এক্সপ্লেইনার

ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞায় আবারও কি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে গাজাবাসী

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞায় আবারও কি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে গাজাবাসী
ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞায় গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে

বাণিজ্যিক পণ্য আমদানির ওপর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞায় গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। ফলে নতুন করে বিপাকে পড়েছে হাজারো ফিলিস্তিনি পরিবার। সামনে আরও সংকট তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কায় যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তা জমিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) ইসরায়েল গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য ঢোকা বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই আটা, ডিম, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এক ধাক্কায় অনেকগুন বেড়ে গেছে। ফিলিস্তিনি ব্যবসায়ী আর হামাসের মধ্যে শুল্ক নিয়ে কাড়াকাড়ির জেরে ইসরায়েল এ সিদ্ধান্ত নেয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেখানকার লাখ লাখ মানুষ পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। যাদের একবারে অনেক কিছু কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের বাধ্য হয়ে অল্প অল্প করেই জিনিসপত্র কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে সীমান্ত বন্ধ থাকলে আর প্রতিদিন দাম বাড়তে থাকলে তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন।

খাদ্য সংকটে ফিলিস্তিনিদের হাহাকার
খাদ্য সংকটে ফিলিস্তিনিদের হাহাকার

হাতে টাকা নেই, তবুও পণ্য কিনতে হচ্ছে চড়া দামে

সীমান্ত বন্ধের প্রভাবে গাজার বাজারগুলোতে হঠাৎ করেই ভিড় বেড়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়ার বাসিন্দা ইসমাইল আল-বারাউই বলছিলেন, সীমান্ত বন্ধ হওয়ার মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যেই বাজারে সবকিছুর দাম অদ্ভুতভাবে বেড়ে গেছে। তার মতে, গাজায় সীমান্ত পারাপার নিয়ে অনিশ্চয়তা একটা নিত্যদিনের বিষয়। সীমান্ত পারাপার বন্ধের পরপরই শুরু হয় ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর মহোৎসব।

তিনি জানান, কয়েক দিন আগেও এক কার্টন ডিমের দাম ছিল ৩৫ শেকেল (১১.৩৪ ডলার)। সেই ডিম এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ শেকেলে (১৮ থেকে ২১ ডলার)। পাঁচ বা ছয় শেকেল (১.৫০-১.৮০ ডলার) কেজির পেঁয়াজ কিনতে এখন লাগছে আট থেকে ১০ শেকেল (২.৪০-৩ ডলার)। আর সাত-আট শেকেল (২.১০-২.৪০ ডলার) কেজির অ্যাভোকাডো একলাফে হয়েছে ১৫ শেকেল (৪.৫০ ডলার)।

আল-বারাউই হতাশা নিয়ে বলেন, এই দাম বৃদ্ধি মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যেই ঘটেছে। সীমান্ত আরও ১০ থেকে ১৫ দিন বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নেবে। সবাই জনগণকে শোষণ করে ব্যবসা করছে। কোনো দয়া নেই। তার অভিযোগ, সীমান্ত বন্ধ হওয়ার খবর শোনামাত্রই ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

রাফাহ ক্রসিংয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে
রাফাহ ক্রসিংয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে

স্থগিতাদেশ নিয়ে দ্বন্দ্ব

গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তর ইসরায়েলের দেওয়া ব্যাখ্যা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, গাজা কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিক ট্রাকের ওপর নতুন করে কোনো কর বা সরকারি ফি চাপায়নি।

দপ্তরের দাবি, ইসরায়েল ১০,০০০ শেকেল (৩,২৪২ ডলার) আদায়ের কথা বলছে, তা আসলে একটি স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক তহবিলের অংশ ছিল। অসহায় পরিবার ও দুস্থদের সহায়তা করতেই ওই তহবিল ব্যবহার করা হতো।

তারা আরও জানায়, বাজারে নগদ টাকার প্রচণ্ড সংকট এবং পুরোনো-জীর্ণ নোটের কারণে ব্যবসায়ীদের চেম্বার অফ কমার্সের সঙ্গে আলোচনা করেই নগদ লেনদেনের ওপর ৩০ শতাংশ হারের একটি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

গাজা কর্তৃপক্ষের মতে, ইসরায়েল এ বিষয়টিকে অযুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা গাজায় পণ্যের সরবরাহ আরও কমিয়ে দিতে চায়।

ট্রাক কম ঢোকার পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে গাজা কর্তৃপক্ষ। মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে তারা। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত ৬০০টি ট্রাক গাজায় ঢোকার কথা কিন্তু বর্তমানে সেটা মানা হচ্ছে না। তারা জানিয়েছে, এই বিধিনিষেধ না তুললে সামনে আরও কঠিন মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় আসছে।

জাতিসংঘের হিসাব বলছে, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ গাজায় খাদ্যপণ্যের দাম ২০২৩ সালে সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় গড়ে ২০৪ শতাংশ বেশি ছিল। নতুন করে সীমান্ত বন্ধের আগেই ২ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে ওসিএইচএ গাজাবাসীর এ কষ্টের চিত্র তুলে ধরেছিল।

ত্রাণের আশায় ফিলিস্তিনি শিশুরা
ত্রাণের আশায় ফিলিস্তিনি শিশুরা

খালি পকেটে অনাহারের ভয়

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী বাস্তুচ্যুত নারী ইমান আতাল্লাহ বলছিলেন, এভাবে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, সীমান্ত বন্ধের আগে যে আটার বস্তা ২৫ থেকে ৩৫ শেকেলে (৭.৫০-১০.৫০ ডলার) পাওয়া যেত, তা এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮০ শেকেলে (২৪ ডলার)। আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পথ না থাকায় পরিবার নিয়ে টিকে থাকাটাই এখন দায়।

ত্রাণ হিসেবে তারা যেটুকু আটা পান, তাতে এক মাসও ঠিকমতো চলে না। ফল বা ডিম কেনা তো স্বপ্নের মতো।

তিনি বলেন, আমরা আগে বেশি খেতাম, আর বাচ্চাদের জন্য ডিমও কিনতে পারতাম। এখন আমাদের সেসব ছেড়ে দিতে হয়েছে। তার পরিবারের খাবার বলতে এখন কেবল চাল আর ডাল। তাও পেট ভরে নয়। সকাল বা রাতের খাবার বাদ দিয়ে শুধু দুপুরের খাবার খেয়েই বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন তারা।

শুধু আতাল্লাহর পরিবার নয়, গাজার হাজার হাজার পরিবারের অবস্থা একই রকম। সঞ্চয় বলতে তাদের কিছুই নেই, আর সীমান্ত বন্ধ থাকলে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার, তা তারা বুঝতে পারছেন।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/