একের পর এক জোড়া লাগছে পপুলার, ভয়াবহ ঝুঁকিতে সেবাগ্রহীতারা

একের পর এক জোড়া লাগছে পপুলার, ভয়াবহ ঝুঁকিতে সেবাগ্রহীতারা
ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের একপাশে পপুলার গ্রুপের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়ক। এই সড়কের পাশেই ছয়টি ভবনে পপুলার গ্রুপের চারটি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান। সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা। কিন্তু এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ ও ভোগান্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কারণ এখানে পপুলার গ্রুপ একটি ভবনের সঙ্গে অপর একটি ভবন জোড়া দিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। একটি ভবন থেকে আরেকটি ভবনের মধ্য কোনো ফাঁকা জায়গাও রাখা হয়নি। এসব ভবনে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ওঠানামার জন্য কোনো র‍্যাম্প নেই। এসব কারণে ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছেন সেবাগ্রহীতারা।

এভাবে পপুলার গ্রুপ শুধু ইমারত নির্মাণ বিধিমালাই লঙ্ঘন করেনি, তাদের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনায় রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা। এতে বড় ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে একসঙ্গে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালে রোগীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পপুলার কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা নিয়ম মেনেই সব করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের পাশে সাতটি ভবনে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও কনসালটেশন সেন্টারের কার্যক্রম চলছে । এসব ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অপ্রতুল। অধিকাংশ ভবনের বেজমেন্টে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলোতে জরুরি বহির্গমন পথ ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই।

অথচ অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩ অনুযায়ী যেকোনো বহুতল বাণিজ্যিক ভবন এবং বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনার জন্য ফায়ার লাইসেন্স এবং ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুমোদন করা বাধ্যতামূলক।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মিডিয়া কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ পপুলারের চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনায় কোনো ক্রটি থাকলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের পাশে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কনসালটেশন সেন্টার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের পাশে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কনসালটেশন সেন্টার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

সরেজমিনে যা দেখা গেলো

পপুলার হাসপাতালের তিন এবং চার নম্বর ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। চার নম্বর ভবন ১১ তলা ও তিন নম্বর ভবন ছয় তলা। আর ছয়তলাবিশিষ্ট দুই নম্বর ভবনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বসেন। এক নম্বর ভবনে ডায়াগনস্টিক সেন্টার। দুই নম্বর ভবনকে তিন নম্বর ভবনের সঙ্গে একটি সরু স্টিলের সিঁড়ি দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এটি জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ করে অগ্নিদুর্ঘটনা বা ভূমিকম্পের সময় মোটেই ব্যবহারের উপযোগী নয়।

পাঁচ নম্বর ভবনের পাঁচ এবং ছয় তলা ভাড়া নিয়েছে পপুলার কর্তৃপক্ষ। এই ভবনেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চেম্বার আছে। পপুলারের এক নম্বর ভবনের পাশে ৭ নম্বর ভবন। এই ভবনের পাঁচ এবং ছয় তলা পপুলার কর্তৃপক্ষ ভাড়া নিয়েছে। সেখানে পপুলার মেডিকেল কলেজের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

পাঁচ নম্বর ভবনের পশ্চিম পাশে চার নম্বর ভবন। এ ভবন দুটির মাঝখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) এবং ইউটিলিটির সরঞ্জাম এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে একজন মানুষ সেখান দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।

চার নম্বর ভবনের তৃতীয় ও দ্বিতীয় তলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেল পাঁচটার দিকে তৃতীয় তলায় মানুষের ভিড় দেখা যায়। এই ভবনের সাত তলায় রয়েছে কেবিন ব্লক ও কার্ডিয়াক সেন্টার।

এই সময় সেখানে চিকিৎসা নিতে দিনাজপুর থেকে আসা একজন নারী রোগীর ছেলের সঙ্গে কথা হয় সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের এই প্রতিনিধির। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার মায়ের হার্টে একটি রিং পরানো হয়েছে। ওই রিংয়ের দাম নেওয়া হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। এনজিওগ্রাম করাতে নেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। হাসপাতালের খরচ নেওয়া হয়েছে এক লাখ টাকা। শুধু তার পরিচিত এক চিকিৎসক আছেন বলে তিনি এখানে তার মায়ের হার্টের রিং পরিয়েছেন। তবে এখানে সবকিছুর দাম অনেক বেশি রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পপুলার হাসপাতালের কেবিন ব্লকে ঢুকলে সেখান থেকে বের হয়ে আসা অনেক কঠিন। কারণ একই তলায় অনেকগুলো কেবিন এবং চলাচলের পথ। পাশে কোনো জানালা নেই। এখানে অনেকটা আবদ্ধ পরিবেশ। এসব ভবনে রোগীদের ওঠানামার র‍্যাম্প নেই।

পপুলার গ্রুপের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম যে পাঁচটি ভবনে পরিচালিত হয় সেগুলোতে কোনো জরুরি বহির্গমনের পথ ও বিকল্প সিঁড়ি নেই। অথচ বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০২০ অনুযায়ী, যেকোনো বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনে দুটি আলাদা সিঁড়ি থাকার কথা। এর মধ্যে একটি মূল সিঁড়ি এবং অপরটি জরুরি বা বিকল্প সিঁড়ি হিসেবে থাকার কথা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘রাজউকের এই বিষয়গুলো সরেজমিন পরীক্ষা করে দেখা উচিত। কারণ অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটলে বলা হয় এগুলোর অনুমোদন ছিল না। এর দায়দায়িত্ব এড়ানোর কোন সুযোগ নেই। শুধু পপুলার কর্তৃপক্ষই নয় আনোয়ার খান মর্ডানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একইভাবে তৈরি করা হয়েছে। এখন সরকারের এই বিষয়ে নজর দিতে হবে ‘

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পপুলার হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের গাড়ি এবং অ্যাম্বুলেন্সের কারণে প্রায়ই ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কে তীব্র যানজট হয়। এখানের পাঁচটি ভবনের দুটিতে গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তিনটি ভবনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও জায়গা খুব কম। অধিকাংশ গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে রাখা হয়।

ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের পাশে পপুলার কনসালটেশন সেন্টার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর
ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের পাশে পপুলার কনসালটেশন সেন্টার। ছবি: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

পপুলার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইমারত নির্মাণ নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে কি না-সে বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের জোন (৫/২) -এর অথরাইজড কর্মকর্তা রকিবুল হাসান মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘ড্রয়িং (নকশা) অনুযায়ী পপুলার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভবনগুলো জোড়া দিয়েছে কি না, তা সরেজমিন না ঘুরে বলা সম্ভব না। তবে বিল্ডিং কোড অনুযায়ী এন্ট্রি ও এক্সিটের ব্যবস্থা থাকতে হবে।’

পপুলারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ

গত বছর সাদিয়া পারভিন নামে এক রোগী তার স্বামীকে নিয়ে পপুলার হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের চিকিৎসক শাফি মজুমদারের কাছে যান। তিনি ইকোকার্ডিওগ্রাফি ও ইসিজি করে সেই চিকিৎসকের কাছে গেলেও তিনি ওই রিপোর্ট দেখতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শেষ পর্যন্ত রিপোর্ট না দেখেই রোগীকে দুই-একটি ওষুধ দিয়ে বিদায় দেন। অথচ রোগীর কাছ থেকে ঠিকই ২০০০ টাকা ভিজিট ফি নেওয়া হয়। এ ঘটনায় গত বছরের ২৯ অক্টোবর সাদিয়া পারভিন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে উভয় পক্ষকে শুনানির জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সাদিয়া পারভীন ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকায় আর শুনানিতে অংশ নিতে পারেননি বলে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে জানিয়েছেন।

পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‌‌অগ্নিনিরাপত্তা ও পার্কিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকা দরকার।

স্বাস্থ্যের ডিজি চেম্বার করেন পপুলারে

নানা অনিয়ম ঢাকতে ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের দণ্ড থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্য বিভাগের বর্তমান ও সাবেক ঊর্ধ্বতন কমপক্ষে ২৫ জন কর্মকর্তাকে চেম্বারে বসার সুযোগ করে দিয়েছে পপুলার কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতাল ও কনসালটেশন সেন্টারে চেম্বার করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘আমি এক সময়ে পপুলারে চেম্বার করতাম। বর্তমানে বন্ধ রাখা হয়েছে। ওখানে সময় দেওয়ার সুযোগ নাই।’ তবে পপুলারের ওয়েবসাইটে ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নামের তালিকায় তার নাম রয়েছে। পপুলারের ধানমন্ডি শাখায় হটলাইনে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় তিনি এই মাসে ছুটি নিয়েছেন।

এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবু ইউসুফ ফকির, সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) ডা. মো. নাজমুল ইসলাম এখানে রোগী দেখেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি (হরমোন ও ডায়াবেটিস) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা ডা. মো. ফিরোজ হোসেন। তিনিও পপুলারের ধানমন্ডি শাখায় কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়মিত রোগী দেখেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ডিএমসিএইচ), বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বারডেম হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতাল থেকে পপুলার হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে আনার জন্য কয়েকজন দালাল রয়েছে। এ কাজের জন্য দালালদের মোটা অঙ্কের কমিশন দেওয়া হয়।

হাসপাতালে নানা ধরনের অনিয়ম, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগের বিষয়ে পপুলার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা. মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার জন্য গত ২৪ সেপ্টেম্বর সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের পক্ষ থেকে তার মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। এ বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনে দুই দফা খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

তবে এসব বিষয়ে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপমহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) অচিন্ত্য কুমার নাগ মুঠোফোনে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, সরকারের সংস্থাগুলোর নীতিমালা অনুসরণ করেই তারা এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। হাসপাতালে রোগীর ওঠানামায় র‍্যাম্প রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া হাসপাতালে হাইড্রোলিক লিফট রয়েছে। ২ ও ৩ নম্বর ভবনটি ভাড়ায় নেওয়ার কারণে সেগুলোকে বেজমেন্ট নেই। এ কারণে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। সেখানে নতুন করে বেজমেন্ট তৈরি করা সম্ভব না।

/বিবি/