ইরান যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও লাভবান কারা

ইরান যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও লাভবান কারা
সিজেডএন ডেস্ক

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি টেকসই সমঝোতার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে আসায় হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের বাধা সাময়িক কোনো সংকট নয়। এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির এক স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে রূপ নিতে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক উপায়ে কোনো চুক্তি হলেও হতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভারসাম্য ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। ফলে জ্বালানিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বিশ্ব আর কখনোই এ সংকীর্ণ জলপথের ওপর আগের মতো পুরোপুরি নির্ভর করবে না।
এ সংঘাতের মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি একটি ব্যাপক সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি তার চিরচেনা নিয়মে সাড়া দিতে শুরু করেছে। প্রথাগত পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতারা এখন বিকল্প বিক্রেতাদের সন্ধান করছেন। এর ফলে পুরোনো কিছু বাজার বন্ধ হলেও পৃথিবীর নানা প্রান্তে শুরু হচ্ছে নতুন বাণিজ্যিক লেনদেন। মূলত প্রতিটি বড় আর্থিক ক্ষতির বিপরীতেই উন্মোচিত হচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

ক্ষতিগ্রস্ত কারা
চলমান সংকটে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের রপ্তানিকারক দেশগুলো। তবে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা না থাকলেও হরমুজ প্রণালি এখনো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েনি। অন্তত এক ডজন পণ্যবাহী জাহাজ এখনো প্রতিদিন এ জলপথ দিয়ে পারাপার হচ্ছে। এর বাইরে ট্র্যাকিং সুবিধা বন্ধ রেখেও অনেক জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম সৌদি আরবের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে ধাক্কা সামলাতে কিছুটা সহায়তা করলেও সামগ্রিক চিত্র বেশ উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরেই কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক ও ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকোচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
ক্ষতির তীব্রতায় রয়েছে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো। বিশেষ করে মিশর, পাকিস্তান, জর্ডান ও লেবানন। জ্বালানি আমদানির চড়া খেসারত দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব দেশে খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে প্রবাসী আয়ে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সংকটের কারণে এসব দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি 'রেমিট্যান্স' প্রবাহ বড় আকারে ধাক্কা খেয়েছে।
অন্যদিকে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো আপাতত তাদের নিজস্ব মজুদের ওপর ভর করে সাময়িক স্বস্তিতে রয়েছে। তবে বিকল্প উৎস খুঁজে না পেলে এ মজুদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। চীন বর্তমানে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
শক্তি ও খাদ্য খাতের বাইরেও বৈশ্বিক প্রধান শিল্পগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ধস নেমেছে। জেট ফুয়েলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় একলাফে অনেক বেড়ে গেছে। সস্তা গ্যাসের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারীরা। একই সঙ্গে হিলিয়ামের দাম বাড়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ নির্মাতারা।

লাভবান হচ্ছে যারা
জ্বালানি খাতের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিপরীতে বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এখন বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। এ সুবিধাপ্রাপ্তদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া ও কলম্বিয়া। যদিও এসব দেশের সাধারণ মানুষকে জ্বালানি তেল ও গৃহস্থালি ব্যবহারের গ্যাসের চড়া দাম চুকোতে হচ্ছে। তবে তেল কোম্পানিগুলোর বড় লাভের সুবাদে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর রাজস্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের বৃহত্তম গ্যাস সরবরাহকারী দেশ হিসেবে দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছে নরওয়ে। রাশিয়ার মুনাফার পাল্লা আরও ভারী হতে পারত, তবে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের তেলজাত পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিপরীতে, বৈশ্বিক এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে ব্যবসা গুছিয়ে নিচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু খাত। কোনো জাহাজ সংঘাতে আটকে বা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ ভাড়ার কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। রেকর্ড চড়া প্রিমিয়াম আদায় এবং মার্কিন সরকারের পুনঃবিমা সুবিধার কারণে সামুদ্রিক বিমা খাত এখন অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প পরিবহন পথ তৈরির চাহিদা বাড়ায় পাইপ ও পাইপলাইন প্রস্তুতকারকদের বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে। আর প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানির চড়া দামের কারণে নতুন করে গতি পাচ্ছে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তি খাত।

জটিল সমীকরণে প্রতিরক্ষা শিল্প
প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের অবস্থান ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও একটি জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ। সহজভাবে বলতে গেলে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি সংঘাতের অর্থই হলো অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বাড়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী বছরের জন্য তার প্রত্যাশিত ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পুরো বাজেট হয়তো শেষ পর্যন্ত না-ও পেতে পারেন, তবে পেন্টাগনের সামরিক ব্যয় যে বাড়ছে তা অনেকটাই নিশ্চিত। একই সঙ্গে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মিত্র দেশেই প্রতিরক্ষা বাজেট জোরদার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে ক্রমাগত আগ্রাসী পদক্ষেপের হুমকি দিলেও কোনো পক্ষই শেষ পর্যন্ত সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। তবে তারা এমন কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতেও রাজি নয়। ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌচলাচল বিশ্ব অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চলমান এ সংকটে ক্ষতিগ্রস্তরা ধীরে ধীরে তাদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে অপ্রত্যাশিত নতুন খাতের জন্য।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি টেকসই সমঝোতার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে আসায় হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের বাধা সাময়িক কোনো সংকট নয়। এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির এক স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে রূপ নিতে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক উপায়ে কোনো চুক্তি হলেও হতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভারসাম্য ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। ফলে জ্বালানিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বিশ্ব আর কখনোই এ সংকীর্ণ জলপথের ওপর আগের মতো পুরোপুরি নির্ভর করবে না।
এ সংঘাতের মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি একটি ব্যাপক সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি তার চিরচেনা নিয়মে সাড়া দিতে শুরু করেছে। প্রথাগত পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতারা এখন বিকল্প বিক্রেতাদের সন্ধান করছেন। এর ফলে পুরোনো কিছু বাজার বন্ধ হলেও পৃথিবীর নানা প্রান্তে শুরু হচ্ছে নতুন বাণিজ্যিক লেনদেন। মূলত প্রতিটি বড় আর্থিক ক্ষতির বিপরীতেই উন্মোচিত হচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

ক্ষতিগ্রস্ত কারা
চলমান সংকটে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের রপ্তানিকারক দেশগুলো। তবে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা না থাকলেও হরমুজ প্রণালি এখনো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েনি। অন্তত এক ডজন পণ্যবাহী জাহাজ এখনো প্রতিদিন এ জলপথ দিয়ে পারাপার হচ্ছে। এর বাইরে ট্র্যাকিং সুবিধা বন্ধ রেখেও অনেক জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম সৌদি আরবের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে ধাক্কা সামলাতে কিছুটা সহায়তা করলেও সামগ্রিক চিত্র বেশ উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরেই কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক ও ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকোচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
ক্ষতির তীব্রতায় রয়েছে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো। বিশেষ করে মিশর, পাকিস্তান, জর্ডান ও লেবানন। জ্বালানি আমদানির চড়া খেসারত দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব দেশে খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে প্রবাসী আয়ে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সংকটের কারণে এসব দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি 'রেমিট্যান্স' প্রবাহ বড় আকারে ধাক্কা খেয়েছে।
অন্যদিকে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো আপাতত তাদের নিজস্ব মজুদের ওপর ভর করে সাময়িক স্বস্তিতে রয়েছে। তবে বিকল্প উৎস খুঁজে না পেলে এ মজুদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। চীন বর্তমানে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
শক্তি ও খাদ্য খাতের বাইরেও বৈশ্বিক প্রধান শিল্পগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ধস নেমেছে। জেট ফুয়েলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় একলাফে অনেক বেড়ে গেছে। সস্তা গ্যাসের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারীরা। একই সঙ্গে হিলিয়ামের দাম বাড়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ নির্মাতারা।

লাভবান হচ্ছে যারা
জ্বালানি খাতের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিপরীতে বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এখন বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। এ সুবিধাপ্রাপ্তদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া ও কলম্বিয়া। যদিও এসব দেশের সাধারণ মানুষকে জ্বালানি তেল ও গৃহস্থালি ব্যবহারের গ্যাসের চড়া দাম চুকোতে হচ্ছে। তবে তেল কোম্পানিগুলোর বড় লাভের সুবাদে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর রাজস্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের বৃহত্তম গ্যাস সরবরাহকারী দেশ হিসেবে দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছে নরওয়ে। রাশিয়ার মুনাফার পাল্লা আরও ভারী হতে পারত, তবে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের তেলজাত পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিপরীতে, বৈশ্বিক এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে ব্যবসা গুছিয়ে নিচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু খাত। কোনো জাহাজ সংঘাতে আটকে বা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ ভাড়ার কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। রেকর্ড চড়া প্রিমিয়াম আদায় এবং মার্কিন সরকারের পুনঃবিমা সুবিধার কারণে সামুদ্রিক বিমা খাত এখন অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প পরিবহন পথ তৈরির চাহিদা বাড়ায় পাইপ ও পাইপলাইন প্রস্তুতকারকদের বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে। আর প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানির চড়া দামের কারণে নতুন করে গতি পাচ্ছে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তি খাত।

জটিল সমীকরণে প্রতিরক্ষা শিল্প
প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের অবস্থান ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও একটি জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ। সহজভাবে বলতে গেলে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি সংঘাতের অর্থই হলো অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বাড়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী বছরের জন্য তার প্রত্যাশিত ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পুরো বাজেট হয়তো শেষ পর্যন্ত না-ও পেতে পারেন, তবে পেন্টাগনের সামরিক ব্যয় যে বাড়ছে তা অনেকটাই নিশ্চিত। একই সঙ্গে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মিত্র দেশেই প্রতিরক্ষা বাজেট জোরদার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে ক্রমাগত আগ্রাসী পদক্ষেপের হুমকি দিলেও কোনো পক্ষই শেষ পর্যন্ত সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। তবে তারা এমন কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতেও রাজি নয়। ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌচলাচল বিশ্ব অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চলমান এ সংকটে ক্ষতিগ্রস্তরা ধীরে ধীরে তাদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে অপ্রত্যাশিত নতুন খাতের জন্য।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

ইরান যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও লাভবান কারা
সিজেডএন ডেস্ক

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি টেকসই সমঝোতার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে আসায় হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের বাধা সাময়িক কোনো সংকট নয়। এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির এক স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে রূপ নিতে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক উপায়ে কোনো চুক্তি হলেও হতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ভারসাম্য ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। ফলে জ্বালানিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বিশ্ব আর কখনোই এ সংকীর্ণ জলপথের ওপর আগের মতো পুরোপুরি নির্ভর করবে না।
এ সংঘাতের মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি একটি ব্যাপক সরবরাহ সংকটের মুখোমুখি হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি তার চিরচেনা নিয়মে সাড়া দিতে শুরু করেছে। প্রথাগত পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতারা এখন বিকল্প বিক্রেতাদের সন্ধান করছেন। এর ফলে পুরোনো কিছু বাজার বন্ধ হলেও পৃথিবীর নানা প্রান্তে শুরু হচ্ছে নতুন বাণিজ্যিক লেনদেন। মূলত প্রতিটি বড় আর্থিক ক্ষতির বিপরীতেই উন্মোচিত হচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

ক্ষতিগ্রস্ত কারা
চলমান সংকটে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের রপ্তানিকারক দেশগুলো। তবে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা না থাকলেও হরমুজ প্রণালি এখনো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েনি। অন্তত এক ডজন পণ্যবাহী জাহাজ এখনো প্রতিদিন এ জলপথ দিয়ে পারাপার হচ্ছে। এর বাইরে ট্র্যাকিং সুবিধা বন্ধ রেখেও অনেক জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম সৌদি আরবের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে ধাক্কা সামলাতে কিছুটা সহায়তা করলেও সামগ্রিক চিত্র বেশ উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরেই কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক ও ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকোচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
ক্ষতির তীব্রতায় রয়েছে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো। বিশেষ করে মিশর, পাকিস্তান, জর্ডান ও লেবানন। জ্বালানি আমদানির চড়া খেসারত দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব দেশে খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে প্রবাসী আয়ে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সংকটের কারণে এসব দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি 'রেমিট্যান্স' প্রবাহ বড় আকারে ধাক্কা খেয়েছে।
অন্যদিকে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো আপাতত তাদের নিজস্ব মজুদের ওপর ভর করে সাময়িক স্বস্তিতে রয়েছে। তবে বিকল্প উৎস খুঁজে না পেলে এ মজুদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। চীন বর্তমানে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
শক্তি ও খাদ্য খাতের বাইরেও বৈশ্বিক প্রধান শিল্পগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ধস নেমেছে। জেট ফুয়েলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় একলাফে অনেক বেড়ে গেছে। সস্তা গ্যাসের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারীরা। একই সঙ্গে হিলিয়ামের দাম বাড়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ নির্মাতারা।

লাভবান হচ্ছে যারা
জ্বালানি খাতের ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিপরীতে বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এখন বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। এ সুবিধাপ্রাপ্তদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া ও কলম্বিয়া। যদিও এসব দেশের সাধারণ মানুষকে জ্বালানি তেল ও গৃহস্থালি ব্যবহারের গ্যাসের চড়া দাম চুকোতে হচ্ছে। তবে তেল কোম্পানিগুলোর বড় লাভের সুবাদে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর রাজস্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের বৃহত্তম গ্যাস সরবরাহকারী দেশ হিসেবে দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছে নরওয়ে। রাশিয়ার মুনাফার পাল্লা আরও ভারী হতে পারত, তবে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের তেলজাত পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিপরীতে, বৈশ্বিক এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে ব্যবসা গুছিয়ে নিচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু খাত। কোনো জাহাজ সংঘাতে আটকে বা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ ভাড়ার কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। রেকর্ড চড়া প্রিমিয়াম আদায় এবং মার্কিন সরকারের পুনঃবিমা সুবিধার কারণে সামুদ্রিক বিমা খাত এখন অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প পরিবহন পথ তৈরির চাহিদা বাড়ায় পাইপ ও পাইপলাইন প্রস্তুতকারকদের বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে। আর প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানির চড়া দামের কারণে নতুন করে গতি পাচ্ছে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তি খাত।

জটিল সমীকরণে প্রতিরক্ষা শিল্প
প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের অবস্থান ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও একটি জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ। সহজভাবে বলতে গেলে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি সংঘাতের অর্থই হলো অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি এবং অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বাড়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী বছরের জন্য তার প্রত্যাশিত ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পুরো বাজেট হয়তো শেষ পর্যন্ত না-ও পেতে পারেন, তবে পেন্টাগনের সামরিক ব্যয় যে বাড়ছে তা অনেকটাই নিশ্চিত। একই সঙ্গে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মিত্র দেশেই প্রতিরক্ষা বাজেট জোরদার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরকে ক্রমাগত আগ্রাসী পদক্ষেপের হুমকি দিলেও কোনো পক্ষই শেষ পর্যন্ত সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না। তবে তারা এমন কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতেও রাজি নয়। ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌচলাচল বিশ্ব অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চলমান এ সংকটে ক্ষতিগ্রস্তরা ধীরে ধীরে তাদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে অপ্রত্যাশিত নতুন খাতের জন্য।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা করলে সমপর্যায়ের জবাব দেওয়া হবে: ইরান
হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ইরান







