ডিজে পার্টি থেকে বদলি বাণিজ্য, অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ

ডিজে পার্টি থেকে বদলি বাণিজ্য, অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটিতে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের তিন তলা বাড়ি। এই বাড়ি থেকে ডিজি পার্টিতে যোগ দেওয়া ৮৫ জনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ বাড়িটিতে কিছুদিন আগেও রাতভর ডিজে পার্টি চলতো। সেই আয়োজনের আড়ালে মাদক সেবনসহ অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগও রয়েছে। বাড়িটি পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের।

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে সেখানে অভিযান চালায় ডিবির উত্তরা বিভাগ। এরপর থেকে বাড়িটি তালাবদ্ধ। এতে এই বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে চলা সব অনৈতিক কাজ এখন বন্ধ। তবে কার পৃষ্ঠপোষকতায় এবং কীভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে এতদিন এসব অপকর্ম হচ্ছিল তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে।

গতকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রধান ফটকে তালা। বন্ধ বাড়ির সব দরজা-জানালা। ভেতরে সুনসান নীরবতা। বাড়ির সামনে সাদা ও বেগুনি রঙের দুটি প্রাইভেট কার পড়ে আছে। সেখানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ডিবির অভিযানে ৮৫ জনকে আটক করা হয়। এরপর থেকেই বাড়িটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে ।

বাড়িটির পেছনে প্রায় ৫০ গজ দূরে খিলক্ষেত থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ফাঁড়ির এত কাছে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ডিজে পার্টি চললেও পুলিশি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খিলক্ষেত থানাধীন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির মূল সড়কের শেষ প্রান্তে দুই নম্বর প্লটে প্রায় সাড়ে ছয় কাঠা জমির ওপর ২০২৫ সালে ‘ট্রিপলেক্স’ বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। স্টিল স্ট্রাকচারে নির্মিত ভবনটির ভেতরে মূল্যবান ইন্টেরিয়র, একাধিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং সামনের খোলা জায়গায় টেবিল-চেয়ার সাজানো রয়েছে। প্রধান ফটকটি বিভিন্ন ফুলের গাছে সাজানো।

অভিযানের পরও সরেনি দুই গাড়ি

বাড়িটির সামনে পড়ে থাকা দুটি প্রাইভেট কারের বিষয়ে স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মীদের কাছেও স্পষ্ট তথ্য নেই। পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির এক নিরাপত্তারক্ষী জানান, ডিবির অভিযানের পর থেকেই গাড়ি দুটি সেখানে পড়ে আছে। তার ধারণা, গাড়ি দুটি অভিযানে আটক ব্যক্তিদেরও হতে পারে।

অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়ির সামনে ডিজি পার্টিতে অংশ নেওয়া অতিথিদের দুটি প্রাইভেট কার পড়ে আছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়ির সামনে ডিজি পার্টিতে অংশ নেওয়া অতিথিদের দুটি প্রাইভেট কার পড়ে আছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সেখানে দায়িত্ব পালনরত এক পুলিশ সদস্যর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি ওই দিনই প্রথম সেখানে দায়িত্বে এসেছেন বলে জানান। ফলে গাড়ি দুটি বা বাড়িটির বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। বাড়ির কোনো কেয়ারটেকার বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেও ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।

পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির নিরাপত্তাকর্মী এহসান বলেন, অভিযানের সময় ডিবি পুলিশ ওই বাড়ি থেকে ৮৫ জনকে আটক করে। ওই সময় বাড়িরে কেয়ারটেকারকেও ডিবি আটক করে নিয়ে গিয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে তাঁর কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই।

‘সবাই জানত, এখানে কী চলত’

বাড়িটির পাশেই রয়েছে পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির নিজস্ব নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকি। সেখানে কথা হয় কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। তাঁদের ভাষ্য, অভিযানের দিনও বাড়িটিতে গানবাজনা চলছিল। ডিবি সদস্যরা অভিযান চালিয়ে লোকজনকে নিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকটি গাড়িও নিয়ে যান বলে তাঁদের দাবি।নিরাপত্তাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে কী ধরনের আয়োজন হতো, তা স্থানীয় অনেকেরই জানা ছিল।

বাড়িটির পেছনে প্রায় ৫০ গজ দূরে খিলক্ষেত থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ফাঁড়ির এত কাছে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ডিজে পার্টি চললেও পুলিশি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শরিফুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আসে ফাঁড়িটি উদ্বোধন করা হয়। ফাঁড়িটি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। তাঁরা থানা থেকে এসে সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। তবে বাড়িটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে যোগাযোগের পরামর্শও দেন।

পার্টি আয়োজনের জন্য দেওয়া ওই বিজ্ঞাপনটিতে দাবি করা হয়েছিল, বাড়িটি পুলিশের একজন ডিআইজির মালিকানাধীন হওয়ায় সেখানে পুলিশি অভিযানের আশঙ্কা নেই এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।

এ বিষয়ে ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বলেন, অভিযানের সময় বাড়িটিতে ডিজে পার্টি চলছিল। অভিযানে আটককৃতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিল। সেখানে থাকা ২৬ জন তরুণীর মধ্যে বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর। তাদের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও ছিলেন।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডিজি পার্টির প্রচার

ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাড়িটিতে পার্টি আয়োজনের জন্য এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার নামের দুটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের (ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, এক্স) ব্যক্তিগত গ্রুপে অংশগ্রহণকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হতো বলে জানা গেছে।

ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা বিজ্ঞাপনে ১৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত পার্টি আয়োজনের কথা উল্লেখ ছিল। এখানে ব্যক্তিগত ও আমন্ত্রণনির্ভর হিসেবে তুলে ধরে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

পার্টি আয়োজনের জন্য দেওয়া ওই বিজ্ঞাপনটিতে দাবি করা হয়েছিল, বাড়িটি পুলিশের একজন ডিআইজির মালিকানাধীন হওয়ায় সেখানে পুলিশি অভিযানের আশঙ্কা নেই এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত থাকবেন।

ডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এসব আয়োজন থেকে পাওয়া আয়ের ৭০ শতাংশ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ব্যাংক হিসাবে জমা হতো। বাড়িটির সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তাঁর হাতে ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তিনি অনলাইনে ‘এয়ারবিএনবি’ অ্যাপসের মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া দিতেন।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দুটি অনলাইন গ্রুপের একটিতে প্রায় ২০০ এবং অন্যটিতে ৩০০ জনের কাছাকাছি সদস্য ছিলেন। এসব গ্রুপের মাধ্যমে কীভাবে অংশগ্রহণকারী সংগ্রহ করা হতো, কারা আয়োজন পরিচালনা করতেন এবং অর্থের লেনদেন কীভাবে হতো-সেসব বিষয় তদন্ত করছে পুলিশ।

অভিযানে ৮৫ জন আটক, জব্দ মাদক ও সেবন সরঞ্জাম

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবির উত্তরা বিভাগ। অভিযানের বিষয়ে ডিবির ভাষ্য, সেখানে ডিজে পার্টি চলছিল। পার্টির কক্ষ শিশার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল এবং অর্ধনগ্ন নাচ চলছিল বলেও দাবি করেন অভিযানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আটক করা হয় ৮৫ জনকে। আটকদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়েও রয়েছেন। ডিবির তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও মাদক গ্রহণের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরে আটক ব্যক্তিদের ডিএমপির সামারি কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এর মধ্যে পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অতিরিক্ত ১৫ দিনের কারাদণ্ড এবং নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অতিরিক্ত তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষ ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান রয়েছেন বলেও সূত্রের দাবি।

মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি আয়োজনের অভিযোগ

ডিবির দাবি, ২০২৫ সাল থেকে বাড়িটিতে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হচ্ছিল। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো এবং অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা এসব আয়োজনে যোগ দিতেন।

ডিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এসব আয়োজন থেকে পাওয়া আয়ের ৭০ শতাংশ পুলিশের ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ব্যাংক হিসাবে জমা হতো। বাড়িটির সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তাঁর হাতে ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তিনি অনলাইনে ‘এয়ারবিএনবি’ অ্যাপসের মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া দিতেন।

বিভাগীয় ব্যবস্থার প্রস্তুতি

এই ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। ফাইল ছবি
পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। ফাইল ছবি

আবাসন প্রকল্প থেকে বদলি বাণিজ্য—জহিরকে ঘিরে নানা অভিযোগ

‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি পুলিশের আবাসন প্রকল্প, জমি কেনাবেচা, বদলি-পদায়ন এবং নির্মাণসামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দায়িত্ব পালনের সময় প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

রিমঝিম পুলিশ টাউন প্রকল্প ঘিরে অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মোখলেছুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালন করেন আব্দুল্লাহ আল জহির। ওই সময়ে প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সম্পর্কের সূত্র ধরে পুলিশের বিভিন্ন প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে জহিরের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এসব সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন খাতে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

জহিরের বিরুদ্ধে রিমঝিম পুলিশ টাউন আবাসন প্রকল্পকে ঘিরেও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা প্রলয় জোয়ারদারের সঙ্গে মিলে তিনি প্রকল্পটি গড়ে তোলেন। জহিরের বন্ধু অলিউর রহমানের নামে একটি কোম্পানি গঠন করে প্রকল্পটি পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পটির প্লট কিনতে ২৪তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। প্লট কিনতে রাজি না হওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠে।

এ ছাড়া স্থানীয় জমির মালিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক জমি দখল, বালু ফেলে ফসলি জমি দখল নেওয়া এবং কম দামে জমি বিক্রিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে এলাকাবাসী একাধিকবার মানববন্ধনও করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরে পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ

পুলিশের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্রের দাবি, জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আব্দুল্লাহ আল জহির নতুন করে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের ডেভেলপমেন্ট শাখায় নিজের পছন্দ অনুযায়ী পদায়ন নেন।

সূত্রটির দাবি, ওই শাখায় আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ সীমিত মনে করায় পরে তিনি পারসোনেল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখায় বদলি হন। এরপর তার বিরুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে ।

নির্মাণসামগ্রী কেনায় ১৫ শতাংশ বেশি দরের অভিযোগ

পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালামাল কেনাকাটায়ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে আব্দুল্লাহ আল জহিরের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোম্পানির বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দিষ্ট সরবরাহকারীদের কাছ থেকে মালামাল কিনতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাপ দেওয়া হতো।

অভিযোগ রয়েছে, আগের সরবরাহকারীদের তুলনায় অন্তত ১৫ শতাংশ বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হতো ঠিকাদারদের। বাড়তি দরের অর্থের একটি অংশ জহিরে কাছে যেত বলেও দাবি করা হয়েছে। এমন চাপ ও অনিয়মের কারণে ঠিকাদারি কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি ছেড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে আজ শনিবার সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি বলেন, ‘বাড়িটি অনলাইনে এয়ারবিএনবি অ্যাপসের মাধ্যমে বিদেশি অতিথি ও ফ্যামিলি গ্যাদারিংয়ের জন্য ভাড়া দেওয়া হতো। ভাড়া দেওয়ার শর্তের মধ্যে স্ট্রিকলি মাদক পরিহারের কথা উল্লেখ ছিল। একজন কেয়ারটেকার সেখানে সার্বক্ষনিক নজরদারি করতো। তবে সেদিনের পার্টি থেকে ৮৫ জনকে আটকের পর যে পরিমাণ মাদক উদ্ধার দেখানো হয়েছে তা খুবই নগণ্য। এত মানুষের আয়োজনে কে, কীভাবে ব্যাগের ভেতর দুটি মদের বোতল নিয়ে এসেছেন, সেই দায় আমার ওপর দেওয়া অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক।’

সেই দিনের ডিজে পার্টির বুকিং আসলে কে করেছিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, সেই রাতে বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ম্যানেজারকে তুলে নিয়ে যায় ডিবি। ওই ম্যানেজারই এসব কিছুর দেখভাল করতেন। তিনি দাবি করেন, কোনো ধরনের অনৈতিক উদ্দেশ্যে তিনি বাড়িটি কখনোই ভাড়া দিতেন না।

পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন) মোখলেসুর রহমানের স্টাফ অফিসার থাকাকালীন অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্টাফ অফিসারে কাজ হলো ভেন্যু এবং শিডিউল অনুযায়ী প্রটোকল করা। এর বাইরে আর কোনো সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই।

এছাড়া রিমঝিম আবাসন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ বিসিএস ২৪তম ব্যাচের ২০০ জন অফিসার মিলে রেজিস্টার্ড সমিতির মাধ্যমে প্রকল্পটি করা হয়েছে। সেখানে একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে যা সমিতির সদস্যরাই মিলে গঠন করেন। সেখানে দুর্নীতির কোনো বিষয় নেই।’

পুলিশ বিভাগে বদলি ও পদায়নের জন্য টাকার নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আব্দুল্লাহ আল জহির।

তদন্তেই মিলবে উত্তর

ডিবির অভিযানের পর আব্দুল্লাহ আল জহিরের ওই বাড়িটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। এখন বাড়িটির সামনে পড়ে থাকা দুটি গাড়ি এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনুপস্থিতি ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। পড়ে থাকা গাড়িগুলোর মালিক কারা, কেন সেগুলো সরানো হয়নি, তালাবদ্ধ বাড়িটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে কী ধরনের আয়োজন চলতো, কারা তা পরিচালনা করতেন এবং এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকে কিছু জানত কি না?-এসব প্রশ্নের উত্তর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্তে বের হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

/বিবি/