শিরোনাম

সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি
সোনালী ধানে কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেও বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে যথাযথ দাম পান না

সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে সাধারণ কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন কোনো সরকারের আমলেই হয়নি। চালকল মালিকরা যে সুবিধা পান সেই তুলনায় কৃষকের প্রাপ্তি খুবই সামান্য। এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছিল পতিত আওয়ামী লীগ আমলে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার দাবি উঠলেও তা পূরণ হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম বোরো মৌসুমেও সরকারি ক্রয়মূল্য নিয়ে অসন্তোষ কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ রয়েই গেছে।

সরকার ধান ও চাল– দুটিই সংগ্রহ করে, কিন্তু কৃষক মূলত ধান বিক্রির সুযোগ পান। আবার ধান সংগ্রহ করা হয় তুলনামূলক কম। চাল সরবরাহের বড় অংশের জন্য চুক্তি হয় চালকল মালিকদের সঙ্গে। ফলে সরকারের নির্ধারিত দামের সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে ছোট কৃষক সরকারের কাছে বেশি লাভের সুযোগ সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে ধান বিক্রি করে দেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭টি। অথচ সরকারি গুদামে ধান সংগ্রহের জন্য নিবন্ধিত কৃষক আছেন মাত্র ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৩ জন। অন্যদিকে নিবন্ধিত মিল রয়েছে ৬ হাজার ৩০১টি।

২০১৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকার বোরো মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে মাত্র দেড় লাখ টন ধান কেনার লক্ষ্য নিয়েছিল। যেখানে চালকল মালিকদের কাছ থেকে কেনার লক্ষ্য ছিল সাড়ে ১১ লাখ টন চাল, যা ধানের হিসাবে প্রায় ২০ লাখ টনের সমান।

সেসময় কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে সরকারকে বেশি দামে চাল সরবরাহ করে মিলাররা লাভবান হয়েছেন– এমন খবরও গণমাধ্যমে উঠে আসে। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেকেরই কৃষক হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির ঘটনা উঠে আসে। কুষ্টিয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে সরকারি চাল সংগ্রহে মিলারদের কাছে প্রতি কেজিতে ২ টাকা কমিশন দাবির অভিযোগ ওঠে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, সরকার যখন কেনে, তখন আর্দ্রতার বিষয় থাকে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে কৃষক পারলে ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি করে দেন। কখনো কখনো জমিতে মাড়াইয়ের সময়ই বিক্রি করে দেন। অনেক কৃষক কিন্তু সরকারকে ধান দেওয়ার চেষ্টাও করেন না।

তবে সমস্যা শুধু রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার জন্য কৃষককে নির্দিষ্ট আর্দ্রতার মাত্রা পূরণ, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবসহ নানা শর্ত পূরণ করতে হয়। ওই বছর অনেক প্রান্তিক কৃষকের ধান নির্ধারিত আর্দ্রতার সীমায় না থাকায় ফেরত দেওয়া হয়েছিল। পরে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে শুকিয়ে কৃষকের কার্ড ব্যবহার করে সরকারি গুদামে বিক্রির চেষ্টা করেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, ২০২৫ সালের বোরো সংগ্রহকে সামনে রেখে কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, সরকার ধানের তুলনায় বেশি চাল কারণে মিলাররা বেশি সুবিধা পান। তাদের প্রস্তাব ছিল– সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে পরে মিলারদের নির্দিষ্ট মজুরি দিয়ে সেই ধান ছাঁটাই করাবে। এতে মিলারদের প্রয়োজনীয় ভূমিকা থাকবে, কিন্তু সরকারি ক্রয়ের সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছে যাবে। কিন্তু তা হয়নি।

বিএনপি সরকার গঠনের পর বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহে ময়মনসিংহ, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকরা অনিয়মের অভিযোগ করেন। এর মধ্যে অনিয়মের ঘটনা তদন্তে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, সরকার যখন কেনে, তখন আর্দ্রতার বিষয় থাকে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে কৃষক পারলে ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি করে দেন। কখনো কখনো জমিতে মাড়াইয়ের সময়ই বিক্রি করে দেন। অনেক কৃষক কিন্তু সরকারকে ধান দেওয়ার চেষ্টাও করেন না।

কৃষকের সুবিধার জন্য নতুন উদ্যোগের ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ধান মৌসুমের এক-দুই মাস পর তা কেনা যায় কিনা– এ নিয়ে আলোচনা চলছে। কৃষক ধান শুকিয়ে গোলায় ভরে রাখবে। সেসব ধানে আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের ওপরে থাকে না। ওই সময় যদি কেনা যায়, তাহলে কৃষক ও সরকার লাভবান হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় কোনো ইউনিয়ন বা বড় বাজার এলাকায় আগে থেকে ঘোষণা করা হবে। সেখানে কৃষকরা ধান নিয়ে আসবেন। সরকার সরাসরি কিনবে।

/এফসি/