শিরোনাম

জ্বালানি স্থাপনায় আবার হামলা হলে কোনো ছাড় না দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের

সিটিজেন ডেস্ক
জ্বালানি স্থাপনায় আবার হামলা হলে কোনো ছাড় না দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কানগানের কাছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স। ছবি: এএফপি

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসলরায়েলি হামলার প্রতিশোধ নিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারন করেছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান তাদের জ্বালানি স্থাপনায় নতুন করে হামলা হলে ‘কোনো ধরনের সংযম’ দেখানো হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘আমাদের অবকাঠামোর ওপর ইসরায়েলের হামলার জবাবে আমরা আমাদের শক্তির সামান্য অংশ ব্যবহার করেছি। উত্তেজনা প্রশমনের অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়েই আমরা সংযম দেখিয়েছি।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের জ্বালানি স্থাপনাতে আবার হামলা হলে কোনো সংযম দেখানো হবে না।’

ইরানের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স দেশটির মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের অভ্যন্তরীন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে।

ইরান এই সতর্কবার্তা এমন সময়ে দিল যখন দেশটির হামলায় কাতার তাদের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণ করছিল। এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির জ্বালানিক্ষেত্র থেকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করা হয়।

কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ আল কাবি দাবি করেছেন, ইরানের হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বছরে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এই ঘটনায় ইউরোপ ও এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে।

সাদ আল কাবি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, এই সপ্তাহে ইরানের হামলায় কাতারের ১৪টি এলএনজি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে দুটি এবং গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের স্থাপনার একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বছরে প্রায় ১২.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি উৎপাদন তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে।

আল কাবি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে রমজান মাসে একটি ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে কাতার ও এই অঞ্চলে এমন হামলা হতে পারে।”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের জেরে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতিনিয়াহু এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই যুদ্ধের লক্ষ্য হলো ভূগর্ভে সুরক্ষিত করে ফেলার আগেই ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির হুমকি দূর করা।

তিনি দাবি করেন, ‘আমরা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপাদান উৎপাদনকারী কারখানাগুলো ধ্বংস করছি এবং তাদের অস্ত্র তৈরির অবকাঠামোকে এমনভাবে নষ্ট করছি যা আমরা আগে কখনো করিনি ।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ‘সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলার মধ্যে’ রয়েছে।”

নেতিনিয়াহু আরও জানান, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলায় ইসরায়েল একাই অংশ নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে আপাতত তারা ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় নতুন হামলা থেকে বিরত থাকবে।

এর আগে ট্রাম্প বলেছেন, জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তিনি ইসরায়েলকে ইরানের গ্যাস অবকাঠামোতে পুনরায় হামলা না চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তারা এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ যে সমুদ্রপথ দিয়ে হয় , সেই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা না চালানোর আহ্বান

তেল ও গ্যাসের স্থাপনায় হামলা না চালানোর আহ্বান জানিয়েছে কাতার। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আল কাবি বলেন, জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতালি, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে এলএনজি সরবরাহের পাঁচ বছরের চুক্তি থেকে তারা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে হলে আগে সংঘাত বন্ধ হওয়া জরুরি।’

প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এসব স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি পুরো অঞ্চলকে ১০ থেকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আল কাবি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তা হয়ে গেছে। ইসরায়েল যদি ইরানে হামলা করে, সেটি ইরান ও ইসরায়েলের বিষয়। এর সঙ্গে আমাদের বা এই অঞ্চলের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই বিশ্বের সব দেশগুলোকে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি যে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য যেকোনো দেশই হোক তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা থেকে দূরে থাকা উচিত।”

সূত্র: আল জাজিরা

/বিবি/