ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ

ফ্রান্সের তরুণরা কেন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার চায়

অমিত কুমার মন্ডল
অমিত কুমার মন্ডল
ফ্রান্সের তরুণরা কেন শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার চায়
ফ্রান্সে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ। ছবি: রয়টার্স

শ্রেণীকক্ষে গাদাগাদি করে বসা, ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়া জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষকের অভাব আর দিন দিন আকাশছোঁয়া পড়ালেখার খরচ- এ চিত্র এখন আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো একটি দেশের নয়। সরকারি নীতি ও শিক্ষায় বাজেট ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা। ফরাসি উচ্চ বিদ্যালয়ের তরুণদের হাত ধরে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা এখন প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও পুরো ইউরোপজুড়ে এটি কোনো একক বা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত আন্দোলন নয়, তবুও দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলো একই রকম। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার যখন কাটছাঁটের পথ খুঁজছে, তখন শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলছেন- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষায় কি তবে পর্যাপ্ত বাজেট থকবে না?

আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ফ্রান্স

এ বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে, প্যারিস অঞ্চলে। অবকাঠামোগত সংস্কার, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। মুহূর্তের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ফ্রান্সে। শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রধান ফটকগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ক্ষুব্ধ অভিভাবক এবং দেশের শীর্ষ শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ কেবল ক্লাসরুমের ভিড় বা অনুপস্থিত শিক্ষকের বিকল্প না থাকা নিয়ে নয়। ধনী ও দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোর মধ্যকার আকাশপাতাল বৈষম্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের জটিল ভর্তি প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ ক্লাসের মানসিক চাপ নিয়েও তারা মুখ খুলেছেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বিক্ষোভ তীব্র সহিংস রূপ নেয়। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যাদের বড় অংশই শিক্ষার্থী। শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হন।

লেন্স শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর নিজের হাত হারান। পরিস্থিতির চাপে ফরাসি সরকার বিক্ষোভ দমনে স্টান গ্রেনেড ব্যবহার আপাতত স্থগিত করেছে এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ঘাটতি কমাতে সরকার যখন ব্যয় সংকোচনের চাপে রয়েছে, তখন রাজপথের বার্তা একটাই- ফাঁকা প্রতিশ্রুতি নয়, শিক্ষায় চাই বাস্তব বিনিয়োগ।

পুলিশের কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ। ছবি: রয়টার্স
পুলিশের কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ। ছবি: রয়টার্স

এ সংকটের শেকড় কোথায়

বাজেট আর প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাই এ সংকটের মূল কারণ। ২০২৬ সালের বাজেটে ফ্রান্সের সরকারি স্কুলগুলো থেকে সাড়ে তিন হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ ছাঁটাই করা হয়েছে। অথচ ২০০৮ সালের তুলনায় ফরাসি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে আড়াই লাখের বেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে। ফলে ক্লাসের আকার বড় হয়েছে। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। উপশহরগুলোতে এ সংকট সবচেয়ে প্রকট। দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলেই শিক্ষকের পদ খালি।

এ কারণেই শিক্ষা সংকট রূপ নিয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে। বর্তমানে ফ্রান্সকে তরুণরা দুই রূপে দেখছে। স্কুলে গেটের ভেতরে ঢুকলে মনে হয় এ রাষ্ট্র একেবারে পঙ্গু ও ক্লান্ত- যেখানে শিক্ষক নেই, ভবন মেরামত হয় না বা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হয় না। কিন্তু যখন তারা ক্ষোভ নিয়ে স্কুলের গেট পেরিয়ে রাস্তায় নামে, তখন রাষ্ট্র রাতারাতি তার সর্বশক্তি নিয়ে হাজির হয়। গ্রেপ্তার, কাঁদানে গ্যাস আর জনতা নিয়ন্ত্রণের অস্ত্রশস্ত্র দেখিয়ে রাষ্ট্র বুঝিয়ে দেয় তাদের পেশিশক্তি এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

ভোট দেওয়া বা কর দেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই তরুণ প্রজন্ম এ অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হচ্ছে। তারা শিখতে শুরু করেছে, যে রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য একজন শিক্ষক বা ন্যূনতম সম্পদ জোগাড় করতে হিমশিম খায়, সেই রাষ্ট্রই তাদের দমন করার জন্য ঠিকই পর্যাপ্ত শক্তির যোগান দিচ্ছে।

উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে
উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে

শিক্ষাখাতে বাজেট ছাঁটাইয়ের কারণ

ফ্রান্স বর্তমানে ইউরোজোনের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতির মুখোমুখি। দেশটিতে জাতীয় ঋণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এ ঘাটতি সামাল দিতে সরকার প্রায় ৬১ বিলিয়ন ইউরোর একটি বিশাল সামগ্রিক ব্যয় সংকোচন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষাখাতেও। ফলে অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক খাত, যেমন পেনশন ও প্রতিরক্ষা খাতে খরচ ঠিক রাখতে গিয়ে শিক্ষাখাতে বড় বরাদ্দ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে সরকারের যুক্তি হলো, দেশটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে ফ্রান্সে স্কুলগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ কমে যাবে।

আলবেনিয়ার তিরানায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স
আলবেনিয়ার তিরানায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিক্ষোভের আঁচ

ফ্রান্সের এই অসন্তোষের ঢেউ দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পাশের বেলজিয়ামে। দেশটির লিয়েজ শহরে সম্প্রতি শত শত শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। পড়ালেখার খরচ বৃদ্ধি, উপচে পড়া ক্লাসরুম আর শিক্ষা উপকরণের ঘাটতিই তাদের প্রধান ক্ষোভ।

একই চিত্র ফুটে উঠেছে ইতালিতেও। তুরিন ও রোমের শিক্ষার্থীরা অপর্যাপ্ত বাজেট, ভেঙে পড়া অবকাঠামো আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে সোচ্চার তারা। এমনকি ফরাসি সহপাঠীদের আন্দোলনে সংহতি জানাতে কিছু ইতালীয় শিক্ষার্থী সরাসরি প্যারিসেও ছুটে গেছেন। পিছিয়ে নেই গ্রীসও। দেশটির শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন, সমাবেশ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। এছাড়া আলবেনিয়ার শিক্ষার্থীরাও একই দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে।

উত্তেজনার পেছনের মূল কারণ

সব মিলিয়ে এ অস্থিরতা ইউরোপের একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে ইউরোপের সরকারগুলো বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে ও ঋণের বোঝা কমাতে খরচ কমানোর নীতি হাঁটছে, অন্যদিকে নাগরিকেরা যে খাতগুলোর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল সেখানে বরাদ্দ বাড়ানোর জোর দাবি উঠছে।

এটি সত্য যে পুরো ইউরোপজুড়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট ছাতার নিচে পরিকল্পিতভাবে এইছাত্র অভ্যুত্থান ঘটছে না। প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সমস্যা রয়েছে। কিন্তু ফরাসি তরুণদের তৈরি এ স্ফুলিঙ্গ ইউরোপজুড়ে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমান জরাজীর্ণ ব্যবস্থা মেনে নিতে তরুণ সমাজ আর প্রস্তুত নয়। আগামী দিনের শিক্ষা ব্যবস্থার সুরক্ষায় সরকারগুলো আদৌ অর্থ ঢালবে কি না- সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন রাজপথে খুঁজছে পুরো ইউরোপ।

/এমএকে/