শিরোনাম

‘গায়ের জোরে’ই সিনেমা হলের সেই ৪ প্লট শান্তাকে দিলো রাজউক

‘গায়ের জোরে’ই সিনেমা হলের সেই ৪ প্লট শান্তাকে দিলো রাজউক
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

গুলশান-১ এ সিনেমা হলের প্লটে অবশেষে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েই গেলো বেসরকারি আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান শান্তা হোল্ডিংস। একের পর এক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনেকটা ‘গায়ের জোরে’ই প্লটগুলো শান্তার হাতে তুলে দিয়েছে রাজউক। শুরু থেকেই রাজউক চেয়ারম্যানের এই বিষয়ে ছিল বাড়তি আগ্রহ। রাজউকের মধ্যমসারির কর্মকর্তারা শান্তা হোল্ডিংসকে চারটি প্লট একত্রীকরণের বিষয়ে আপত্তি তুললেও চেয়ারম্যানের সামনে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। ভূমি বরাদ্দের নির্দেশিকা না মেনে ফাইল প্রক্রিয়া করার দাপ্তরিক নিয়মের বাইরে গিয়ে শান্তাকে বাণিজ্যিক অনুমোদন দেওয়া হয়। বোর্ড সভা ও সংশ্লিষ্ট উইংকে পাশ কাটিয়ে এখতিয়ারবহির্ভূত একজন আইনজীবীর মতামতকে কাজে লাগিয়ে চেয়ারম্যান নিজেই তা অনুমোদন দেন। গত ২২ জুলাই রাজউক উপ-পরিচালক মো. নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরে শান্তা হোল্ডিংসকে অনুমোদনের চিঠি দেওয়া হয়। এখন সিনেমা হলের জমিতে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে হাজার কোটি টাকা নিজেদের পকেটে নেবে শান্তা।

এখানে কোনো কিছুই ব্যক্তিগত নয়। আইনগত উপায়ে সবকিছু করা হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক

সিনেমা হলের শর্তে বরাদ্দ

রাজধানীর গুলশান (দক্ষিণ) বাণিজ্যিক এলাকার ১৪, ৩৭, ৪১ ও ৪৩ নম্বর প্লট ১৯৭৫ সালে ৯৯ বছরের জন্য ‘বাণীচিত্র’ ও ‘চলচ্চিত্র’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল জমিগুলোতে সিনেমা হল নির্মাণ করতে হবে। অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

কিন্তু প্রায় পাঁচ দশকেও সেখানে সিনেমা হল নির্মাণ হয়নি। পরে আম-মোক্তারনামার মাধ্যমে প্লটগুলোর নিয়ন্ত্রণে আসে শান্তা হোল্ডিংস। ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই তিনটি প্লটের সঙ্গে ১৪ নম্বর প্লট যুক্ত করে চারটি প্লট একত্রীকরণের আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। লক্ষ্য ছিল বড় আকারের বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ।

shanta holdings
গুলশান-১ গোল চত্বরে রাজউকের বরাদ্দ দেওয়া প্লটে শান্তা হোল্ডিংসের বিলবোর্ড। ফাইল ছবি: হারুন-অর-রশীদ

এরপরই শুরু হয় রাজউকে অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা। ফাইলটি রাজউকের বিভিন্ন শাখায় দীর্ঘদিন ধরে ঘুরতে থাকে। তবে আইনি জটিলতার কারণে ফাইলটির প্রতি আগ্রহ দেখাননি কেউ।

এবার পাশ কাটানো হলো ‘দাপ্তরিক চেইন’

শান্তার প্লট একত্রীকরণের ফাইল ঘিরে রাজউকের মধ্যমসারির কর্মকর্তাদের আপত্তি ছিল একাধিক পর্যায়ে। কখনো আম-মোক্তারনামার বিরোধ, কখনো আদালতের নির্দেশ, কখনো প্লটের ব্যবহার পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।

রাজউকের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, শুরু থেকেই শান্তার এই ফাইল নিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের বিশেষ আগ্রহ ছিল। কর্মকর্তাদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ফাইলটি এগিয়ে নিতে ওপরের মহলের ছিল বিশেষ তৎপরতা। রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আবাসন কোম্পানিটি ফাইলটি পাস করিয়ে নিতে রাজউক ভবনে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা ঢেলেছে।

সূত্র জানায়, স্বাভাবিক দাপ্তরিক নিয়মে যখন ফাইল এগোনো যাচ্ছিলো না, তখন ‘দাপ্তরিক চেইন’কে পাশ কাটিয়ে চেয়ারম্যান নিজ মর্জিমতো তা পাস করে দেন।

নথি ঘেঁটে দেখা যায়, গত ২১ জুলাই চারটি প্লট একত্রীকরণের অনুমোদনপত্র জারি করে প্রয়োজনীয় ফি গ্রহণে আইনগত কোনো বাধা আছে কি না, তা জানতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ইমাম হাছানের মতামত চায় রাজউক। জবাবে আইনগত বাধা নেই বলে মত দেন অ্যাডভোকেট ইমাম হাছান। এই মতামতের ভিত্তিতেই মাত্র একদিন পরই অর্থাৎ ২২ জুলাই রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম অনুমতিপত্র জারির নির্দেশ দেন। আর সেই দিনই একত্রীকরণ ফি জমা দেওয়ার অনুমোদনপত্র জারি করা হয়। ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন সংস্থাটির উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. নজরুল ইসলাম ও সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মো. আশরাফ আলী। এতে প্রায় ২২ বিঘা ১৮ কাঠা জমির বিপরীতে রাজউক কোষাগারে নামমাত্র ফি জমা দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করলো শান্তা হোল্ডিংস।

এখানেই প্রশ্ন উঠেছে রাজউকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে। কারণ, আইনগত বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য রাজউকের নিজস্ব আইন শাখা রয়েছে। কোনো আবেদন নিয়ে আইনি জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে তা আইন শাখায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে মতামত নিয়ে পরবর্তী প্রশাসনিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এরপর বিষয়টি বোর্ড সভায়ও উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ শান্তার ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক চেইন অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট এস্টেট ও ভূমি-১ শাখার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মাসুম আলী বেগের লিখিত আপত্তির পরও বিষয়টি বোর্ড সভায় না নিয়ে একজন বেসরকারি আইনজীবীর মতামত নেওয়া হয়। সেই মতামতকে সামনে রেখেই জারি করা হয়েছে অনুমোদনপত্র।

shanta
গুলশান এক নম্বরের গোল চত্বরে টিন দিয়ে ঘেরা বিশাল জায়গায় শান্তা হোল্ডিংসের বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের তোড়জোড় চলছে। ফাইল ছবি

শান্তার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

অনুসন্ধানে জানা যায়, চারটি প্লট একীভূত হওয়ার ফলে এখন বড় আকারের বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গুলশানের বাসিন্দাদের জন্য নির্ধারিত বিনোদনের সুযোগও স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে। শান্তা হোল্ডিংসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবনটি ৩৫-৪০ তলার বেশি হতে পারে। প্রতি তলায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার বর্গফুট জায়গা এবং শুরুতে প্রতি বর্গফুটের দাম প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধরা হলে প্রকল্পটির মোট সম্ভাব্য বাণিজ্যিক মূল্য দাঁড়াতে পারে হাজার কোটি টাকার বেশি।

এই বিষয়ে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘অনুমোদনপত্র জারি করার জন্য কে কী করেছে তা ফাইলেই লেখা আছে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বাইরে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারবো না।’

অভিযোগের বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এখানে কোনো কিছু ব্যক্তিগত না। আইনগত উপায়ে সবকিছু করা হয়েছে।’

/এসএ/