি করলে সে সরকারি দলের হোক বা অন্য দলের—আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো।

এর জবাবে সাইফুল আলম খান আবারও দাবি করেন, আগেও সরকারি দলের লোকেরা চাঁদাবাজি করতো, এখনও সরকারি দলের লোকেরাই করছে।

/এমআর/