শিরোনাম

অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ

সিটিজেন ডেস্ক
অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ
নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান। ছবি: পিআইডি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা স্পর্শকাতর বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নবনির্বাচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার জানিয়েছে, তারা অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করছে। তবে কোনগুলো বহাল থাকবে আর কোনগুলো বাতিল হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক অধ্যাদেশ জারির বিষয়টি নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে।

জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, গড়ে পাঁচ দিনেরও কম সময়ে একটি করে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। তার ব্যাখ্যা, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত করা হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামী ১২ মার্চ। ফলে অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হবে সরকারকে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে আপত্তি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামিসহ প্রায় সব সক্রিয় রাজনৈতিক দলই সরকারটিকে সমর্থন দেয়।

তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আদেশ জারি করার সময় থেকেই বিএনপি আপত্তি জানায়। দলটির দাবি ছিল, অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন আছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ড. মুহাম্মদ ইউনূস

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠনের পরও ওই অবস্থানে রয়েছে বিএনপি এমন ইঙ্গিত মিলেছে। বিএনপি ও তাদের মিত্রদের ২১২ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির জোটের নির্বাচিতরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন।

আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানের কোনো অংশ বাতিল বা পরিবর্তন করা যায় না। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ নিয়ে ভিন্ন সুর

সবচেয়ে আলোচিত অধ্যাদেশগুলোর একটি হলো ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’। গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে এটি জারি করা হয়। এতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিধান রাখা হয় এবং নতুন মামলা দায়েরেও বাধা দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ অধ্যাদেশের সমালোচনা করে বলেছিল, এতে গুরুতর অপরাধের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, যা সংবিধানবিরোধী। তবে জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা এ সমালোচনার বিরোধিতা করেন।

বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দায়মুক্তির অধ্যাদেশকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার চিন্তা রয়েছে সরকারের। তার ভাষ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন– এই আবেগ-অনুভূতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্দোলনের সময় পুলিশ হত্যার ঘটনাগুলো আলাদাভাবে তদন্তের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

গণভোট ও অন্যান্য স্পর্শকাতর অধ্যাদেশ

সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়েছে। ফলে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়া হবে কি না– তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের ফল কার্যকর করতে সরকার বাধ্যবাধকতার মুখে পড়তে পারে।

এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩২ বছর করা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার অধ্যাদেশও পর্যালোচনায় রয়েছে। নির্বাচনের আগে এসব বিষয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্য আপত্তি না থাকলেও এখন বিএনপি সরকার চূড়ান্ত অবস্থান জানায়নি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল

বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার প্রশ্নে বলেন, বিষয়টি আইন অনুযায়ী হবে।

রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা

সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশ বহাল রাখা হবে না। সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং জরুরি– এমন কিছু অধ্যাদেশ বাছাই করে সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করা হতে পারে।

আইনজ্ঞদের মতে, যেসব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি দেওয়া হবে না, সেগুলোর অধীনে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আইনি জটিলতাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সরকারকে। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে নতুন সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এসএ/