যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় কী মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় কী মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন
সিজেডএন ডেস্ক

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বছর চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা বেশ ভালোভাবেই নজর কাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও জর্ডানের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা এরই মধ্যে বেইজিং সফর করেছেন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানির চীন সফর এবং এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায় কর্মকর্তাদের বেইজিং সফর উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হলেও দিন বদলাচ্ছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করতে চাইছে।

মার্কিন মডেল অনুসরণ করতে চায় না চীন
উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে প্রভাবশালী বহিরাগত সামরিক শক্তি। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্রব্যবস্থা, নৌ সক্ষমতা এবং সামরিক উপস্থিতির কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে নিজেদের সামরিক শক্তির পাল্লায় মেপে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। নৌ সক্ষমতা বা সামরিক জোট গঠনের বিচারে চীন এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হওয়ার ধারেকাছেও নেই।
কিন্তু কেবল সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে চীনের কৌশলগত প্রভাবকে মাপা ভুল হবে। কারণ, উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়ার কোনো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা চীনের নেই। বরং ওয়াশিংটনের তৈরি নিরাপত্তা কাঠামোর সুবাদেই দীর্ঘসময় ধরে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে চীন। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেল পরিবহনের সমুদ্রপথগুলো নিরাপদ রাখতে কাজ করেছে। এ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পরিবেশই চীনা কোম্পানিগুলোকে সেখানে অবাধে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
চীনের হিসাব পরিষ্কার- এ ব্যবস্থায় খরচ কম, কিন্তু লাভ অনেক। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে গেলে উপসাগরের প্রধান নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক ঝুঁকি নিতে হতো। এটি বেইজিংয়ের জন্য খুব একটা লাভজনক নয়। তাই তারা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। সামরিক শক্তির পেছনে না ছুটে চীন এমন সব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে।

বন্দর থেকে প্রযুক্তি সব খাতে বাড়ছে চীনা অংশীদারত্ব
উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে এখন নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বড় উদাহরণ হলো চায়না কসকো শিপিং পোর্টস। এই প্রতিষ্ঠানটি আমিরাতের খলিফা বন্দরের সিএসপি আবুধাবি টার্মিনাল পরিচালনাকারী যৌথ উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
তবে বন্দর ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের উপসাগরীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে চলা খাতগুলোতেও চীনা কোম্পানির উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, আধুনিক উৎপাদন খাত, লজিস্টিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো ক্ষেত্রগুলোতেও তাদের বিনিয়োগ চোখে পড়ার মতো।
এভাবেই চীন এমন এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করছে, যা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্ত জুড়ে দেয় না। উপসাগরীয় দেশগুলোকে জোর করে চীনপন্থী হতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। বেইজিংয়ের কৌশল হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে চীনবিরোধী অবস্থান নেওয়াটাই ওই দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়।

দুই নৌকায় পা রেখে চলছে উপসাগরীয় দেশগুলো
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভাবনাতেও স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে একই সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় কোনো বিরোধ নেই। সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার- তিনটি দেশই একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উন্নত পশ্চিমা প্রযুক্তি ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে তেমনি চীনের বিশাল বাজার, বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা এবং এশিয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সুযোগ নিতে পিছপা হচ্ছে না।
এ দেশগুলোর মূল লক্ষ্য হলো কোনো একটিমাত্র শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থাকা। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণ, ঝুঁকি এড়ানো এবং নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেই তারা বর্তমানের বহুমেরুকেন্দ্রিক পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
এসব পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, একটি মাত্র নিরাপত্তা অংশীদার, একটি মাত্র রপ্তানি বাজার বা একটি মাত্র প্রযুক্তিব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো দেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। ফলস্বরূপ, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বৈচিত্র্যকরণ এখন আর শুধু খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ভবিষ্যতের হাতছানি
তেল ও গ্যাসের ওপর শতভাগ নির্ভরতা কাটিয়ে নতুন শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক লজিস্টিকস এখন তাদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাত নিয়ে চলছে বড় বড় কর্মযজ্ঞ। সৌদি আরবের হিউম্যাইন এবং আমিরাতের জি৪২- এর মতো উদ্যোগগুলোই প্রমাণ করে দেশগুলো প্রযুক্তি বিশ্বে কতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। তবে শুধু কিছু সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি কোম্পানি দিয়ে তো আর এআই সাম্রাজ্য গড়া যায় না। এর জন্য দরকার হয় উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার, বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ, শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো, পর্যাপ্ত মূলধন এবং দক্ষ জনবল। আর এ জায়গাতেই উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অংশীদার খুঁজছে, যারা প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও শিল্প সহযোগিতায় তাদের এই নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে সাহায্য করতে পারে।
কেবল সামরিক ক্ষমতাই শেষ কথা নয়
সামগ্রিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের জন্যও নিজেদের কৌশলগত প্রভাব মাপার পুরোনো মাপকাঠিগুলো বদলানোর সময় এসেছে। কোনো অঞ্চলে কার কটা সামরিক ঘাঁটি আছে- ভবিষ্যতে হয়তো সেটাই একমাত্র বা প্রধান প্রভাবের পরিমাপক হবে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে, একটি দেশের তৈরি করা অর্থনৈতিক শিকড় বা প্রভাবকে আঞ্চলিক ব্যবস্থা থেকে উপড়ে ফেলা কতটা কঠিন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এখনও বহুস্তরীয় ও গভীর। প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও এই অঞ্চলের বন্ধন অত্যন্ত পোক্ত।
অন্যদিকে, চীন তৈরি করছে অন্যরকম এক সম্পর্ক। বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি করা হচ্ছে। এটি দিনশেষে শক্তিশালী লিভারেজ বা প্রভাবে রূপ নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন প্রতিযোগিতার সমীকরণ
এমন বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে জোর করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা ওয়াশিংটনের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। এর বদলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সংবেদনশীল তথ্য এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমেরিকার কিছু নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকতেই পারে, যেখানে স্পষ্ট ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকাও স্বাভাবিক।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনেও খোলা মাঠে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন এবং গভীর শিল্প অংশীদারত্বের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর এ ঐতিহাসিক রূপান্তরে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, কেবল সামরিক শক্তির ওপর ভর করে এখন আর প্রতিটি প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক খাতে একাধিপত্য ধরে রাখা সম্ভব নয়।
একইভাবে চীনের কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে তার শূন্যস্থান দখল করা নয়। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর জালে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব তৈরি করা, যার ফলে এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের কোনো একক আধিপত্যের লড়াইয়ের গল্প নয়। এটি হতে চলেছে বহুমুখী অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং সূক্ষ্ম কৌশলগত ভারসাম্যের এক নতুন অধ্যায়। আর এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় সামরিক শক্তির পাশাপাশি বন্দর, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থাও হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
সূত্র: আল জাজিরা

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বছর চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা বেশ ভালোভাবেই নজর কাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও জর্ডানের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা এরই মধ্যে বেইজিং সফর করেছেন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানির চীন সফর এবং এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায় কর্মকর্তাদের বেইজিং সফর উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হলেও দিন বদলাচ্ছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করতে চাইছে।

মার্কিন মডেল অনুসরণ করতে চায় না চীন
উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে প্রভাবশালী বহিরাগত সামরিক শক্তি। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্রব্যবস্থা, নৌ সক্ষমতা এবং সামরিক উপস্থিতির কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে নিজেদের সামরিক শক্তির পাল্লায় মেপে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। নৌ সক্ষমতা বা সামরিক জোট গঠনের বিচারে চীন এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হওয়ার ধারেকাছেও নেই।
কিন্তু কেবল সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে চীনের কৌশলগত প্রভাবকে মাপা ভুল হবে। কারণ, উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়ার কোনো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা চীনের নেই। বরং ওয়াশিংটনের তৈরি নিরাপত্তা কাঠামোর সুবাদেই দীর্ঘসময় ধরে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে চীন। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেল পরিবহনের সমুদ্রপথগুলো নিরাপদ রাখতে কাজ করেছে। এ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পরিবেশই চীনা কোম্পানিগুলোকে সেখানে অবাধে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
চীনের হিসাব পরিষ্কার- এ ব্যবস্থায় খরচ কম, কিন্তু লাভ অনেক। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে গেলে উপসাগরের প্রধান নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক ঝুঁকি নিতে হতো। এটি বেইজিংয়ের জন্য খুব একটা লাভজনক নয়। তাই তারা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। সামরিক শক্তির পেছনে না ছুটে চীন এমন সব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে।

বন্দর থেকে প্রযুক্তি সব খাতে বাড়ছে চীনা অংশীদারত্ব
উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে এখন নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বড় উদাহরণ হলো চায়না কসকো শিপিং পোর্টস। এই প্রতিষ্ঠানটি আমিরাতের খলিফা বন্দরের সিএসপি আবুধাবি টার্মিনাল পরিচালনাকারী যৌথ উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
তবে বন্দর ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের উপসাগরীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে চলা খাতগুলোতেও চীনা কোম্পানির উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, আধুনিক উৎপাদন খাত, লজিস্টিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো ক্ষেত্রগুলোতেও তাদের বিনিয়োগ চোখে পড়ার মতো।
এভাবেই চীন এমন এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করছে, যা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্ত জুড়ে দেয় না। উপসাগরীয় দেশগুলোকে জোর করে চীনপন্থী হতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। বেইজিংয়ের কৌশল হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে চীনবিরোধী অবস্থান নেওয়াটাই ওই দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়।

দুই নৌকায় পা রেখে চলছে উপসাগরীয় দেশগুলো
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভাবনাতেও স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে একই সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় কোনো বিরোধ নেই। সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার- তিনটি দেশই একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উন্নত পশ্চিমা প্রযুক্তি ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে তেমনি চীনের বিশাল বাজার, বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা এবং এশিয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সুযোগ নিতে পিছপা হচ্ছে না।
এ দেশগুলোর মূল লক্ষ্য হলো কোনো একটিমাত্র শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থাকা। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণ, ঝুঁকি এড়ানো এবং নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেই তারা বর্তমানের বহুমেরুকেন্দ্রিক পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
এসব পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, একটি মাত্র নিরাপত্তা অংশীদার, একটি মাত্র রপ্তানি বাজার বা একটি মাত্র প্রযুক্তিব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো দেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। ফলস্বরূপ, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বৈচিত্র্যকরণ এখন আর শুধু খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ভবিষ্যতের হাতছানি
তেল ও গ্যাসের ওপর শতভাগ নির্ভরতা কাটিয়ে নতুন শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক লজিস্টিকস এখন তাদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাত নিয়ে চলছে বড় বড় কর্মযজ্ঞ। সৌদি আরবের হিউম্যাইন এবং আমিরাতের জি৪২- এর মতো উদ্যোগগুলোই প্রমাণ করে দেশগুলো প্রযুক্তি বিশ্বে কতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। তবে শুধু কিছু সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি কোম্পানি দিয়ে তো আর এআই সাম্রাজ্য গড়া যায় না। এর জন্য দরকার হয় উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার, বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ, শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো, পর্যাপ্ত মূলধন এবং দক্ষ জনবল। আর এ জায়গাতেই উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অংশীদার খুঁজছে, যারা প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও শিল্প সহযোগিতায় তাদের এই নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে সাহায্য করতে পারে।
কেবল সামরিক ক্ষমতাই শেষ কথা নয়
সামগ্রিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের জন্যও নিজেদের কৌশলগত প্রভাব মাপার পুরোনো মাপকাঠিগুলো বদলানোর সময় এসেছে। কোনো অঞ্চলে কার কটা সামরিক ঘাঁটি আছে- ভবিষ্যতে হয়তো সেটাই একমাত্র বা প্রধান প্রভাবের পরিমাপক হবে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে, একটি দেশের তৈরি করা অর্থনৈতিক শিকড় বা প্রভাবকে আঞ্চলিক ব্যবস্থা থেকে উপড়ে ফেলা কতটা কঠিন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এখনও বহুস্তরীয় ও গভীর। প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও এই অঞ্চলের বন্ধন অত্যন্ত পোক্ত।
অন্যদিকে, চীন তৈরি করছে অন্যরকম এক সম্পর্ক। বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি করা হচ্ছে। এটি দিনশেষে শক্তিশালী লিভারেজ বা প্রভাবে রূপ নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন প্রতিযোগিতার সমীকরণ
এমন বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে জোর করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা ওয়াশিংটনের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। এর বদলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সংবেদনশীল তথ্য এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমেরিকার কিছু নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকতেই পারে, যেখানে স্পষ্ট ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকাও স্বাভাবিক।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনেও খোলা মাঠে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন এবং গভীর শিল্প অংশীদারত্বের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর এ ঐতিহাসিক রূপান্তরে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, কেবল সামরিক শক্তির ওপর ভর করে এখন আর প্রতিটি প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক খাতে একাধিপত্য ধরে রাখা সম্ভব নয়।
একইভাবে চীনের কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে তার শূন্যস্থান দখল করা নয়। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর জালে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব তৈরি করা, যার ফলে এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের কোনো একক আধিপত্যের লড়াইয়ের গল্প নয়। এটি হতে চলেছে বহুমুখী অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং সূক্ষ্ম কৌশলগত ভারসাম্যের এক নতুন অধ্যায়। আর এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় সামরিক শক্তির পাশাপাশি বন্দর, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থাও হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
সূত্র: আল জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় কী মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন
সিজেডএন ডেস্ক

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ বছর চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা বেশ ভালোভাবেই নজর কাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও জর্ডানের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা এরই মধ্যে বেইজিং সফর করেছেন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানির চীন সফর এবং এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায় কর্মকর্তাদের বেইজিং সফর উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হলেও দিন বদলাচ্ছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের অদৃশ্য প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করতে চাইছে।

মার্কিন মডেল অনুসরণ করতে চায় না চীন
উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে প্রভাবশালী বহিরাগত সামরিক শক্তি। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্রব্যবস্থা, নৌ সক্ষমতা এবং সামরিক উপস্থিতির কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে নিজেদের সামরিক শক্তির পাল্লায় মেপে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। নৌ সক্ষমতা বা সামরিক জোট গঠনের বিচারে চীন এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হওয়ার ধারেকাছেও নেই।
কিন্তু কেবল সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে চীনের কৌশলগত প্রভাবকে মাপা ভুল হবে। কারণ, উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়ার কোনো বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা চীনের নেই। বরং ওয়াশিংটনের তৈরি নিরাপত্তা কাঠামোর সুবাদেই দীর্ঘসময় ধরে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে চীন। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নৌবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি তেল পরিবহনের সমুদ্রপথগুলো নিরাপদ রাখতে কাজ করেছে। এ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পরিবেশই চীনা কোম্পানিগুলোকে সেখানে অবাধে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
চীনের হিসাব পরিষ্কার- এ ব্যবস্থায় খরচ কম, কিন্তু লাভ অনেক। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে গেলে উপসাগরের প্রধান নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক ঝুঁকি নিতে হতো। এটি বেইজিংয়ের জন্য খুব একটা লাভজনক নয়। তাই তারা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। সামরিক শক্তির পেছনে না ছুটে চীন এমন সব অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে।

বন্দর থেকে প্রযুক্তি সব খাতে বাড়ছে চীনা অংশীদারত্ব
উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে এখন নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বড় উদাহরণ হলো চায়না কসকো শিপিং পোর্টস। এই প্রতিষ্ঠানটি আমিরাতের খলিফা বন্দরের সিএসপি আবুধাবি টার্মিনাল পরিচালনাকারী যৌথ উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
তবে বন্দর ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের উপসাগরীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে চলা খাতগুলোতেও চীনা কোম্পানির উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, আধুনিক উৎপাদন খাত, লজিস্টিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো ক্ষেত্রগুলোতেও তাদের বিনিয়োগ চোখে পড়ার মতো।
এভাবেই চীন এমন এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করছে, যা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্ত জুড়ে দেয় না। উপসাগরীয় দেশগুলোকে জোর করে চীনপন্থী হতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। বেইজিংয়ের কৌশল হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে চীনবিরোধী অবস্থান নেওয়াটাই ওই দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়।

দুই নৌকায় পা রেখে চলছে উপসাগরীয় দেশগুলো
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভাবনাতেও স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে একই সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় কোনো বিরোধ নেই। সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার- তিনটি দেশই একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উন্নত পশ্চিমা প্রযুক্তি ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে তেমনি চীনের বিশাল বাজার, বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা এবং এশিয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সুযোগ নিতে পিছপা হচ্ছে না।
এ দেশগুলোর মূল লক্ষ্য হলো কোনো একটিমাত্র শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থাকা। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণ, ঝুঁকি এড়ানো এবং নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেই তারা বর্তমানের বহুমেরুকেন্দ্রিক পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
এসব পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, একটি মাত্র নিরাপত্তা অংশীদার, একটি মাত্র রপ্তানি বাজার বা একটি মাত্র প্রযুক্তিব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেকোনো দেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। ফলস্বরূপ, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বৈচিত্র্যকরণ এখন আর শুধু খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও এক অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ভবিষ্যতের হাতছানি
তেল ও গ্যাসের ওপর শতভাগ নির্ভরতা কাটিয়ে নতুন শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক লজিস্টিকস এখন তাদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাত নিয়ে চলছে বড় বড় কর্মযজ্ঞ। সৌদি আরবের হিউম্যাইন এবং আমিরাতের জি৪২- এর মতো উদ্যোগগুলোই প্রমাণ করে দেশগুলো প্রযুক্তি বিশ্বে কতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। তবে শুধু কিছু সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি কোম্পানি দিয়ে তো আর এআই সাম্রাজ্য গড়া যায় না। এর জন্য দরকার হয় উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার, বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ, শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো, পর্যাপ্ত মূলধন এবং দক্ষ জনবল। আর এ জায়গাতেই উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অংশীদার খুঁজছে, যারা প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও শিল্প সহযোগিতায় তাদের এই নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে সাহায্য করতে পারে।
কেবল সামরিক ক্ষমতাই শেষ কথা নয়
সামগ্রিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের জন্যও নিজেদের কৌশলগত প্রভাব মাপার পুরোনো মাপকাঠিগুলো বদলানোর সময় এসেছে। কোনো অঞ্চলে কার কটা সামরিক ঘাঁটি আছে- ভবিষ্যতে হয়তো সেটাই একমাত্র বা প্রধান প্রভাবের পরিমাপক হবে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে, একটি দেশের তৈরি করা অর্থনৈতিক শিকড় বা প্রভাবকে আঞ্চলিক ব্যবস্থা থেকে উপড়ে ফেলা কতটা কঠিন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এখনও বহুস্তরীয় ও গভীর। প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও এই অঞ্চলের বন্ধন অত্যন্ত পোক্ত।
অন্যদিকে, চীন তৈরি করছে অন্যরকম এক সম্পর্ক। বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি করা হচ্ছে। এটি দিনশেষে শক্তিশালী লিভারেজ বা প্রভাবে রূপ নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন প্রতিযোগিতার সমীকরণ
এমন বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে জোর করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা ওয়াশিংটনের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। এর বদলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সংবেদনশীল তথ্য এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমেরিকার কিছু নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকতেই পারে, যেখানে স্পষ্ট ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকাও স্বাভাবিক।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনেও খোলা মাঠে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন এবং গভীর শিল্প অংশীদারত্বের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর এ ঐতিহাসিক রূপান্তরে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, কেবল সামরিক শক্তির ওপর ভর করে এখন আর প্রতিটি প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক খাতে একাধিপত্য ধরে রাখা সম্ভব নয়।
একইভাবে চীনের কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে তার শূন্যস্থান দখল করা নয়। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর জালে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব তৈরি করা, যার ফলে এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের কোনো একক আধিপত্যের লড়াইয়ের গল্প নয়। এটি হতে চলেছে বহুমুখী অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং সূক্ষ্ম কৌশলগত ভারসাম্যের এক নতুন অধ্যায়। আর এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় সামরিক শক্তির পাশাপাশি বন্দর, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থাও হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
সূত্র: আল জাজিরা









