ইসরায়েলি নির্বাচনে আরব দলগুলো যে কারণে ‘কিংমেকার’ নাও হতে পারে

ইসরায়েলি নির্বাচনে আরব দলগুলো যে কারণে ‘কিংমেকার’ নাও হতে পারে
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক

ইসরায়েলি নির্বাচনের ফলাফলে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর রেকর্ড উত্থানের আভাস মিলেছে। দেশটির ১২০ আসনের নেসেটে জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম জোটগতভাবে আগের সব পরিসংখ্যান টপকে ১৭টির মতো আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে সংসদ গঠন বা সরকার পতনের মতো জায়গায় এ সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্ববহ হলেও, বাস্তব রাজনীতির সমীকরণ আরব দলগুলোর ক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখছে। ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেকের মতে, এ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো আরব ভোটের উত্থান ও পুনরুজ্জীবন। ইসরায়েলি রাজনীতির হিসাব-নিকাশে আপনি নির্বাচকমণ্ডলীর এত বড় একটি অংশকে উপেক্ষা করতে পারেন না। তবে মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংখ্যা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জোট আংশিক ফলাফলে ৫৪টি আসন পেয়েছে এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৯টি আসন। দুই প্রধান জোটের কেউই এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন না পায় তত্ত্বগতভাবে আরব দলগুলোর হাতেই চাবিকাঠি থাকার কথা। পর্যবেক্ষকদের মতে, যদিও নেসেটে দুটি প্রধান জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে আরব দলগুলো তাত্ত্বিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে তারা ‘কিংমেকার’ বা নিয়ন্ত্রক নয়।

মূল বাধা কোথায়
নেসেটে আইজেনকোটের বিরোধী দলগুলো যদি আরব দলগুলোর হাত ধরে, তবে ৬৬টি আসন নিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব। কিন্তু এ জোট গঠনের পথ আটকে আছে আদর্শিক জায়গায়। অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাভিত্তিক প্যালেস্টাইন ফোরাম ফর ইসরায়েলি স্টাডিজ-এর মহাপরিচালক হোনাইদা ঘানাম বলেন, এ ভেটো একটি বর্ণবাদী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা আরব নাগরিকদের অবৈধ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অংশীদার হিসেবে গণ্য করে। তিনি মনে করেন, প্রায় অধিকাংশ প্রধান ইসরায়েলি দলই আরবদের নিয়ে সরকার গড়ার চরম বিরোধী। নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট- দুই নেতাই জানিয়েছেন, অভিন্ন মূল্যবোধ না থাকায় তারা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট বাঁধতে চান না। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, বিরোধী জোটের এ অনিচ্ছা পুরোপুরি ‘মতাদর্শগত’। আইজেনকোট আরব দলগুলোর ওপর আনুগত্যের কঠিন পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছেন, যা নির্বাচনি হিসাবের বাইরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।

কতটা নীতিগত ছাড় দিতে প্রস্তুত আরব দলগুলো
আরব রাজনীতিতে কিন্তু বিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়ার কিংবা সমঝোতার আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ নয়। প্যালথিঙ্ক ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক ওমর শাবান জানান, রা’আম প্রধান মনসুর আব্বাস ইতোমধ্যে আইজেনকোটের সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে রাখার শর্ত রয়েছে। এমনকি ইহুদি আইনপ্রণেতা ইয়োভ সেগালোভিটজকে নিজেদের নির্বাচনি তালিকার শীর্ষ সারিতে রেখে সমঝোতার বার্তা দিয়েছে রা’আম। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবরিন জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটকে হঠাতে তারা যেকোনো ভূমিকা রাখতে রাজি। ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’ পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাবরিন বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। আরেক আরব নেতা আহমদ তিবি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরাসরি জোটে যোগ না দিলেও বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তারা সাহায্য করতে পারেন। তবে আইজেনকোটকে শুধু আরব দলগুলোর সঙ্গেই নয়, নিজ শিবিরের অন্যান্য ডানপন্থী শরিকদেরকেও মানাতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, শরিকদের নিয়ে আরব দলগোলোর সঙ্গে হাত মেলাতে হলে আইজেনকোটকে বহু বছরের জায়নবাদী নীতি ছাড়তে হবে। কিন্তু এ নীতি আরবদের ভোটাধিকার দিলেও শাসন ক্ষমতায় কোনো অংশীদারিত্ব দিতে চায় না।
অংশীদারিত্বের জন্য আইজেনকোটের শর্ত
আইজেনকোটের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কেবল এমন দলগুলোকেই জোটে নেবেন যারা ইসরায়েলকে একটি ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মেনে চলবে এবং সব নাগরিকের জন্য জাতীয় সেবা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হবে। তবে এসব শর্ত পূরণ করে আরব দলগুলোকে সরকারে নেওয়া কতটা সম্ভব, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
ইহুদি-আরব দলগুলো কি আগে কখনো জোট বেঁধেছে
ইতিহাস বলছে, ইসরায়েলে আরব-ইহুদি জোট একেবারে নজিরবিহীন নয়। ২০২১ সালের নির্বাচনে রা’আম দলটি কিংমেকার হয়ে উঠেছিল এবং তাদের সমর্থনেই গঠিত হয়েছিল স্বল্পস্থায়ী বেনেট-ইয়ার ল্যাপিড সরকার। তারও আগে, নব্বইয়ের দশকে প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রাবিনের আমলেও আরব দলগুলো বাইর থেকে সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। অর্থাৎ আইনি বা সাংবিধানিক কোনো বাধা না থাকলেও মূল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক আদর্শ ও মনস্তত্ত্ব।

অন্যান্য দলের নেতারা কী বলছেন
নির্বাচনের ফলাফল ও সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটকে লজ্জা ও অপমানের বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে বিপদে ফেলা এবং জায়নবাদ-বিরোধী আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার প্রতিষ্ঠা করা নিষিদ্ধ। একই সুর শোনা গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের গলায়। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি শুধু জায়নবাদী দলগুলোকেই সরকারে দেখতে চান। তবে ব্যতিক্রম কেবল মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান। তিনি এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ইহুদি ভোট ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজন আমরা মেনে নিতে পারি না।
অংশীদারিত্বে অনীহা ইসরায়েলি গণতন্ত্র সম্পর্কে কী বলে
বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অনীহা ইসরায়েলি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিকভাবে বর্ণবাদী কাঠামোকে উন্মোচন করে। তিনি বলেন, দেশের এক-পঞ্চমাংশ নাগরিকের ভোট নেওয়া হবে, কিন্তু তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘অবৈধ’ গণ্য করা হবে এ চর্চা কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক কাঠামোর লক্ষণ হতে পারে না। এটি মূলত ইহুদি রাজনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি পুরোনো বন্দোবস্ত।
পরিশেষে বলা যায়, নেসেটে রেকর্ড আসন পেয়েও কাঠামোগত বর্ণবাদ ও জায়নবাদী ঐকমত্যের কারণে আরব দলগুলোর ‘কিংমেকার’ হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হতে বসেছে। আইজেনকোট কি নেতানিয়াহুকে সরাতে এ নীতিগত বাধা ভাঙবেন, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক বৃত্তেই আটকে থাকবেন তাতেই নির্ভর করছে ইসরায়েলের পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ।

ইসরায়েলি নির্বাচনের ফলাফলে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর রেকর্ড উত্থানের আভাস মিলেছে। দেশটির ১২০ আসনের নেসেটে জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম জোটগতভাবে আগের সব পরিসংখ্যান টপকে ১৭টির মতো আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে সংসদ গঠন বা সরকার পতনের মতো জায়গায় এ সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্ববহ হলেও, বাস্তব রাজনীতির সমীকরণ আরব দলগুলোর ক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখছে। ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেকের মতে, এ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো আরব ভোটের উত্থান ও পুনরুজ্জীবন। ইসরায়েলি রাজনীতির হিসাব-নিকাশে আপনি নির্বাচকমণ্ডলীর এত বড় একটি অংশকে উপেক্ষা করতে পারেন না। তবে মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংখ্যা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জোট আংশিক ফলাফলে ৫৪টি আসন পেয়েছে এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৯টি আসন। দুই প্রধান জোটের কেউই এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন না পায় তত্ত্বগতভাবে আরব দলগুলোর হাতেই চাবিকাঠি থাকার কথা। পর্যবেক্ষকদের মতে, যদিও নেসেটে দুটি প্রধান জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে আরব দলগুলো তাত্ত্বিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে তারা ‘কিংমেকার’ বা নিয়ন্ত্রক নয়।

মূল বাধা কোথায়
নেসেটে আইজেনকোটের বিরোধী দলগুলো যদি আরব দলগুলোর হাত ধরে, তবে ৬৬টি আসন নিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব। কিন্তু এ জোট গঠনের পথ আটকে আছে আদর্শিক জায়গায়। অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাভিত্তিক প্যালেস্টাইন ফোরাম ফর ইসরায়েলি স্টাডিজ-এর মহাপরিচালক হোনাইদা ঘানাম বলেন, এ ভেটো একটি বর্ণবাদী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা আরব নাগরিকদের অবৈধ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অংশীদার হিসেবে গণ্য করে। তিনি মনে করেন, প্রায় অধিকাংশ প্রধান ইসরায়েলি দলই আরবদের নিয়ে সরকার গড়ার চরম বিরোধী। নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট- দুই নেতাই জানিয়েছেন, অভিন্ন মূল্যবোধ না থাকায় তারা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট বাঁধতে চান না। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, বিরোধী জোটের এ অনিচ্ছা পুরোপুরি ‘মতাদর্শগত’। আইজেনকোট আরব দলগুলোর ওপর আনুগত্যের কঠিন পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছেন, যা নির্বাচনি হিসাবের বাইরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।

কতটা নীতিগত ছাড় দিতে প্রস্তুত আরব দলগুলো
আরব রাজনীতিতে কিন্তু বিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়ার কিংবা সমঝোতার আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ নয়। প্যালথিঙ্ক ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক ওমর শাবান জানান, রা’আম প্রধান মনসুর আব্বাস ইতোমধ্যে আইজেনকোটের সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে রাখার শর্ত রয়েছে। এমনকি ইহুদি আইনপ্রণেতা ইয়োভ সেগালোভিটজকে নিজেদের নির্বাচনি তালিকার শীর্ষ সারিতে রেখে সমঝোতার বার্তা দিয়েছে রা’আম। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবরিন জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটকে হঠাতে তারা যেকোনো ভূমিকা রাখতে রাজি। ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’ পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাবরিন বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। আরেক আরব নেতা আহমদ তিবি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরাসরি জোটে যোগ না দিলেও বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তারা সাহায্য করতে পারেন। তবে আইজেনকোটকে শুধু আরব দলগুলোর সঙ্গেই নয়, নিজ শিবিরের অন্যান্য ডানপন্থী শরিকদেরকেও মানাতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, শরিকদের নিয়ে আরব দলগোলোর সঙ্গে হাত মেলাতে হলে আইজেনকোটকে বহু বছরের জায়নবাদী নীতি ছাড়তে হবে। কিন্তু এ নীতি আরবদের ভোটাধিকার দিলেও শাসন ক্ষমতায় কোনো অংশীদারিত্ব দিতে চায় না।
অংশীদারিত্বের জন্য আইজেনকোটের শর্ত
আইজেনকোটের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কেবল এমন দলগুলোকেই জোটে নেবেন যারা ইসরায়েলকে একটি ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মেনে চলবে এবং সব নাগরিকের জন্য জাতীয় সেবা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হবে। তবে এসব শর্ত পূরণ করে আরব দলগুলোকে সরকারে নেওয়া কতটা সম্ভব, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
ইহুদি-আরব দলগুলো কি আগে কখনো জোট বেঁধেছে
ইতিহাস বলছে, ইসরায়েলে আরব-ইহুদি জোট একেবারে নজিরবিহীন নয়। ২০২১ সালের নির্বাচনে রা’আম দলটি কিংমেকার হয়ে উঠেছিল এবং তাদের সমর্থনেই গঠিত হয়েছিল স্বল্পস্থায়ী বেনেট-ইয়ার ল্যাপিড সরকার। তারও আগে, নব্বইয়ের দশকে প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রাবিনের আমলেও আরব দলগুলো বাইর থেকে সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। অর্থাৎ আইনি বা সাংবিধানিক কোনো বাধা না থাকলেও মূল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক আদর্শ ও মনস্তত্ত্ব।

অন্যান্য দলের নেতারা কী বলছেন
নির্বাচনের ফলাফল ও সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটকে লজ্জা ও অপমানের বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে বিপদে ফেলা এবং জায়নবাদ-বিরোধী আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার প্রতিষ্ঠা করা নিষিদ্ধ। একই সুর শোনা গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের গলায়। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি শুধু জায়নবাদী দলগুলোকেই সরকারে দেখতে চান। তবে ব্যতিক্রম কেবল মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান। তিনি এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ইহুদি ভোট ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজন আমরা মেনে নিতে পারি না।
অংশীদারিত্বে অনীহা ইসরায়েলি গণতন্ত্র সম্পর্কে কী বলে
বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অনীহা ইসরায়েলি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিকভাবে বর্ণবাদী কাঠামোকে উন্মোচন করে। তিনি বলেন, দেশের এক-পঞ্চমাংশ নাগরিকের ভোট নেওয়া হবে, কিন্তু তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘অবৈধ’ গণ্য করা হবে এ চর্চা কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক কাঠামোর লক্ষণ হতে পারে না। এটি মূলত ইহুদি রাজনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি পুরোনো বন্দোবস্ত।
পরিশেষে বলা যায়, নেসেটে রেকর্ড আসন পেয়েও কাঠামোগত বর্ণবাদ ও জায়নবাদী ঐকমত্যের কারণে আরব দলগুলোর ‘কিংমেকার’ হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হতে বসেছে। আইজেনকোট কি নেতানিয়াহুকে সরাতে এ নীতিগত বাধা ভাঙবেন, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক বৃত্তেই আটকে থাকবেন তাতেই নির্ভর করছে ইসরায়েলের পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ।

ইসরায়েলি নির্বাচনে আরব দলগুলো যে কারণে ‘কিংমেকার’ নাও হতে পারে
সিটিজেন জার্নাল ডেস্ক

ইসরায়েলি নির্বাচনের ফলাফলে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর রেকর্ড উত্থানের আভাস মিলেছে। দেশটির ১২০ আসনের নেসেটে জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম জোটগতভাবে আগের সব পরিসংখ্যান টপকে ১৭টির মতো আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে সংসদ গঠন বা সরকার পতনের মতো জায়গায় এ সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্ববহ হলেও, বাস্তব রাজনীতির সমীকরণ আরব দলগুলোর ক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখছে। ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেকের মতে, এ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো আরব ভোটের উত্থান ও পুনরুজ্জীবন। ইসরায়েলি রাজনীতির হিসাব-নিকাশে আপনি নির্বাচকমণ্ডলীর এত বড় একটি অংশকে উপেক্ষা করতে পারেন না। তবে মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংখ্যা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর জোট আংশিক ফলাফলে ৫৪টি আসন পেয়েছে এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৯টি আসন। দুই প্রধান জোটের কেউই এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন না পায় তত্ত্বগতভাবে আরব দলগুলোর হাতেই চাবিকাঠি থাকার কথা। পর্যবেক্ষকদের মতে, যদিও নেসেটে দুটি প্রধান জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে আরব দলগুলো তাত্ত্বিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে তারা ‘কিংমেকার’ বা নিয়ন্ত্রক নয়।

মূল বাধা কোথায়
নেসেটে আইজেনকোটের বিরোধী দলগুলো যদি আরব দলগুলোর হাত ধরে, তবে ৬৬টি আসন নিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব। কিন্তু এ জোট গঠনের পথ আটকে আছে আদর্শিক জায়গায়। অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাভিত্তিক প্যালেস্টাইন ফোরাম ফর ইসরায়েলি স্টাডিজ-এর মহাপরিচালক হোনাইদা ঘানাম বলেন, এ ভেটো একটি বর্ণবাদী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা আরব নাগরিকদের অবৈধ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অংশীদার হিসেবে গণ্য করে। তিনি মনে করেন, প্রায় অধিকাংশ প্রধান ইসরায়েলি দলই আরবদের নিয়ে সরকার গড়ার চরম বিরোধী। নেতানিয়াহু এবং আইজেনকোট- দুই নেতাই জানিয়েছেন, অভিন্ন মূল্যবোধ না থাকায় তারা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট বাঁধতে চান না। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, বিরোধী জোটের এ অনিচ্ছা পুরোপুরি ‘মতাদর্শগত’। আইজেনকোট আরব দলগুলোর ওপর আনুগত্যের কঠিন পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছেন, যা নির্বাচনি হিসাবের বাইরে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।

কতটা নীতিগত ছাড় দিতে প্রস্তুত আরব দলগুলো
আরব রাজনীতিতে কিন্তু বিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়ার কিংবা সমঝোতার আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ নয়। প্যালথিঙ্ক ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক ওমর শাবান জানান, রা’আম প্রধান মনসুর আব্বাস ইতোমধ্যে আইজেনকোটের সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে রাখার শর্ত রয়েছে। এমনকি ইহুদি আইনপ্রণেতা ইয়োভ সেগালোভিটজকে নিজেদের নির্বাচনি তালিকার শীর্ষ সারিতে রেখে সমঝোতার বার্তা দিয়েছে রা’আম। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবরিন জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটকে হঠাতে তারা যেকোনো ভূমিকা রাখতে রাজি। ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’ পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাবরিন বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। আরেক আরব নেতা আহমদ তিবি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সরাসরি জোটে যোগ না দিলেও বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তারা সাহায্য করতে পারেন। তবে আইজেনকোটকে শুধু আরব দলগুলোর সঙ্গেই নয়, নিজ শিবিরের অন্যান্য ডানপন্থী শরিকদেরকেও মানাতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, শরিকদের নিয়ে আরব দলগোলোর সঙ্গে হাত মেলাতে হলে আইজেনকোটকে বহু বছরের জায়নবাদী নীতি ছাড়তে হবে। কিন্তু এ নীতি আরবদের ভোটাধিকার দিলেও শাসন ক্ষমতায় কোনো অংশীদারিত্ব দিতে চায় না।
অংশীদারিত্বের জন্য আইজেনকোটের শর্ত
আইজেনকোটের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কেবল এমন দলগুলোকেই জোটে নেবেন যারা ইসরায়েলকে একটি ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র মেনে চলবে এবং সব নাগরিকের জন্য জাতীয় সেবা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হবে। তবে এসব শর্ত পূরণ করে আরব দলগুলোকে সরকারে নেওয়া কতটা সম্ভব, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
ইহুদি-আরব দলগুলো কি আগে কখনো জোট বেঁধেছে
ইতিহাস বলছে, ইসরায়েলে আরব-ইহুদি জোট একেবারে নজিরবিহীন নয়। ২০২১ সালের নির্বাচনে রা’আম দলটি কিংমেকার হয়ে উঠেছিল এবং তাদের সমর্থনেই গঠিত হয়েছিল স্বল্পস্থায়ী বেনেট-ইয়ার ল্যাপিড সরকার। তারও আগে, নব্বইয়ের দশকে প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রাবিনের আমলেও আরব দলগুলো বাইর থেকে সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। অর্থাৎ আইনি বা সাংবিধানিক কোনো বাধা না থাকলেও মূল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক আদর্শ ও মনস্তত্ত্ব।

অন্যান্য দলের নেতারা কী বলছেন
নির্বাচনের ফলাফল ও সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটকে লজ্জা ও অপমানের বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইসরায়েলকে বিপদে ফেলা এবং জায়নবাদ-বিরোধী আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার প্রতিষ্ঠা করা নিষিদ্ধ। একই সুর শোনা গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের গলায়। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি শুধু জায়নবাদী দলগুলোকেই সরকারে দেখতে চান। তবে ব্যতিক্রম কেবল মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান। তিনি এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ইহুদি ভোট ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজন আমরা মেনে নিতে পারি না।
অংশীদারিত্বে অনীহা ইসরায়েলি গণতন্ত্র সম্পর্কে কী বলে
বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অনীহা ইসরায়েলি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিকভাবে বর্ণবাদী কাঠামোকে উন্মোচন করে। তিনি বলেন, দেশের এক-পঞ্চমাংশ নাগরিকের ভোট নেওয়া হবে, কিন্তু তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘অবৈধ’ গণ্য করা হবে এ চর্চা কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক কাঠামোর লক্ষণ হতে পারে না। এটি মূলত ইহুদি রাজনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি পুরোনো বন্দোবস্ত।
পরিশেষে বলা যায়, নেসেটে রেকর্ড আসন পেয়েও কাঠামোগত বর্ণবাদ ও জায়নবাদী ঐকমত্যের কারণে আরব দলগুলোর ‘কিংমেকার’ হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হতে বসেছে। আইজেনকোট কি নেতানিয়াহুকে সরাতে এ নীতিগত বাধা ভাঙবেন, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক বৃত্তেই আটকে থাকবেন তাতেই নির্ভর করছে ইসরায়েলের পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ।








