শিরোনাম

৩৩ বছর পর জাকসু: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের খতিয়ান

মো. রহমাতুল্লাহ
মো. রহমাতুল্লাহ
৩৩ বছর পর জাকসু: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের খতিয়ান
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ভবন

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচিত ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের অধিকার, কল্যাণ ও দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের। তবে জাকসুর বর্তমান মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র ১০ দিন বাকি। এর মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহারের কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে এবং দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকার প্রতিশ্রুতি কতটা বজায় রয়েছে এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

জাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে জিএস, এজিএসসহ ২০টিতে শিবির-সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্রার্থীরা জয়ী হন। ভিপিসহ বাকি পাঁচটি পদের মধ্যে তিনটিতে স্বতন্ত্র এবং দুটিতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)-সমর্থিত ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ প্রার্থীরা বিজয়ী হন।

‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শতভাগ আবাসন, শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল, সেশনজট নিরসন, গবেষণা সহায়তা, ডাইনিংয়ে ভর্তুকি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক অটোমেশন, পরিবহন উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক অবকাঠামোসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর পাশাপাশি শিক্ষক মূল্যায়ন, মানোন্নয়ন পরীক্ষার সুযোগ, সম্পূরক বৃত্তি, স্মার্ট আইডি কার্ড, ডিজিটাল কুপন, ফ্রি ওয়াই-ফাই, ইকোলজিক্যাল মাস্টারপ্ল্যান, সাইকেল লেন, ডে-কেয়ার সেন্টার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও ছিল।

১১ মাসে এসব প্রতিশ্রুতির কয়েকটি বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শতভাগ আবাসন নিশ্চিতকরণ, গেস্টরুম সংস্কৃতির অবসান, ক্যাফেটেরিয়ায় তিন বেলা খাবার সরবরাহ, ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা, বাসের লাইভ ট্র্যাকিং অ্যাপ, ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত রিকশা সেবা। বটতলায় ফিমেল ওয়াশরুম স্থাপনের উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে প্রশাসনের কাছে সুপারিশও করা হয়েছে। কয়েকটি হলে ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থা চালু হলেও তা এখনো সব হলে কার্যকর হয়নি।

তবে ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ডাইনিংয়ে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি, স্বাস্থ্যবীমা ও টেলিমেডিসিন, শিক্ষক মূল্যায়ন, মানোন্নয়ন পরীক্ষার সুযোগ, শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল, গবেষণা সহায়তা বৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ ইকোলজিক্যাল মাস্টারপ্ল্যান, সাইকেল লেন, পরিবেশবান্ধব রাইড-শেয়ার, আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রশিক্ষক, ডে-কেয়ার সেন্টার, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, স্মার্ট আইডি কার্ড এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য র্যাম্প, ব্রেইল বই, অডিও বুক ও ই-লার্নিং সুবিধা।

নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গত ১২ মে রাতে ফজিলাতুন্নেছা হল-সংলগ্ন সড়ক থেকে এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার ১২১ দিন পার হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হননি। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তায় জাকসুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীদের অনেকে।

এদিকে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের নাট্য সম্পাদক রুহুল ইসলামের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মেট্রোরেল আনার বিষয়টি থাকলেও এ নিয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। এজিএস আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলার প্রতিশ্রুত ডে-কেয়ার সেন্টার, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, ছাত্রী হলের পাশে শব্দদূষণ রোধে সাউন্ডপ্রুফ গ্লাস এবং হিজাব-নিকাব পরা ছাত্রীদের ডিজিটাল ভেরিফিকেশনও বাস্তবায়িত হয়নি।

জাকসুর মেয়াদে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু। তার বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে আবাসিক হলে অবস্থান, হলের নিয়ম পরিবর্তনে প্রভাব খাটানো, রিকশা নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক কর্মীকে ছাড়িয়ে নেওয়া এবং ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুল আলম শেখের সঙ্গে তার কথোপকথনের চ্যাট ফাঁস নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

নির্বাচনের আগে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করলেও গত ৬ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে জিতুর বিএনপিতে যোগ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রশ্ন, নির্বাচনের আগে দেওয়া অবস্থানের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার বিষয়টি সাংঘর্ষিক কি না।

এ ছাড়া গত ১০ আগস্ট জাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুহিবুল্লাহ শেখ জিসানের পদত্যাগ নিয়েও আলোচনা হয়। তিনি দায়িত্ব পালনে সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ তোলেন। পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতির মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করেছে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।

জাবি শিক্ষার্থী আনিসা জুঁই বলেন, ‘জাকসুকে কোনোভাবেই সফল বলা যায় না। তারা শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে নারী নিরাপত্তা ও জুলাইয়ের হামলায় জড়িতদের বিচারের বিষয়ে জাকসুর ভূমিকা হতাশাজনক।’

তবে আরেক শিক্ষার্থী তানভীর বলেন, ৩৩ বছর পর জাকসু চালু হওয়ায় শুরুতে কিছু প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক সমস্যা ছিল। প্রশাসনের অনীহাও ছিল। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জাকসুকে শিক্ষার্থীবান্ধব হিসেবে পেয়েছেন তিনি। তার মতে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলেও জাকসুর বেশ কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক।

জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, ৩৩ বছর পর জাকসুর কার্যক্রম শুরু করতেই প্রায় এক মাস লেগেছিল। পরবর্তী ১১ মাসে প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেও তাঁরা ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। তার দাবি, গেস্টরুম নির্যাতন, র্যাগিং, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও চাঁদাবাজি বন্ধের পাশাপাশি যাতায়াত, চিকিৎসা, খাবার, আইটি ও লাইব্রেরি সেবায় অগ্রগতি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ৫৫তম ব্যাচ থেকে ডিজিটাল অটোমেশন, নতুন সড়ক ও ফুটপাত নির্মাণ, বটতলায় ওয়াশরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই, একাডেমিক প্রশিক্ষণ এবং মেডিকেল সেন্টারের মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজে জাকসু ভূমিকা রেখেছে। অধিকাংশ উদ্যোগ বাস্তবায়নের শেষ ধাপে রয়েছে। তবে মেয়াদের শেষ দিকে প্রশাসনের অনীহা ও অসহযোগিতা কিছু কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

/এমআর/