শিরোনাম
এনডিএফের কর্মশালা বক্তরা

স্বাস্থ্য বাজেট বাড়লেও বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্ধেগ

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
স্বাস্থ্য বাজেট বাড়লেও বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্ধেগ
ন্যাশনাল ডক্টটরস ফোরাম (এনডিএফ) কর্তৃক আয়োজিত বাজেটোত্তর স্বাস্থ্য সাংবাদিক কর্মশালা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অনেকেই সাধু জানিয়েছেন। তবে এটির বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিকরা।

বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে ন্যাশনাল ডক্টটরস ফোরাম (এনডিএফ) কর্তৃক আয়োজিত বাজেটোত্তর ‘স্বাস্থ্য সাংবাদিক কর্মশালায়’ এসব কথা বলেন তারা।

কর্মশালায় বক্তরা বলেন, প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ জিডিপির ১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে এতো বড় বাজেটেও বাস্তবায়ন নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এতো বড় বরাদ্দ আগে কখনো হয়নি এটি যেমন ঠিক, তেমনি অতীতের মতো বাস্তবায়নে কৌশলী না হলে, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো না গেলে বড় বাজেটেও কোনো পরিবর্তন আসবেনা।

এনডিএফ’র দপ্তর সম্পাদক ডা. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ।

কর্মশালায় কি-নোট স্পিকার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। প্রধান আলোচক ছিলেন একই বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। এছাড়াও রাখেন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম।

অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি যেভাবে বাড়ছে, তার প্রভাব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরে এসেও পড়বে। বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চিকিৎসা নিতে বাংলাদেশের মানুষকে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। থাইল্যান্ডে যেখানে ১০ শতাংশ, মালদ্বীপে ১৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে ৭৯ শতাংশ। এমনকি শ্রীলঙ্কা, নেপালের থেকেও আমাদের নিজস্ব ব্যয় বেশি এবং ক্রমাগতভাবে তা বেড়েই চলেছে।

তিনি বলেন, আগামী বছরের জন্য প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে থোক বরাদ্দই রাখা হয়েছে ৬৭ শতাংশ। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রাক বাজেটে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, রিভাইস (সংশোধিত) বাজেটে তা মোটা অংকে কমে যায়। তাই যে বাজেট ঘোষণা হয়েছে, সেটির ব্যাপারে চূড়ান্ত বাজেটের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রুমানা হক বলেন, প্রাক বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসলেও কৃষি কিংবা অন্যান্য খাতে বাজেটে কমার হার খুবই কম। হাসপাতালগুলোর যন্ত্রাতির বড় একটি অংশ কার্যকর নয়। জেলা সদর হাসপাতালের প্রায় ১৩ শতাংশে এবং উপজেলা পর্যায়ে ৪৭ শতাংশ হাসপাতালে এক্স-রে কার্যকর থাকলেও নেই ৮৭ শতাংশ ও ৫৩ শতাংশে। কাজেই রোড ম্যাপ ছাড়া এই বাজেট বাস্তবায়নে সফল হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৌশলী হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বাজেটকে তখনই ভাল বলা যেতে পারে, যখন তা চলমান ব্যবস্থা বদলে দিতে পারে। এবারের বাজেটে পরিমাণ যাই হোক, যেসব জায়গায় সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের সাধারণ মানুষ সুফল ভোগ করবে। রোগীরা যাতে যথাযথভাবে সেটাবাটা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদন্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ৫ থেকে ৭ শতাংশ হওয়া আবশ্যক বা মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও আমরা সে জায়গায় এখনো যেতে পারিনি। তবে বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হয়, তারা আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নেবে বলে জানিয়েছে।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, ‘আমাদের বড় একটি সমস্যা জনবল। দেশের প্রায় স্বাস্থ্যসেবাখাতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮০ হাজারের মত লোকের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদন্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার রোগীর জন্য যে চিকিৎসক দরকার তার ১৮ ভাগ এবং নার্সের মধ্যে রয়েছে ১২ ভাগের মত। জনবল তৈরি না হলে স্বাস্থ্যসেবাকে কখনোই কাঙ্খিত জায়গায় নেওয়া যাবেনা।’

তিনি বলেন, প্রতিবছর চিকিৎসা নিতে গিয়ে ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র সীমা নিচে চলে যাচ্ছে। মানুষ একটা কাপড় কিনতে গেলে হয়তো চিন্তা করে পরে কিনলেও হবে, কিন্তু ওষুধের ক্ষেত্রে সেটি করার থাকেনা। এজন্য ওষুধ লেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসককে খেয়াল রাখতে হবে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখছে কিনা। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়ন না থাকায় এটি থামানো যাচ্ছেনা। পাশাপাশি প্রতিবছর শুধু রোগ নির্ণয়েই ২৫ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে রোগীদের। উপজেলা হাসপাতালে অতি সাধারণ যন্ত্র এক্স-রে করতে গিয়ে যদি না পাওয়া যায়, তখন বাইরে থেকে করাতে গেলেই রোগীর খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ সরকারি যন্ত্র ঠিকই পড়ে আছে।

কর্মশালায় এনডিএফ’র জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি প্রতীক ইজাজ, সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভসহ ফোরামের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

/এসবি/