পাঠ্যবইয়ে আসছে পরিবর্তন, থাকছে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
পাঠ্যবইয়ে আসছে পরিবর্তন, থাকছে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক প্রযুক্তি নিয়ে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করতে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক প্রযুক্তি নিয়ে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করতে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নতুন সংস্করণের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা স্থান পাচ্ছে। পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও যুক্ত করা হচ্ছে।

শুধু ইতিহাস নয়, বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মাধ্যমিকের আইসিটি বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন করে দুটি করে মোট চারটি বই চালু করা হচ্ছে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, নতুন ও সংশোধিত বইগুলোর বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। চলতি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। নতুন বইগুলোতে শিক্ষার্থীদের সহজে বিষয় বুঝিয়ে দিতে চিত্র ও ইলাস্ট্রেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এনসিটিবি সূত্র বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী যুক্ত করা হবে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্স নিয়ে লেখা থাকবে।

নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে যুক্ত হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ। এ ছাড়া ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

অষ্টম ও নবম শ্রেণির একই বিষয়ের বইয়ে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে লেখা রাখা হচ্ছে।

এদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ নামে নতুন একটি প্রবন্ধ যুক্ত হচ্ছে। এতে তৃতীয় ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।

মাধ্যমিক পর্যায়ের আইসিটি বইয়েও আসছে পরিবর্তন। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবি জানিয়েছে, শ্রেণিভেদে এসব বিষয়ের উপস্থাপনার পরিমাণ আলাদা থাকবে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ে তুলনামূলক সংক্ষিপ্তভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে। নবম শ্রেণিতে থাকবে অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত আলোচনা।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পাঠ্যবইয়ে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সে সময় ২০২২ সালের শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে সেটিই কার্যকর রয়েছে।

এনসিটিবি সূত্র বলছে, ২০২৮ সালে শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের পরিমার্জন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তার আগে ২০২৭ সালের জন্য বিদ্যমান পাঠ্যবইগুলো সংশোধনের পাশাপাশি চারটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে।

আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি করে মোট চারটি নতুন বই চালু হচ্ছে। বইগুলো সংশ্লিষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও এসব বিষয়ে বার্ষিক পরীক্ষা থাকবে না। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে।

নতুন চার বইয়ের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। বই ছাপানোর জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে চলছে বইগুলোর বিষয়বস্তু তৈরির কাজ।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন বইগুলোর একটি ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যেই বইটি তৈরি করা হয়েছে।

বইটিতে থাকছে—কারিগরি শিক্ষা পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, যারা বানায় তারাই পৃথিবী বদলায়, সমস্যা ও সমাধান করি, ছোট উদ্যোগ বড় সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পেশা ও দক্ষতা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপন এবং শব্দকোষ।

ষষ্ঠ শ্রেণির দ্বিতীয় নতুন বই ‘আনন্দময় শিক্ষা’। মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে বইটি সাজানো হয়েছে। এতে ‘আমি ও আমরা’, ‘আমার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জীবনযাপন’, ‘প্রযুক্তির সঙ্গে খেলি’, ‘নতুন কিছু করি’, ‘পরিষ্কার থাকি পরিচ্ছন্ন রাখি’, ‘উদ্‌যাপনের দিনগুলো’ এবং ‘আনন্দে থাকি, আনন্দে রাখি’—এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চতুর্থ শ্রেণির একটি নতুন বইয়ের নাম ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’। এতে সংস্কৃতির ধারণা, ব্যক্তিজীবনে সংস্কৃতির প্রভাব, জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।

একই শ্রেণির আরেকটি বই ‘খেলাধুলা’। এতে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি খেলা নিয়ে বিষয়বস্তু সাজানো হয়েছে।

নতুন চারটি বইয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়বস্তু সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে ইলাস্ট্রেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চারটি বইয়ে মোট ৭১০টি ছবি থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানিয়েছেন।

এর মধ্যে ‘খেলাধুলা’ বইয়ে তিন শতাধিক ছবি থাকার কথা রয়েছে। বই প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত চারজন শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীরা যাতে পাঠ্যবিষয় সহজে অনুধাবন করতে পারে, সে লক্ষ্যেই চিত্রের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বইও থাকবে।

এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক স্তরের জন্য প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ বই ছাপানো হবে। সব মিলিয়ে বই ছাপানোর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।

প্রাথমিক স্তরের বই চার রঙে ছাপানো হবে। এসব বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা ন্যূনতম ৮৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বই ছাপার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ পর্যন্ত প্রাথমিকের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠান। মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজ পেয়েছে ৭৬টি প্রতিষ্ঠান।

এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ছাপা শেষ হওয়া প্রায় ২১ শতাংশ বইয়ের প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ শতাংশের বেশি বই ইতোমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে।

এনসিটিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মূল ছাপার কাজ শেষ করে বইগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে নতুন চারটি বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছাপা শেষ নাও হতে পারে।

/আরএ/