উন্নয়ন থেমে যায় ডিটিসিএর খামখেয়ালিতে

উন্নয়ন থেমে যায় ডিটিসিএর খামখেয়ালিতে
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেক প্রকল্পের জন্য ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। তবে এই ছাড়পত্র নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন আবাসন ব্যবসায়ী ও সাধারণ সেবাগ্রহীতারা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ডিটিসিএতে ফাইল জমা পড়ার পর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয় মাসের পর মাস। অনেক ক্ষেত্রে ছাড়পত্র পেতে সময় লাগে এক বছর থেকে দুই বছর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বহুতল ভবনের ট্রাফিক সার্কুলেশন ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য সরকারি নিয়মে ৪৫ কার্যদিবস সময় নির্ধারিত থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নির্ধারিত সময়ের বহু গুণ বেশি সময় পার হলেও অনেক ফাইল নিষ্পত্তি হয় না। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। বাড়ছে ব্যয়ও।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত ১০ তলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবন, প্রধান সড়ক বা ব্যস্ত সড়কের পাশে অবস্থিত প্রকল্প এবং যেসব ভবনে মানুষের সমাগম ও যানবাহনের চাপ বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেসব প্রকল্পের জন্য ডিটিসিএর ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া ঢাকার মহাপরিকল্পনা বা কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) অনুযায়ী কোনো সড়কের সীমানার মধ্যে প্রকল্প পড়লে সেখানেও ডিটিসিএর মতামত নিতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভবন নির্মাণের ফলে আশপাশের সড়কে অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি হবে কি না, সেটিই মূলত যাচাই করে ডিটিসিএ। পাশাপাশি গাড়ি প্রবেশ ও বের হওয়ার গেটের অবস্থান, বেজমেন্টে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, র‌্যাম্পের নকশা, সামনের সড়কের প্রস্থ এবং ফুটপাতের অবস্থা খতিয়ে দেখা হয়।

এ ছাড়া ভবনটি ভবিষ্যতে কোনো সড়ক সম্প্রসারণ, মেট্রোরেল বা বিআরটি প্রকল্পের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে কি না, তাও যাচাই করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা গেছে, ট্রাফিক সার্কুলেশন ছাড়পত্রের আবেদন যাচাই এবং অনুমোদনের উপযুক্ততা নির্ধারণের জন্য ডিটিসিএতে ‘ট্রাফিক সার্কুলেশন ছাড়পত্র সুপারিশ কমিটি’ (টিসিইসি) রয়েছে। এ কমিটির অধীনে একটি সাবকমিটিও কাজ করে। সাবকমিটি আবেদনগুলোর কারিগরি দিক যাচাই করে সুপারিশ মূল কমিটির কাছে পাঠায়। পরে মূল কমিটির পর্যালোচনার ভিত্তিতে ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে এই প্রক্রিয়ায় আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘদিন ফাইল আটকে থাকায় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, অর্থায়ন ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের চাপ উদ্যোক্তাদের ওপর পড়ে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় জমির মালিকদের সঙ্গেও বিরোধ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এই বিষয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘ডিটিসিএতে ফাইল যাওয়ার অর্থই হচ্ছে সময়ক্ষেপণ, হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতি। সংস্থাটির গাফিলতির কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে আবাসন উদ্যোক্তা ও ভূমির মালিকদের মধ্যে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।’

অন্যদিকে আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্বের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়াকে দায়ী করছেন ডিটিসিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ট্রাফিক সার্কুলেশন ছাড়পত্র সুপারিশ কমিটির সদস্যসচিব ও ডিটিসিএর আরবান প্ল্যানার (চলতি দায়িত্ব) সৈয়দ মাহফুজ-উল-ইসলাম বলেন, ‘ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিষয়ে ডিটিসিএর ওয়েবসাইটে একটি নির্দেশিকা রয়েছে। সেখানে কোন কোন নথি জমা দিতে হবে, সে সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু আবেদনকারীরা ওয়েবসাইটে ওই নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দেয় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা আবার সময়মতো জমা না দেওয়ায় আমাদের মূল্যায়ন করতেও দেরি হয়ে যায়। যার কারণে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও আমরা ছাড়পত্র দিতে পারি না।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি ড. মো. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘ডিটিসিএ ফাইল আটকে রাখে দুই কারণে; হয়রানি নয়তোবা দুর্নীতি করার জন্য। ডিটিসিএর উচিত সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রেসপন্স করে ভুল কী আছে তা চিহ্নিত করে সুরাহা করা।’

তিনি বলেন, ‘নকশা অনুমোদনের বিষয়টি রাজউক দেখে, তাই রাজউকের উচিত ডিটিসিএসহ যে যে প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার প্রয়োজন তাদের সুনির্দিষ্ট কার্যদিবস বা সময় বেঁধে দেওয়া এবং এই সময়ের মধ্যে ফাইল ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা।’

রাজউকের আট তলার অধিক ভবনের নকশা অনুমোদনকারী বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটির সদস্য পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) মো. মনিরুল হক বলেন, ‘ডিটিসিএর ছাড়পত্র ছাড়া আমরা নকশা অনুমোদন করি না। এই বিষয়টি সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন। আমি এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবো।’

/বিবি/