কাশফুল আর নাচের ছন্দে ছায়ানটের শরৎ উৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
কাশফুল আর নাচের ছন্দে ছায়ানটের শরৎ উৎসব
ছায়ানটের ‘শরতের অনুষ্ঠান’-এ নাচ পরিবেশন করেন শিল্পীরা

আশ্বিনের এক সকালে ঘুড়ি, কাশফুল আর নীল-সাদায় এক চিলতে শরতের পরশ পেলো ইট-কাঠের নগরী। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল প্রাঙ্গণে ছায়ানটের ‘শরতের অনুষ্ঠান’ এই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিলো।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় মূল আয়োজন। ভেন্যুর ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি ঝুলছে বেগুনি, গোলাপি, হলুদ, নীল ঘুড়ি। মঞ্চ সাজানো হয়েছে কাশফুলের গুচ্ছে। পুরো মঞ্চ জুড়ে ধাপে ধাপে বসেছে শিক্ষার্থীদের বিশাল দল। মেয়েদের সাদা-নীল শাড়ি, ছেলেদের সাদা পাঞ্জাবি আর নীল-সবুজ উত্তরীয়র রঙে পুরো মঞ্চ যেন এক জীবন্ত কাশবন।

পুরো মঞ্চ জুড়ে ধাপে ধাপে বসেছে শিক্ষার্থীদের বিশাল দল
পুরো মঞ্চ জুড়ে ধাপে ধাপে বসেছে শিক্ষার্থীদের বিশাল দল

ছায়ানট ও সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে যুক্ত হয় নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়, এক্সেল একাডেমি এবং সেন্ট যোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

আয়োজনের শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শরতে আজ কোন্ অতিথি’ শিরোনামের সম্মেলক গান ও নৃত্য দিয়ে। পাঁচ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমবেত কণ্ঠের সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। এরপর একে একে মঞ্চে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও অতুল প্রসাদ সেনের গান, ছড়া এবং কবিতা আবৃত্তি।

শরতের নীল আকাশ আর সাদা মেঘের সঙ্গে মিল রেখে শাড়ি পরেন নৃত্যশিল্পীরা
শরতের নীল আকাশ আর সাদা মেঘের সঙ্গে মিল রেখে শাড়ি পরেন নৃত্যশিল্পীরা

নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে ‘আলোর অমল কমলখানি’ ও ‘শরৎ (আজি কি তোমার মধুর মুরতি)’। পাশাপাশি সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতাটি বৃন্দ আবৃত্তিতে তুলে ধরেন তারা। এ পর্বে একক গান ‘তোমরা যা বলো তাই বলো’ ও ‘ভোরের ঝিলের জলে’ পরিবেশন করেন দুই শিল্পী মেহেরিন ফাতেমা এবং সুদর্শনা অলকানন্দা কুণ্ডু।

এক্সেল একাডেমির নিবেদনে ছিল সম্মেলক গান ‘দেখো– দেখো, দেখো, শুকতারা আঁখি’। এতে একক সংগীত পরিবেশন করেন অরুণাভ দে ও ইপ্সিতা সিকদার।

সেন্ট যোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা গেয়ে শোনান ‘কোন্ খেপা শ্রাবণ ছুটে এলো’ গানটি।

এরপর ছায়ানটের পার্থিব সাহা পরিবেশন করেন ‘শিউলি ফুল শিউলি ফুল’ গানটি। আরও ছিল ইজমির মুস্তাফিজের একক আবৃত্তি শরৎ (এসেছে শরৎ, হিমের পরশ) এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘কোন্ শরতে পূর্ণিমা-চাঁদ’ কবিতার বৃন্দ আবৃত্তি। অঙ্কিতা সরকার গেয়ে শোনান ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’।

শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবকরা ভেন্যুতে বসে উপভোগ করেন ছায়ানটের ‘শরতের অনুষ্ঠান’
শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবকরা ভেন্যুতে বসে উপভোগ করেন ছায়ানটের ‘শরতের অনুষ্ঠান’

সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা গেয়ে শোনান ‘আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি’। একক কণ্ঠে সার্থক সাহা ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক’, বাঁধন কুণ্ডু ‘হৃদয়ে ছিলে জেগে’ এবং দিব্যময় দেশ ‘মেঘেরা দল বেঁধে যায়’ পরিবেশন করেন।

অনুষ্ঠানের শেষ অংশে ছায়ানটের পরিবেশনায় ছিল ‘ওগো শেফালিবনের মনের কামনা’। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে একক সংগীতে সুর তোলেন শতদ্রু সরকার, প্রেমা দেওয়ানজী।

ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী জানান, শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তাগিদ থেকেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন। তিনি বলেন, ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে ঋতুভিত্তিক বৈচিত্র্য রয়েছে। বিশেষ করে শরতের স্নিগ্ধতা– বৃষ্টিহীন নীল আকাশ, মেঘের ভেলা, ফুটন্ত কাশবন ও শিউলি ফুল মিলিয়ে শরতের যে নিজস্ব রূপ, তা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ছায়ানট।

তিনি আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে এনে এবং তাদের মাধ্যমে এই সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়ে চলমান প্রকৃতিবিনাশী কার্যক্রম অনেকটাই প্রশমিত করা সম্ভব।

সবশেষে, পাঁচ প্রতিষ্ঠানের যৌথ কণ্ঠে ‘আজ ধানের ক্ষেতে’ সম্মেলক নৃত্যগীত এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে এই শারদ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।

শিশু-কিশোর, তাদের শিক্ষক-অভিভাবক, শিল্পী আর দর্শকরা অনুষ্ঠানটি ভেন্যুতে বসে উপভোগ করেন। পাশাপাশি ছায়ানটের অফিশিয়াল ফেইসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলেও সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।

/এফসি/