চাকরির শেষ ধাপে ‘অদৃশ্য পরীক্ষা’, পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে যত প্রশ্ন

চাকরির শেষ ধাপে ‘অদৃশ্য পরীক্ষা’, পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে যত প্রশ্ন
নিয়োগপত্রবঞ্চিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বিক্ষোভ

একটি চাকরির জন্য বছরের পর বছর পড়াশোনা, নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষা, মৌখিকের অপেক্ষা ও সবশেষে যখন আসে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগের খবর, তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন প্রার্থীরা। কিন্তু সরকারি চাকরির সেই দীর্ঘ দৌড়ের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে অনেকের সামনে তৈরি হচ্ছে আরেকটি অদৃশ্য পরীক্ষা– পুলিশ ভেরিফিকেশন। সেখানে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, ঠিকানা সঠিক কি না, নথিপত্রে তথ্যের মিল আছে কি না এসব যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর নিজের কিংবা পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন ওঠার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ফলে মেধা ও যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও কারও কারও চাকরির ভাগ্য আটকে যাচ্ছে এমন এক যাচাই প্রক্রিয়ায়, যার পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। এছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশনের ভয় দেখিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে এই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে।

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে নির্বাচিতদের নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে নতুন করে সামনে আসে শিক্ষকদের বাদ পড়ার অভিযোগ। বিভিন্ন জেলার প্রার্থীরা দাবি করেন, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও তাদের নাম নিয়োগপত্রে নেই। প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি বলে দাবি করেছেন। আবার বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করা হয়। তবে সরকারিভাবে এখনো মোট কতজন নিয়োগপত্র পাননি, তার চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।

রাহুল দাস নামে প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত এক ব্যক্তি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের কাছে অভিযোগ করেন, ‘আমি জানি না আমাকে কেন বাদ দেওয়া হলো। চেষ্টা করছি জানার। আমি এবং আমার পরিবারের কেউ কখনো কোনো পলিটিক্সের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, তবুও ঠিক কী কারণে ভেরিফিকেশনে বাদ দিয়ে দিলো বুঝতে পারছি না।’

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ১ অক্টোবরের মধ্যে কেউ নিয়োগপত্র না পেলে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পর্যায়ক্রমে তা পাঠানো হবে। তিনি ভেরিফিকেশনকে সরকারি নিয়োগের নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন শুধু কতজন শিক্ষক বাদ পড়েছেন তা নয়, বরং কোন মানদণ্ডে বাদ পড়েছেন এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থীর বক্তব্য জানানোর সুযোগ আছে কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক পরিচয় কেন?

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রার্থীর পটভূমি যাচাইয়ের দীর্ঘদিনের চর্চা রয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয় তখনই, যখন প্রার্থী নিজে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকলেও তার বাবা, চাচা, ভাই কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়ের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের বিষয় হয়ে ওঠে।

একজন প্রার্থী কোনো দলের সমর্থক পরিবারের সন্তান হলেই তিনি সেই দলের রাজনৈতিক কর্মী কি না– এমন প্রশ্ন উঠেছে। কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়া কী একজন মানুষের অপরাধ নাকি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত শুধু প্রার্থীর নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, যোগ্যতা ও চাকরির দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা। এই প্রশ্নগুলোই এখন আলোচনায় রয়েছে।

‘আমি রাজনীতি করিনি, তবু বাদ’

পুলিশ ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক দিকটি নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময় প্রার্থীরা বলেছেন, তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে।

রাহুল দাস নামে প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত অপর এক ব্যক্তি সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের কাছে অভিযোগ করেন, ‘আমি জানি না আমাকে কেন বাদ দেওয়া হলো। চেষ্টা করছি জানার। আমি এবং আমার পরিবারের কেউ কখনো কোনো পলিটিক্সের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, তবুও ঠিক কী কারণে ভেরিফিকেশনে বাদ দিয়ে দিলো বুঝতে পারছি না।’

পুলিশ ভেরিফিকেশনের শিকড় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ঔপনিবেশিক শাসনামলে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ শুধু মেধা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ আমার কাছে টাকা চেয়েছিল। আমাদের সবাইকে থানায় যেতে বলেছিল। ওখানেই ভেরিফিকেশনের জন্য যাই। ১০০০ টাকা দিয়েছিলাম, আরো বেশি চাচ্ছিল। ১০০০ টাকা দিয়ে রিকোয়েস্ট করে চলে এসেছি।’

শামিম আহমেদ লিটন নামে আরেক ব্যক্তি ফেসবুকে লেখেন, ‘পারিবারিক রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হলো। সব কিছুর জন্য আলহামদুলিল্লাহ।’

কোথা থেকে এলো পুলিশ ভেরিফিকেশন?

পুলিশ ভেরিফিকেশনের শিকড় উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ঔপনিবেশিক শাসনামলে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ শুধু মেধা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হতো। এ কারণে প্রার্থীর পরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের একটি চর্চা প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।

তবে সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং সরকারি চাকরিতে সমতার ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে ঔপনিবেশিক আমলের রাজনৈতিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক যাচাই ব্যবস্থার কোন অংশ আধুনিক রাষ্ট্রে প্রয়োজন এবং কোন অংশ পরিবর্তন বা সংস্কার করা উচিত এ নিয়েও আলোচনা প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান সময়ে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, যাচাই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং প্রার্থীর অধিকারসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যান্য দেশে ভেরিফিকেশন কীভাবে হয়?

বিশ্বের অনেক দেশে চাকরির আগে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক প্রচলিত থাকলেও এর ধরন ও উদ্দেশ্য দেশভেদে ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে ডিসক্লোজার অ্যান্ড ব্যারিং সার্ভিস (ডি-বি-এস) এবং জার্মানিতে সার্টিফিকেট অব কন্ডাক্ট (সার্টিফিকেট অব কন্ডাক্ট) ব্যবস্থার মাধ্যমে মূলত প্রার্থীর অপরাধসংক্রান্ত রেকর্ড, পরিচয় ও নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের উপযোগিতা যাচাই করা হয়। এসব দেশে কোন পদে কী ধরনের তথ্য যাচাই করা যাবে, তা আইন ও নির্ধারিত নীতিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ ব্যাকগ্রাউন্ড চেক আছে, তবে এর প্রধান লক্ষ্য সাধারণত ব্যক্তির নিজস্ব অপরাধের ইতিহাস, পেশাগত ঝুঁকি ও আইনি যোগ্যতা যাচাই করা; পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয় সাধারণ অপরাধ রেকর্ড যাচাইয়ের অংশ নয়।

এদিকে পুলিশ ভেরিফিকেশন পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রশ্নে নিরাপত্তার যুক্তিও রয়েছে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের মামলা আছে কি না, তিনি জাল পরিচয়ে চাকরি নিচ্ছেন কি না কিংবা তার দেওয়া তথ্য সত্য কি না এসব যাচাই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যার জায়গাটি তাই ভেরিফিকেশন থাকবে কি না শুধু তা নয়। বরং কী যাচাই হবে, কে যাচাই করবে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে এবং ভুল হলে প্রার্থী কীভাবে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন– এই চারটি প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এসব বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমাদের চাকরির সময়েও এটা হয়েছিল। এবারের ব্যতিক্রমটা হলো– অনেক শিক্ষক নিয়োগপত্র পায়নি। তবে আমরা পরবর্তীতে জানতে পারি এ বিষয়টির সমাধান হয়েছে এবং সেসব শিক্ষকরা ক্রমান্বয়ে তাদের নিয়োগপত্র পাচ্ছেন। তবে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবে কাম্য নয়।’

/এফসি/