যেকোনো সময় তেল আমদানি বন্ধের শঙ্কা, ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
যেকোনো সময় তেল আমদানি বন্ধের শঙ্কা, ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হাতে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য আর মাত্র ১৫ দিনের টাকা রয়েছে। ফলে অক্টোবরের যেকোনো সময় তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত হিসাব দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

বৈঠকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি সচিব, বিপিসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানায়, এতদিন সরকার এলএনজি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিলেও চলতি বছর জ্বালানি তেল আমদানিতে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি বিপিসি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে তাদের আর্থিক সংকটের কথা জানায়।

চিঠিতে বলা হয়, বিপিসির সঞ্চিত অর্থ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বর্তমানে ব্যাংকে তাদের ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কোনোভাবে সেপ্টেম্বরের তেল আমদানির ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও এরপর যেকোনো সময় আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।

লোকসান বাড়ছে বিপিসির

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, তেল ও কয়লার দাম বেড়েছে। চলতি মাসে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে উঠেছিল। বৃহস্পতিবার তা কমে ১০২ ডলারে নেমেছে।

উচ্চ দামে তেল কিনে দেশে কম দামে বিক্রি করায় বিপিসির লোকসান দ্রুত বাড়ছে। একটি হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি লিটার ডিজেলে এখন সরকারের লোকসান ৯০ টাকার বেশি। এতে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ কোটি টাকা।

দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ডিজেলের ব্যবহার ৪৫ লাখ টনের বেশি।

বিপিসির হিসাবে, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত তেল বিক্রি করে লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে লোকসান হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে লোকসানের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

আমদানি ব্যয় বেড়েছে

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা, মে মাসে ৪ হাজার ১৮২ কোটি এবং আগস্টে ২ হাজার ৭৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর এ ব্যয় অনেক বেড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তেল আমদানির বিল ছিল ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি এবং আগস্টে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা।

শুল্কের চাপও বাড়ছে

বিপিসির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক। আগে ট্যারিফ ভ্যালুর ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণ করা হতো। তখন প্রতি লিটার তেল আমদানিতে শুল্ক ছিল ১৬ টাকা ৭৬ পয়সা।

এখন ইনভয়েস ভ্যালুর ভিত্তিতে শুল্ক নেওয়া হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে শুল্কের পরিমাণও বেড়ে যায়।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি লিটার তেল আমদানিতে এনবিআর ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা শুল্ক পেয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে তা বেড়ে হয় ৩৮ টাকা ৬৪ পয়সা। এপ্রিলে ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা এবং আগস্টে ৩২ টাকা ৪৪ পয়সা।

বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে বিপিসির খরচ পড়ছে প্রায় ২০৫ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪০ টাকা যাচ্ছে শুল্ক হিসেবে।

হাতে নেই প্রয়োজনীয় অর্থ

বিপিসি অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও অন্যান্য প্রকল্পের জন্য চলতি বছর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে তেল আমদানির ব্যয় মেটানো হয়েছে।

বর্তমানে বিপিসির হিসাবে রয়েছে ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। ইআরএল-২ প্রকল্পের জন্য আলাদা হিসাবে আছে ১ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে অন্তত দুই মাসের তেল আমদানির অর্থ বিপিসির হিসাবে থাকার কথা। সে হিসাবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই মাসের আমদানির অর্থ না থাকলে অনেক ব্যাংক ঋণপত্র বা এলসি খুলতে সমস্যায় পড়ে।

এর পাশাপাশি ডিসেম্বরের মধ্যে বিপিসির আরও বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে ৫২৪ কোটি টাকা এবং এসপিএম প্রকল্পের ঋণের কিস্তি হিসেবে ৬৯০ কোটি টাকা দিতে হবে। অন্যান্য প্রকল্পেও ডিসেম্বরের মধ্যে আরও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে বিপিসি প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে তেলের দাম বাড়ানো, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক প্রত্যাহার এবং তাদের ২২ হাজার কোটি টাকার লোকসান ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।

সরকার এখন তেল আমদানি সচল রাখতে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত নেওয়া হয়নি।

/এমআর/