শিরোনাম

খামেনির শেষ ঠিকানা কেন মাশহাদ শহর

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
খামেনির শেষ ঠিকানা কেন মাশহাদ শহর
মাশহাদে অবস্থিত ইমাম রেজার মাজার (বাঁয়ে) ও খামেনির জানাজা উপলক্ষে শোকর‍্যালি (ডানে)। কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের জন্য তার জন্মভূমি ও পবিত্র নগরী মাশহাদকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তেহরানে রাষ্ট্রীয় জানাজা শেষে দীর্ঘ শোকানুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে তাকে এ ঐতিহাসিক শহরে সমাহিত করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর মাশহাদ। খামেনির শেষ ঠিকানা হিসেবে এই শহরকে বেছে নেওয়ার পেছনে যেমন জড়িয়ে আছে তার ব্যক্তিগত আবেগ, তেমনি রয়েছে এর গভীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গুরুত্ব।

শিয়া মুসলমানদের কাছে ‘মাশহাদে মোকাদ্দাস’ বা পবিত্র মাশহাদ কেবল একটি শহর নয়, বরং একটি অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোরাসান-এ-রাযাভি প্রদেশের রাজধানীতেই অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায়ের অষ্টম ইমাম হযরত আলী আল-রেজা (আ.)-এর পবিত্র রওজা মোবারক। ঐতিহাসিক তথ্য ও শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের আমলে বিষপ্রয়োগে ইমাম রেজার শাহাদাতবরণের স্থান হওয়ার কারণেই আরবি শব্দ ‘মাশহাদ’ থেকে এই শহরের নামকরণ করা হয়, যার অর্থ ‘শহীদের স্থান’। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে কোটি কোটি মানুষ ইমাম রেজার এই মাজার জিয়ারত করতে আসেন। এই মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় কমপ্লেক্স এবং ইরানের ধর্মীয় পর্যটনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।

মাজার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ‘আস্তান কুদস রাযাভি’ নামক ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি ইরানের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, কৃষি, শিল্প এবং আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে এই প্রতিষ্ঠানের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, যা ইরানের সার্বিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৩৯ সালে এ মাশহাদ শহরেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার শৈশব, প্রাথমিক ও ধর্মীয় শিক্ষার একটি বড় অংশ এখানে কাটার কারণে জন্মভূমির এই মাজার-সংলগ্ন এলাকায় তাকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় ও আবেগীয় উভয় দিক থেকেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও মাশহাদ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত হওয়ায় এটি ইরানের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে কাজ করে। বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর সার্বক্ষণিক গমনাগমনের ফলে এখানকার হোটেল, পরিবহন ও পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ধর্মীয় পর্যটননির্ভর অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শহরটিতে সর্বদা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহাল থাকে। এছাড়াও সমৃদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র এবং আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে মাশহাদ জ্ঞানচর্চারও এক অনন্য কেন্দ্র। সামগ্রিকভাবে, খামেনির শেষ ঠিকানা হিসেবে মাশহাদকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেবল পারিবারিক নয়, বরং এটি ইরানের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তির এক সুদূরপ্রসারী প্রতীক।

/এমএকে/