নিজ বিদ্যালয়ে ফিরলেন প্রধান শিক্ষক হয়ে

নিজ বিদ্যালয়ে ফিরলেন প্রধান শিক্ষক হয়ে
মো. ইব্রাহিম হাওলাদার ঈশান

১৯৮৪ সালে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসাবে যে বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পেয়েছিলেন নূরুন্নাহার বেগম, প্রায় দুই দশক পর তিনি সেই বিদ্যালয়েই ফিরে আসেন প্রধান শিক্ষক হিসাবে। যে প্রতিষ্ঠান একদিন তাকে স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছিল, পরে সেই প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নেন তিনি। নিজের শিকড়ে ফিরে গড়লেন মডেল বিদ্যালয়।
বর্তমানে নূরুন্নাহার বেগম ১০৮ নম্বর বাকেরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রায় তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা বিকাশ, আত্মবিশ্বাস তৈরি এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করাই তার মূল লক্ষ্য।
বৃত্তি থেকে শিক্ষকতা
নূরুন্নাহার বেগমের শিক্ষাজীবনের শুরু ১১ নম্বর ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৮৪ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি সেখান থেকে প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করেন।
১৯৮৯ সালে বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন। এরপর বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে বাংলায় এমএ ও বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৬ সালে জামিনা মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৯৭ সালে তিনি বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। নিজের সাবেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে কাজ করার সময় কয়েকজন সাবেক শিক্ষকের সহকর্মী হওয়ার সুযোগও পান তিনি।
নিজের শিকড়ে ফেরা
২০০৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে একসময় বৃত্তি পেয়েছিলেন।
২০০৩ সাল থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক তিনি বিদ্যালয়টির দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় বিদ্যালয়টি ১১ নম্বর ভরপাশা ইউনিয়নের একটি মডেল বিদ্যালয় হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।
তার দায়িত্বকালে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করে। তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
শিক্ষার্থীদের সাফল্য
তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইশান পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরাফাত অথুন, তারিকুল ইসলাম, ফাহাদ, ইশিতা ও নাহিদ পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিরাজুল ইসলাম, তাজবীর ও সুজয় পড়ছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। শফিকুল ইসলাম পড়ছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) এবং ইমরান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সানজিদা শরমী ও আফরিন জাহান আন্নি শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছেন। আফিফা তন্বী চিকিৎসক হিসাবে কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন।
তার আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আরিফুর রহমান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। দিলরুবা সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং রিয়াদ হোসেন বাংলাদেশের জাতীয় বাস্কেটবল দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এ তালিকার বাইরেও তার অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
স্বীকৃতি ও অর্জন
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য নূরুন্নাহার বেগম উপজেলা পর্যায়ে ১২ বার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৭ সালে তিনি বরিশাল জেলা পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসাবে তিনি জয়িতা পদক অর্জন করেছেন। বাংলা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ে তিনি মাস্টার ট্রেইনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২০১৯ সালে চীন সফরের সুযোগ পান তিনি।
নতুন কর্মস্থলে নতুন অধ্যায়
দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় দুই দশক দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে নূরুন্নাহার বেগম যোগ দেন ১০৮ নম্বর বাকেরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
নতুন কর্মস্থলেও শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি, পাঠদানে আগ্রহ বাড়ানো এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি ২৭টি ট্যালেন্টপুলসহ মোট ৪৬টি বৃত্তি অর্জন করে। এ ছাড়া বিদ্যালয়টি বরিশাল জেলার প্রতিনিধিত্ব করে চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
নূরুন্নাহার বেগমের জীবন কেবল একজন প্রধান শিক্ষকের কর্মজীবনের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি একসময় যে বিদ্যালয় থেকে স্বপ্ন দেখার সাহস পেয়েছিলেন, পরে সেই বিদ্যালয়েই ফিরে এসে নতুন প্রজন্মের জন্য কাজ করেছেন।
পুরস্কার ও পদক একজন শিক্ষকের কাজের স্বীকৃতি হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য বেঁচে থাকে তার শিক্ষার্থীদের জীবনে।
নূরুন্নাহার বেগমের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনও সম্ভবত সেখানেই তার শিক্ষার্থীদের সাফল্যে, তাদের এগিয়ে চলায় এবং অসংখ্য স্বপ্নপূরণের গল্পে।

১৯৮৪ সালে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসাবে যে বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পেয়েছিলেন নূরুন্নাহার বেগম, প্রায় দুই দশক পর তিনি সেই বিদ্যালয়েই ফিরে আসেন প্রধান শিক্ষক হিসাবে। যে প্রতিষ্ঠান একদিন তাকে স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছিল, পরে সেই প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নেন তিনি। নিজের শিকড়ে ফিরে গড়লেন মডেল বিদ্যালয়।
বর্তমানে নূরুন্নাহার বেগম ১০৮ নম্বর বাকেরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রায় তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা বিকাশ, আত্মবিশ্বাস তৈরি এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করাই তার মূল লক্ষ্য।
বৃত্তি থেকে শিক্ষকতা
নূরুন্নাহার বেগমের শিক্ষাজীবনের শুরু ১১ নম্বর ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৮৪ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি সেখান থেকে প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করেন।
১৯৮৯ সালে বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন। এরপর বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে বাংলায় এমএ ও বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৬ সালে জামিনা মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৯৭ সালে তিনি বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। নিজের সাবেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে কাজ করার সময় কয়েকজন সাবেক শিক্ষকের সহকর্মী হওয়ার সুযোগও পান তিনি।
নিজের শিকড়ে ফেরা
২০০৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে একসময় বৃত্তি পেয়েছিলেন।
২০০৩ সাল থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক তিনি বিদ্যালয়টির দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় বিদ্যালয়টি ১১ নম্বর ভরপাশা ইউনিয়নের একটি মডেল বিদ্যালয় হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।
তার দায়িত্বকালে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করে। তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
শিক্ষার্থীদের সাফল্য
তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইশান পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরাফাত অথুন, তারিকুল ইসলাম, ফাহাদ, ইশিতা ও নাহিদ পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিরাজুল ইসলাম, তাজবীর ও সুজয় পড়ছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। শফিকুল ইসলাম পড়ছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) এবং ইমরান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সানজিদা শরমী ও আফরিন জাহান আন্নি শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছেন। আফিফা তন্বী চিকিৎসক হিসাবে কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন।
তার আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আরিফুর রহমান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। দিলরুবা সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং রিয়াদ হোসেন বাংলাদেশের জাতীয় বাস্কেটবল দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এ তালিকার বাইরেও তার অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
স্বীকৃতি ও অর্জন
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য নূরুন্নাহার বেগম উপজেলা পর্যায়ে ১২ বার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৭ সালে তিনি বরিশাল জেলা পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসাবে তিনি জয়িতা পদক অর্জন করেছেন। বাংলা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ে তিনি মাস্টার ট্রেইনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২০১৯ সালে চীন সফরের সুযোগ পান তিনি।
নতুন কর্মস্থলে নতুন অধ্যায়
দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় দুই দশক দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে নূরুন্নাহার বেগম যোগ দেন ১০৮ নম্বর বাকেরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
নতুন কর্মস্থলেও শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি, পাঠদানে আগ্রহ বাড়ানো এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি ২৭টি ট্যালেন্টপুলসহ মোট ৪৬টি বৃত্তি অর্জন করে। এ ছাড়া বিদ্যালয়টি বরিশাল জেলার প্রতিনিধিত্ব করে চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
নূরুন্নাহার বেগমের জীবন কেবল একজন প্রধান শিক্ষকের কর্মজীবনের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি একসময় যে বিদ্যালয় থেকে স্বপ্ন দেখার সাহস পেয়েছিলেন, পরে সেই বিদ্যালয়েই ফিরে এসে নতুন প্রজন্মের জন্য কাজ করেছেন।
পুরস্কার ও পদক একজন শিক্ষকের কাজের স্বীকৃতি হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য বেঁচে থাকে তার শিক্ষার্থীদের জীবনে।
নূরুন্নাহার বেগমের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনও সম্ভবত সেখানেই তার শিক্ষার্থীদের সাফল্যে, তাদের এগিয়ে চলায় এবং অসংখ্য স্বপ্নপূরণের গল্পে।

নিজ বিদ্যালয়ে ফিরলেন প্রধান শিক্ষক হয়ে
মো. ইব্রাহিম হাওলাদার ঈশান

১৯৮৪ সালে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসাবে যে বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পেয়েছিলেন নূরুন্নাহার বেগম, প্রায় দুই দশক পর তিনি সেই বিদ্যালয়েই ফিরে আসেন প্রধান শিক্ষক হিসাবে। যে প্রতিষ্ঠান একদিন তাকে স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছিল, পরে সেই প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নেন তিনি। নিজের শিকড়ে ফিরে গড়লেন মডেল বিদ্যালয়।
বর্তমানে নূরুন্নাহার বেগম ১০৮ নম্বর বাকেরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রায় তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা বিকাশ, আত্মবিশ্বাস তৈরি এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করাই তার মূল লক্ষ্য।
বৃত্তি থেকে শিক্ষকতা
নূরুন্নাহার বেগমের শিক্ষাজীবনের শুরু ১১ নম্বর ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৮৪ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি সেখান থেকে প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করেন।
১৯৮৯ সালে বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন। এরপর বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে বাংলায় এমএ ও বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৬ সালে জামিনা মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৯৭ সালে তিনি বাকেরগঞ্জ সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং ২০০৩ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। নিজের সাবেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে কাজ করার সময় কয়েকজন সাবেক শিক্ষকের সহকর্মী হওয়ার সুযোগও পান তিনি।
নিজের শিকড়ে ফেরা
২০০৩ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে একসময় বৃত্তি পেয়েছিলেন।
২০০৩ সাল থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত প্রায় দুই দশক তিনি বিদ্যালয়টির দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় বিদ্যালয়টি ১১ নম্বর ভরপাশা ইউনিয়নের একটি মডেল বিদ্যালয় হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।
তার দায়িত্বকালে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করে। তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
শিক্ষার্থীদের সাফল্য
তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইশান পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরাফাত অথুন, তারিকুল ইসলাম, ফাহাদ, ইশিতা ও নাহিদ পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিরাজুল ইসলাম, তাজবীর ও সুজয় পড়ছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। শফিকুল ইসলাম পড়ছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) এবং ইমরান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সানজিদা শরমী ও আফরিন জাহান আন্নি শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছেন। আফিফা তন্বী চিকিৎসক হিসাবে কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন।
তার আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আরিফুর রহমান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। দিলরুবা সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং রিয়াদ হোসেন বাংলাদেশের জাতীয় বাস্কেটবল দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এ তালিকার বাইরেও তার অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
স্বীকৃতি ও অর্জন
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য নূরুন্নাহার বেগম উপজেলা পর্যায়ে ১২ বার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৭ সালে তিনি বরিশাল জেলা পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসাবে তিনি জয়িতা পদক অর্জন করেছেন। বাংলা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ে তিনি মাস্টার ট্রেইনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২০১৯ সালে চীন সফরের সুযোগ পান তিনি।
নতুন কর্মস্থলে নতুন অধ্যায়
দুধলমৌ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় দুই দশক দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে নূরুন্নাহার বেগম যোগ দেন ১০৮ নম্বর বাকেরগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
নতুন কর্মস্থলেও শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি, পাঠদানে আগ্রহ বাড়ানো এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি ২৭টি ট্যালেন্টপুলসহ মোট ৪৬টি বৃত্তি অর্জন করে। এ ছাড়া বিদ্যালয়টি বরিশাল জেলার প্রতিনিধিত্ব করে চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
নূরুন্নাহার বেগমের জীবন কেবল একজন প্রধান শিক্ষকের কর্মজীবনের গল্প নয়। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি একসময় যে বিদ্যালয় থেকে স্বপ্ন দেখার সাহস পেয়েছিলেন, পরে সেই বিদ্যালয়েই ফিরে এসে নতুন প্রজন্মের জন্য কাজ করেছেন।
পুরস্কার ও পদক একজন শিক্ষকের কাজের স্বীকৃতি হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য বেঁচে থাকে তার শিক্ষার্থীদের জীবনে।
নূরুন্নাহার বেগমের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনও সম্ভবত সেখানেই তার শিক্ষার্থীদের সাফল্যে, তাদের এগিয়ে চলায় এবং অসংখ্য স্বপ্নপূরণের গল্পে।









