শিরোনাম

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা

সিটিজেন ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা
ভিয়েতনামে যানজটের মধ্যে দিয়ে ভিনফাস্টের বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। ছবি: এপি

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু ভূরাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রতিক্রিয়া বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার এবং পরিবহন খাতেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশেই বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) প্রতি আগ্রহ ও চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক উদ্যোক্তা রসকো জুয়েল বলন, কয়েক মাস আগেও তিনি গড়ে প্রতি দুই মাসে একটি ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করতেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন তিনি প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহেই একটি করে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করছেন। তিনি ‘অ্যামেজিং ইভি’ নামে একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস পরিচালনা করেন।

জুয়েলের ভাষ্য, ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন বাজারে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এসব গাড়ির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, কিছু ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ২০ শতাংশও ছাড়িয়েছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বড় অর্থনীতির দেশগুলোতেও পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে ২০২৫ সালে কিছুটা মন্দার পর আবারও বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রিতে গতি ফিরে এসেছে। চায়না অটোমোটিভ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে চীনা উৎপাদকদের বিক্রি আগের মাসের তুলনায় ৮২.৬ শতাংশ বেড়েছে।

জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় একটি পেট্রোল স্টেশনে খালি সাইনবোর্ড প্রদর্শন করা হচ্ছে। ছবি: এপি
জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় একটি পেট্রোল স্টেশনে খালি সাইনবোর্ড প্রদর্শন করা হচ্ছে। ছবি: এপি

অন্যদিকে, কক্স অটোমোটিভের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে ইভি বিক্রি ৮২ হাজার ইউনিট ছাড়িয়েছে। যদিও এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম, তবে ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। ভিয়েতনামের স্থানীয় ব্র্যান্ড ভিনফাস্ট জানিয়েছে, মার্চ মাসে তাদের বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৭ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এ অঞ্চলের উদীয়মান বাজারগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যেমনটি ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি সংকটের সময় দেখা গিয়েছিল।

জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমবার-এর বিশ্লেষক ইউয়ান গ্রাহাম বলেন, ২০২০ সালে বিশ্ব দুইবার বড় ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতে দেশগুলো বিকল্প সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বর্তমান সময়ে সেই বিকল্পগুলোর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তার মতে, এই ধারাবাহিক সংকট অনেক দেশের জন্য বৈদ্যুতিক গাড়ি গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জাপানে গত মাসে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি প্রায় তিনগুণ হয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি বেড়েছে ১৭২ শতাংশ।

ইউরোপেও একই চিত্র। ফ্রান্সে টেসলার নতুন নিবন্ধন তিনগুণ বেড়েছে। নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কেও এই ব্র্যান্ডের গাড়ির নিবন্ধনে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে মোট গাড়ি বিক্রির ১৪.৬ শতাংশই ছিল ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দেশটির বিওয়াইডি পরিবেশক ইভিডিরেক্ট-এর প্রধান নির্বাহী ডেভিড স্মিথারম্যান জানান, জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগের কারণে শোরুমে ক্রেতাদের আগ্রহ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।

চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত সাংহাই অটো শো চলাকালীন একটি বিওয়াইডি লোগো দেখা যাচ্ছে। ছবি: এপি
চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত সাংহাই অটো শো চলাকালীন একটি বিওয়াইডি লোগো দেখা যাচ্ছে। ছবি: এপি

মেলবোর্নের ইভি ডিলারশিপ ‘ইভলভ মোটরস’-এর অপারেশনস ও সোর্সিং ম্যানেজার কেভিন অ্যালবেরিকা বলেন, এক শনিবারেই তাদের এক কর্মী সাতটি টেসলা বিক্রি করেছেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি জানান, আগে যেখানে শতাধিক টেসলা ছিল, এখন প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই।

যদিও অস্ট্রেলিয়া জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ, তবুও দেশটির পেট্রোল ও ডিজেলের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। সরকার জানিয়েছে, তাদের হাতে প্রায় এক মাসের জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং মে মাস পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।

এই প্রেক্ষাপটে অনেক ব্যবসায়ীও বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ তাদের ডিজেলচালিত গাড়ি বদলে টেসলা কিনছেন, যাতে জ্বালানি ব্যয় কমানো যায়।

বেঞ্চমার্ক মিনারেল ইন্টেলিজেন্সের ডেটা ম্যানেজার চার্লস লেস্টার বলেন, বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে পেট্রোলের দামের ওপর। যদি দীর্ঘ সময় ধরে দাম বেশি থাকে, তাহলে ভোক্তারা নতুন গাড়ি কেনার সময় বৈদ্যুতিক বিকল্প বিবেচনা করবেন।

এদিকে, বাড়তে থাকা চাহিদা ইভি সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করছেন, সরকারগুলো এখন জ্বালানি ইঞ্জিন-নির্ভর যানবাহন থেকে সরে আসার প্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

এরই অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য সরকার সম্প্রতি আঞ্চলিক এলাকাগুলোতে ইভি চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে ৭১ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছে। যদিও ফেডারেল পর্যায়ে কর-সুবিধা কমানোর সম্ভাবনা এই উদ্যোগে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টে একটি কিয়া নিরো বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ হচ্ছে। ছবি: এপি
রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টে একটি কিয়া নিরো বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ হচ্ছে। ছবি: এপি

অস্ট্রেলিয়ান ইলেকট্রিক ভেহিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জেমস পিকারিং মনে করেন, নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে অস্ট্রেলিয়ার অগ্রগতি দেশটিকে পরিবহন ব্যবস্থার বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রে একটি অনুকূল অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে অনেক ভোক্তার জন্য বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তর আর্থিকভাবে লাভজনকও হয়ে উঠছে। মেলবোর্নের ২৭ বছর বয়সী সরকারি কর্মচারী জ্যারেড জানান, তিনি ফেব্রুয়ারিতে তার প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার পর খরচ দেখে বিস্মিত হয়েছেন।

তার ভাষায়, বাড়িতে গাড়ি চার্জ দিতে খরচ হয় মাত্র ৬.৬০ ডলার, যা প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় অনেক কম। এখন পর্যন্ত এই পরিবর্তনে তার কোনো অভিযোগ নেই।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তা বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে বৈশ্বিক গন্তব্যকে আরও ত্বরান্বিত করছে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমআর/