একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পণ্যে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পণ্যে
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বাটি, গ্লাস ও চামচ। সম্প্রতি তোলা ছবি।

কয়েকদিন আগের কথা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত নুডলস খাচ্ছিলেন একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। তার নাম নাজমুল হাসান। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের প্লেট ও চামচ দিয়ে তিনি নুডলস খাচ্ছিলেন। খাওয়া শেষ করতে তার ১০ মিনিটেরও কম সময় লেগেছে। খাওয়া শেষে তিনি প্লেট ও চামচ সড়কেই ফেলে দেন। কিন্তু সেই প্লেট ও চামচ কয়েক শ বছরের জন্য থেকে যাবে মাটি ও পানির মধ্যে তা হয়তো তার মাথায় আসেনি। প্লাস্টিকের এসব সামগ্রী পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি এগুলোতে জনস্বাস্থ্যও ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর-এসব পণ্য কেন ব্যবহার করছেন জিজ্ঞাসা করতেই নাজমুল হাসান জানালেন, ‘এত কিছু হিসাব করি নাই। এখন তো এটাই (ওয়ান টাইম প্লাস্টিক) চলে সব জায়গায়। বিকল্প কিছু না থাকলে তো আমাদের কিছু করার নাই।‘

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য প্রায় প্রতিদিনের। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ চায়ের বা রাস্তার পাশের ভাসমান দোকান, এমনকি স্থায়ী খাবারের দোকানেও এখন নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে একবার ব্যবহাযোগ্য প্লাস্টিকের কাপ-বাটি। খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও প্লাস্টিকের কন্টেইনার, চামচ ও গ্লাসের ব্যবহার বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। এছাড়া পার্ক, বাস-ট্রেন স্টেশনে খাবার ও চা বিক্রেতারা প্লাস্টিকের কাপ-বাটি ব্যবহার করেন।

বিক্রেতাদের মতে সময় বাঁচে, ঝামেলা কমে-এসব সুবিধার কারণেই প্লাস্টিকের পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু এই ‘সুবিধা’ এখন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে করোনার পর দেশের শহর ও মফস্বলে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এসব একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের বড় সমস্যা হলো - এগুলো খুব সহজে পচে না এবং পুনর্ব্যবহারও কঠিন। ফলে ব্যবহারের পর এগুলো ড্রেন, খাল ও নদীতে গিয়ে জমে থাকে বছরের পর বছর। শহরের জলাবদ্ধতা ও নদীদূষণের পেছনেও এসব বর্জ্যের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এসব পণ্য ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। চিকিৎসকদের মতে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বাটি বা কাপে গরম খাবার বা পানীয় রাখলে এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। এতে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক - বিশেষ করে ‘বিসফেনল’ (প্লাস্টিক এবং ইপোক্সি রেজিন তৈরিতে ব্যবহৃত এক ধরনের শিল্প রাসায়নিক যৌগ) - খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এসব উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এতে নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির (এনআইএসটি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, একবার ব্যবহারযোগ্য কাপে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানি ঢাললে কোটি কোটি অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা সেই পানিতে মিশে যায়।

গবেষকরা জানান, এসব প্লাস্টিক কণার আকার এত ছোট যে তা রক্তকণিকায় প্রবেশের সক্ষমতাও রাখে। যদিও মানবদেহে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, তবু এটি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার বরফ থেকে শুরু করে শহরের বাতাসে পর্যন্ত এই প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহারে কিছু আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য নিয়ন্ত্রণে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে বাজার, রেস্তোরাঁ ও স্ট্রিট ফুড ব্যবসায় এই পণ্যের ব্যবহার অব্যাহতভাবে বাড়ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের ওপর ভ্যাট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছিলো অন্তবর্তী সরকার। পাশাপাশি কাগজ, পোড়ামাটি ও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি বিকল্প পণ্যের ওপর ভ্যাট মওকুফের কথাও বলা হয়েছে। তবে তাতেও কমেনি এসব পণ্যের ব্যবহার।

সড়কের পাশের একটি দোকানে প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার দেওয়া হচ্ছে।
সড়কের পাশের একটি দোকানে প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর বৃদ্ধি বা নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

এবিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমাদের দ্রুত ওয়ান টাইম কাপ-বাটি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা উচিত। এতে ব্যবহকারকারীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি যারা কখনো এসব ব্যবহার করেন নাই, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কেননা এসব প্লাস্টিক একটা সময় ফসলি জমি এবং নদীতে গিয়ে পড়ছে। এভাবে ফসল ও মাছেও এই প্লাস্টিকের মাইক্রো উপাদান যুক্ত হচ্ছে, যা খেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মানুষ।

ডা. কাকলী হালদার আরও বলেন, স্কুল থেকেই প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা তৈরিতে যেন কাজ করে সরকার। এছাড়া নানা ভাবে দেশবাসীকে এসব পণ্য ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে নানাভাবে প্রচার চালাতে হবে।

/বিবি/