বাসের চাকরি ছেড়ে ব্যাটারি রিকশায়, আয় ও স্বাধীনতাই বড় আকর্ষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাসের চাকরি ছেড়ে ব্যাটারি রিকশায়, আয় ও স্বাধীনতাই বড় আকর্ষণ
রাজধানীর সড়কে গণপরিবহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

রাজধানীর গণপরিবহনে শ্রমিক সংকটে পড়েছেন বাস মালিকরা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যানজট, অনিশ্চিত আয় ও প্রতিকূল কর্মপরিবেশের কারণে অনেকে বাসের চাকরি ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন। নগদ টাকা প্রতিদিন হাতে পাওয়া, নিজের সুবিধামতো কাজের সময় আর বেশি আয়ের হাতছানিতে তারা অনেকেই পেশা বদলাচ্ছেন। এদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ঢাকার সড়কে টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা বাস চালিয়ে কিংবা সহকারীর কাজ করে দিনে ১ হাজার টাকা আয় করা অনেক চালক ও সহকারীর জন্য কঠিন। অথচ ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে একই ব্যক্তি দিনে দেড়-দুই হাজার টাকা বা তারও বেশি আয় করতে পারছেন। ফলে চালক-সহকারীর সংকটে রাস্তায় বাস নামাতে পারছেন না অনেক মালিক। যেগুলো চলছে সেগুলোর জন্যও কর্মী জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

রাজধানীর প্রধান টার্মিনালগুলো ঘিরে প্রায় ১০ হাজার বাস চলে। এর জন্য চালক, সহকারী ও কন্ডাক্টর মিলিয়ে অন্তত ৬০ হাজার শ্রমিক দরকার। এদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় কোনো নিবন্ধন না থাকায় এ যানের সঠিক সংখ্যা কারো জানা নেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, রাজধানীতে ব্যাটারি রিকশার অনুমিত সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।

জানা গেছে, শুধু টাকার হিসাব নয়, সড়কে বিভিন্ন নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার হাতছানিও অনেকে চালককে আকর্ষণ করছে। বাসচালকদের নির্দিষ্ট স্টপেজে থামা, নিয়ম মেনে যাত্রী ওঠানো-নামানো ও ট্রাফিক আইন মানতে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহির এ ফারাক পেশা বদলের একটি কারণ।

বাস শ্রমিকদের পেশা ছাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আয়। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) জরিপে দেখা গেছে, একজন বাসচালক বা সহকারী টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করেও হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারেন না। প্রত্যাশিত আয়ের অভাব, যানজটের ভোগান্তি, সামাজিক মর্যাদার অভাব এবং যাত্রীদের হয়রানি– সব মিলিয়ে মানুষ এ পেশা ছাড়ছেন।

শ্রমিকদের অভিযোগ, বাস চালিয়ে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। ট্রিপ কম হলে আয়ও কমে যায়। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালালে প্রতিদিন টাকা হাতে পাওয়া যায়, নিজের সুবিধামতো কাজও করা যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাটারি রিকশার মূল আকর্ষণ নগদ অর্থ ও কাজের স্বাধীনতা। বাসের চাকরিতে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম বা আয়ের নিশ্চয়তা নেই। রিকশায় কাজের সময় অনেকটাই নিজের হাতে। পুরো দিন চালালে গড়ে প্রায় ২ হাজার এবং অর্ধদিবসে প্রায় ১ হাজার টাকা আয় সম্ভব। গ্যারেজ ভাড়া, বিদ্যুতের চার্জ, স্থানীয় জমা ও সমিতির চাঁদা বাদ দিয়েও কোনো কোনো চালক মাসে ২০ হাজার টাকা বা তার বেশি হাতে রাখতে পারেন। কেউ নিজের রিকশা চালান, কেউ দৈনিক ভাড়ায়। একটি রিকশার দাম আনুমানিক ৮০ হাজার টাকা। ঋণ বা কিস্তিতেও এগুলো কেনা যায়।

জানা গেছে, শুধু টাকার হিসাব নয়, সড়কে বিভিন্ন নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার হাতছানিও অনেকে চালককে আকর্ষণ করছে। বাসচালকদের নির্দিষ্ট স্টপেজে থামা, নিয়ম মেনে যাত্রী ওঠানো-নামানো ও ট্রাফিক আইন মানতে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহির এ ফারাক পেশা বদলের একটি কারণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাসের কর্মপরিবেশও প্রতিকূল। চালক ও সহকারীদের ইঞ্জিনের পাশে প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে হয়। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, ঝাঁকুনি ও বিশ্রামের অভাবে অনেকে কোমর ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভোগেন। কাজের ফাঁকে শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগও সব সময় মেলে না। এক-দুইদিন বিশ্রাম নিলে অনেক ক্ষেত্রে সেই সময়ের কোনো বেতন মেলে না। আবার কর্মদিবসে বেশি আয় করতে গিয়ে বাড়তি চাপে পড়তে হয়।

বাস পরিচালনার পদ্ধতি বদলে যাওয়ায় শ্রমিকদের ওপর চাপ আরো বেড়েছে। আগে ওয়ে বিলভিত্তিক ব্যবস্থায় বাসের চলাচল অনুযায়ী শ্রমিকরা নির্দিষ্ট আয়ের সুযোগ পেতেন। সেই ব্যবস্থা উঠে গিয়ে চুক্তিভিত্তিক পরিচালনা বাড়ায় অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। যানজটে ট্রিপ কমায় মালিকের দৈনিক জমা মিটিয়ে নিজের আয় নিশ্চিত করা চালকদের জন্য কঠিন।

এদিকে ব্যাটারি রিকশার বিশৃঙ্খল চলাচল সামলাতে সরকারি সংস্থাগুলো এখন নীতিগত উদ্যোগ নিচ্ছে। ২৯ সেপ্টেম্বর তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএর সমন্বয় সভায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পর্যায়ক্রমে চলাচল নিয়ন্ত্রণ, এলাকাভিত্তিক জোন নির্ধারণ, নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ড চালু এবং ডিজিটাল পারমিটের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়।

তবে নিয়ন্ত্রণই একমাত্র সমাধান নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে এলে বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও যানজটের চাপ কমবে, বাড়বে বাসের ট্রিপ। কিন্তু চালকের আয়, কাজের সময়, বিশ্রাম ও পেশাগত নিরাপত্তার প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে শ্রমিকদের বাসে ফেরানো কঠিন হবে।

/এফসি/